website page counter আতঙ্কে দিন কাটছে সিঙ্গাপুরে প্রবাসী বাংলাদেশীদের - শিক্ষাবার্তা ডট কম

মঙ্গলবার, ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং, ৬ই ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

আতঙ্কে দিন কাটছে সিঙ্গাপুরে প্রবাসী বাংলাদেশীদের

১১ বছর ধরে সিঙ্গাপুরে ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ করছেন চুয়াডাঙ্গার ছেলে মতিয়ার রহমান। সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে এলাকার ডিবিএস ভবনে তার কর্মস্থল। ভবনটির ৪৯ তলায় নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এক রোগী শনাক্ত হয়েছে সম্প্রতি। ওই রোগী বর্তমানে চিকিৎসাধীন। একই সঙ্গে কোয়ারান্টাইনে নেয়া হয়েছে ওই ফ্লোরের ৩০০ কর্মীকে। এ ঘটনায় আতঙ্কগ্রস্ত মতিয়ার রহমান সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দেশে ফিরে আসার। এরই মধ্যে অফিস থেকে ৪৫ দিনের ছুটি নিয়ে দেশে ফেরার টিকিটও কিনেছেন তিনি। বর্তমানে দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।

মতিয়ার রহমানের মতো দেশটিতে অবস্থানরত প্রায় সব বাংলাদেশীরই এখন দিন কাটছে আতঙ্কে। দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন তারা। অনেকে এরই মধ্যে ফিরেও এসেছেন।

পাবনার ওমর ফারুকেরও অসময়ে দেশে ফেরার কারণ নভেল করোনাভাইরাস আতঙ্ক। মাত্র তিন মাস আগে ওই দেশে গিয়েছিলেন তিনি। গতকাল তিনি বণিক বার্তাকে জানান, প্রতিটি ডরমিটরি থেকে বের হওয়ার সময় এবং কাজ শেষে ডরমিটরিতে ফেরার পর শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হচ্ছে। আবার কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ এবং বের হওয়ার সময়ও তাপমাত্রা পরিমাপ করা হচ্ছে। কারো শরীরের তাপমাত্রা সাড়ে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেই তাকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পাঠানো হচ্ছে। একই সঙ্গে নেয়া হচ্ছে ১৪ দিনের জন্য কোয়ারান্টাইনে।

এ আতঙ্কের প্রধান কারণ একদিনের ব্যবধানে দুই বাংলাদেশীর নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর। আক্রান্ত দুজনই একে অন্যের সংস্পর্শে ছিলেন বলে জানা গেছে। দুজনই এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এদের পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে দুজনেরই বয়স ৩৯ বলে জানা গেছে।

এর মধ্যে একজনকে সাধারণভাবে চিকিৎসা দেয়া হলেও আরেকজনকে রাখা হয়েছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। সিঙ্গাপুর সরকার তাদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছে। এ নিয়ে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশী দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে দেশটির সরকার।

জানা গেছে, এরা দুজনই সিঙ্গাপুরের বীরাস্বামী এলাকায় থাকেন এবং সেলেটার অ্যারোস্পেস হাইটসে কাজ করতেন। আর ওই দুজনের সংস্পর্শে ছিলেন এমন ১৯ জনকেও কোয়ারান্টাইনে রেখেছে সিঙ্গাপুর সরকার। এর মধ্যে ১০ জনই বাংলাদেশী।

এ বিষয়টিই আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে দেশটিতে অবস্থানরত প্রায় চার লাখ বাংলাদেশী শ্রমিককে। সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক তৈরি হয়েছে সিঙ্গাপুর প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মোস্তফা সেন্টার ও আশপাশ এলাকায়। স্থানটি বাংলাদেশী প্রবাসীদের কাছে মোস্তফা প্লাজা নামে পরিচিত। মোস্তফা সেন্টারের আশপাশ এলাকাগুলোর মধ্যে রবার্টস লেন, সৈয়দ আলাওয়ি রোড, রয়েল রোড, কেজি কাপুর রোড, সিরাংগংসহ কয়েকটি এলাকায় বাংলাদেশী প্রবাসীদের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি। তবে নভেল করোনাভাইরাস আতঙ্কে প্রবাসী বাংলাদেশীরা এখন ওইসব এলাকা এড়িয়ে চলছেন।

১০ বছর ধরে সিঙ্গাপুরের একটি কনস্ট্রাকশন ফার্মে কাজ করছেন মাদারীপুর থেকে যাওয়া আলাউদ্দিন আল আজাদ। গতকাল বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, দুজন বাংলাদেশী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর শোনার পর থেকেই মোস্তফা সেন্টারের দিকে বাংলাদেশী প্রবাসীদের না যাওয়ার জন্য বলা হচ্ছে। অবস্থা খুব খারাপ উল্লেখ করে সাবধানে থাকার জন্য আহ্বান করা হচ্ছে। কারণ কোভিড-১৯-এ (নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণজনিত রোগ, গতকালই এ নাম ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) আক্রান্ত বাংলাদেশীরা মোস্তফা সেন্টারে যাওয়ার পরই আক্রান্ত হয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, সিঙ্গাপুরের অবস্থা খুবই খারাপ। সকাল-বিকাল শরীরের তাপমাত্রা মাপা হয়। চারপাশে সবার মধ্যেই শুধু আতঙ্ক।

চীনের পর এখন সিঙ্গাপুরের দিকেও বেশ সতর্ক নজর রাখছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। ঢাকায় দেশটি থেকে আসা ব্যক্তিদের নিয়ে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানও (আইইডিসিআর) এখন সতর্ক অবস্থানে। সংস্থাটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা গতকাল জানান, ডব্লিউএইচও এখন চীনের পাশাপাশি সিঙ্গাপুরের প্রতি নজর দিচ্ছে বিশেষ কারণে। আর যেহেতু সেখানে বাংলাদেশীরা শনাক্ত হয়েছেন, তাই আমরা সেখানে বিশেষ নজর রাখছি।

চীনের মতো সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রেও যাতায়াতসংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা দেয়া হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আলাদা করে এখনো কোনো নির্দেশনা দিচ্ছি না। যদিও সব এয়ারলাইনসকে স্ক্রিনিংয়ের আওতায় নিয়ে এসেছি, তার পরও নজর দিচ্ছিলাম চীন থেকে আসা ফ্লাইটের বিষয়ে। এখন সিঙ্গাপুর থেকে আসা ফ্লাইটের বিষয়েও আমরা বিশেষ নজরদারি করছি।

সাম্প্রতিকালে সিঙ্গাপুর থেকে আসা বা যারা এখনো আসছেন, তাদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, তারা যেন যথাসম্ভব নিজেদের ঘরের মধ্যে থাকেন। বিশেষ করে যদি কেউ নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোনো রোগীর সংস্পর্শে এসে থাকেন, তাহলে তিনি যেন হোম বা সেলফ কোয়ারান্টাইনে থাকেন।

প্রসঙ্গত, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়ে সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমিয়েছেন অনেক বাংলাদেশী। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ৪৯ হাজার ৮২৯ বাংলাদেশী বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়ে সিঙ্গাপুর গিয়েছেন। এছাড়া ২০১৮ সালে ৪১ হাজার ৩৯৩ জন, ২০১৭ সালে ৪০ হাজার ৪০১, ২০১৬ সালে ৫৪ হাজার ৭৩০ ও ২০১৫ সালে ৫৫ হাজার ৫২৩ জন বাংলাদেশী শ্রমিক দেশটিতে পাড়ি জমান।সুত্র বনিক বার্তা

এই বিভাগের আরও খবরঃ