website page counter প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগে নারীরা পিছিয়ে কেন ? - শিক্ষাবার্তা ডট কম

শুক্রবার, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং, ৮ই ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগে নারীরা পিছিয়ে কেন ?

অনলাইন ডেস্ক :
দেশের বিভিন্ন জেলার পরিসংখ্যান অনুসারে, ৬১ জেলার মধ্যে ৫৫ জেলাতেই নারী কোটা পূরণ হয়নি। এ নিয়ে এরই মধ্যে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে। দায়েরকৃত এই রিটের শুনানি নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত ফল কেনো বাতিল ঘোষণা করা হবে না-তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত।

সূত্র মতে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬০ শতাংশের বেশি নারী শিক্ষক নিয়োগের বিধি থাকলেও তা মানা হয়নি। নারীর চেয়ে বেশি পুরুষ প্রার্থী নিয়োগের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। মাত্র ৪৭ শতাংশ নারীকে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ করা হয়েছে। আর ৫৩ শতাংশ নির্বাচিত হয়েছেন পুরুষ শিক্ষক। অথচ পুরুষ শিক্ষকের কোটা ২০ শতাংশ।

আর পোষ্য কোটা ২০ শতাংশ। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, নারী শিক্ষক কম নির্বাচন করা হলেও বিধিমালা ব্যত্যয় হয়নি। কারণ ঐসব জেলায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায়নি। তারা নিয়োগ নীতিমালার দ্বিতীয় অংশের যুক্তি তুলে ধরে বলেন, নীতিমালায় বলা আছে- যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে সাধারণ প্রার্থীদের দ্বারা পূরণের কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। যদি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য সঠিক হয় তাহলে যুক্তিযুক্তভাবেই প্রশ্ন আসে নারীরা এতো পিছিয়ে কিভাবে বা কেন। ৬১ জেলার মধ্যে ৫৫টি জেলাতেই কি নারী প্রার্থীর সংকট হলো? উক্ত জেলাগুলোতে উচ্চমাধ্যমিক বা সমমানের পরীক্ষায় নূন্যতম দ্বিতীয় বিভাগ বা সমমানের ফলাফল করতে ব্যর্থ হয়েছেন নারীরা?

এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ, নারীনেত্রী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী ভিপি অধ্যাপক মাহফুজা খানম সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘নারীরা পিছিয়ে নেই। সমস্যা দৃষ্টিভঙ্গিতে। নারীরা এতো পিছিয়ে নেই যে সবগুলো জেলাতেই খারাপ করবে। আমাদের অবশ্যই বিষয়টা সম্পর্কে আরো খোঁজখবর নেয়া দরকার। আসলে কি ঘটছে বা ঘটেছে তার সুষ্ঠু তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করা দরকার।’ তিনি বলেন, ‘নারীদের যদি পিছিয়েও পড়ে থাকে তাহলে সমস্যা আমাদের সিস্টেমে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, একজন এমপি তিনটি কলেজে গভর্নিং বডির সভাপতি। অথচ গভর্নিং বডিতে এমন লোকদের থাকার কথা যারা সর্বক্ষণ প্রতিষ্ঠানের ভালো-মন্দের খোঁজ-খবর নিতে পারবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সব বিদ্যালয়গুলোতে যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষক যে রয়েছে তাও বলা যাবে না। আর শিক্ষার্থীরা যদি পড়াশোনায় মজা না পান তাহলে তারা এমনি পালিয়ে যাবে। আর মেয়ে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আমাদের উচিত তাদের ক্ষেত্রে আরো সহনীয় হওয়া। আমাদের সুষ্ঠু পরিবেশ আগে নিশ্চিত করতে হবে।’ মানবাধিকার কর্মী আয়েশা মজুমদার সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘আসলে নারীরা এখন এতো পিছিয়ে নেই। কিন্তু বিষয়টা কিভাবে কি হয়েছে তা তদন্ত করে দেখা দরকার। সরকার নারী শিক্ষার জন্য যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন।

নারীদের বৃত্তি দেয়া হচ্ছে। বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। তারপরেও এতোগুলো জেলায় নারীরা খারাপ করতে পারেন না বলেই বিশ্বাস আমার।’ কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি করা যেতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কিছু জায়গা রয়েছে যেখানে আরো উন্নতি করা যেতে পারে। যেমন ধরুন: আমি দেখেছি অনেকক্ষেত্রে গ্রাম্য অঞ্চলগুলোতে ছাত্রীরা কলেজের গিয়ে শুধু হাজিরা দিয়ে চলে আসেন। তাছাড়া তাদের যারা শিক্ষা দিচ্ছেন অনেক ক্ষেত্রে তাদেরও যথেষ্ট অভিজ্ঞতার অভাব দেখা যায়। তাই তাদেরও আরো বেশি করে বিষয়গুলোতে সচেতনতার জায়গা থেকে যায়।’ নারী সাংবাদিক মাহমুদা আক্তার বলেন, ‘নারী শিক্ষা এগুলো কোথায়। যেহেতু সরকার নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে এতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, সেহেতু এ ধরনের একটা বিষয় ঘটার কোনো সুযোগই নেই। এক-দুটি না, পুরো ৫৫টি জেলায় নারীরা এতো খারাপ করবে এটা হতে পারে না।

সরকারের এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত।’ বিভিন্ন জেলার পরিসংখ্যান জেলাগুলোর পরিসংখ্যান অনুসারে, ৬১ জেলার মধ্যে ৫৫ জেলায়ই নারী কোটা পূরণ হয়নি। মাত্র ছয়টি জেলায় কোটা পূরণ হয়েছে।

ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবার ১৮ হাজার ১৪৭ জন প্রার্থী নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হন। এর মধ্যে নারী শিক্ষক ৮ হাজার ৫৭০ জন যা মোট প্রার্থীর ৪৭ শতাংশ। আর পুরুষ প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন ৯ হাজার ৫৭৭ জন যা উত্তীর্ণ প্রার্থীর ৫৩ শতাংশ। ৬০ শতাংশ নারী কোটা নিয়োগ দেওয়া হলে এ সংখ্যা হতো ১০ হাজার ৮৮৮ জন। সে হিসাবে নারী কম নির্বাচিত হয়েছেন ২ হাজার ৩১৮ জন। ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় ১ হাজার ৭৬৬ জন শিক্ষক নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ১৯ জন। আর নারী ৭৪৭ জন।

খুলনা বিভাগের একটি জেলায়ও নারী কোটা পূরণ হয়নি। চট্টগ্রাম বিভাগের ৮ জেলায় ৩ হাজার ৮২৫ জন শিক্ষক নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। ৬০ শতাংশ দূরের কথা মোট উত্তীর্ণের মধ্যে নারীর চেয়ে পুরুষের সংখ্যা বেশি। পুরুষ নির্বাচিত হয়েছেন ২ হাজার ১৮৩ জন। আর নারী ১ হাজার ৬৪২ জন। ঢাকা বিভাগের ১৩ জেলার মধ্যে মাত্র ঢাকা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ জেলায় নারী কোটা পূরণ হয়েছে। বাকি ৯টি জেলায় পূরণ হয়নি।৩ হাজার ৭১৩ জন নির্বাচিত প্রার্থীর মধ্যে ২ হাজার ৮ জন নারী এবং ১ হাজার ৭০৫ জন পুরুষ। বরিশাল বিভাগের ৬ জেলার কোনোটিতেই নারী কোটা পূরণ হয়নি। ১ হাজার ৯৪৯ জন নির্বাচিত প্রার্থীর মধ্যে ৮৮৮ জন নারী এবং ১ হাজার ৬১ জন পুরুষ। ময়মনসিংহ বিভাগের ৪ জেলার মধ্যে ২টিতে নারী কোটা পূরণ হয়েছে। ১ হাজার নির্বাচিত প্রার্থীর মধ্যে ৫০৮ জন নারী এবং ৪৯২ জন পুরুষ। রংপুর বিভাগের ৮ জেলার একটিতেও নারী কোটা পূরণ হয়নি। ২ হাজার ৪২২ জন নির্বাচিত প্রার্থীর মধ্যে ১ হাজার ২৯১ জন পুরুষ এবং ১ হাজার ১৩১ জন নারী। রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলার মধ্যে সবটিতেই নারীর চেয়ে বেশি পুরুষ প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। এ বিভাগে ১ হাজার ৯০৯ নির্বাচিত প্রার্থীর মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৭৪ এবং মহিলা ৮৩৫ জন।

আর সিলেট বিভাগের চিত্র একই। ১ হাজার ৫৩৬ শিক্ষকের মধ্যে নারী ৮১১ জন এবং পুরুষ প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন ৭৫২ জন। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট নীলফামারী ও বরগুনার চূড়ান্ত ফল ছয় মাসের জন্য স্থগিত এবং ফল বাতিল প্রশ্নে রুল জারি করেছে আদালত। এই দুটি জেলায়ও নারী কোটা পূরণ করা হয়নি। বিচারপতি শেখ হাসান আরিফের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ এ রায় দেয়। ফলে এ নিয়োগ নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব আকরাম আল হোসেন বলেছেন, রিট পিটিশন দায়ের করার পর এখন আমাদের কী করণীয় তা বসে ঠিক করা হবে। রুলের জবাব দেয়া হবে। যে উপজেলায় ফল নিয়ে রিট পিটিশন হয়েছে শুধু সেসব জেলার নিয়োগ ছাড়া অন্য কোথাও নিয়োগে বাধা আছে বলে মনে করি না। রিট পিটিশনারদের আইনজীবী মো. কামাল হোসেন ও রেজাউল করিম রেজা জানান, এই নিয়োগে ৬০ শতাংশের বেশি নারী নিয়োগের জন্য নির্বাচিত হবার কথা। কিন্তু ৬০ শতাংশ পূরণ হয়নি। নারীর চেয়ে পুরুষই বেশি নির্বাচিত হয়েছেন। ২০ শতাংশ যে পোষ্য কোটা রয়েছে সেখান থেকেও নারী নিয়োগের জন্য নির্বাচিত হবার কথা। কিন্তু পোষ্য কোটা আলাদাভাবে না দেখানোয় সেখানেও নারীদের বঞ্চিত করা হয়েছে।

আসমা আক্তার নামে এক প্রার্থী দাবি করেন, নারী প্রার্থীদের বঞ্চিত করার জন্য নীতিমালায় নতুন বাক্য যুক্ত করা হয়েছে। তিনি নীতিমালা পরিবর্তনের দাবি জানান। প্রসঙ্গত, গত বছরের ৩০ জুলাই সহকারী শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সরকার। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর সারাদেশ থেকে ২৪ লাখ প্রার্থী চাকরির জন্য আবেদন করেন। চার ধাপে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সেপ্টেম্বর মাসে ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ৫৫ হাজার ২৯৫ জন পাশ করেন। এই পরীক্ষায় ৬১ জেলায় ১৮ হাজার ১৪৭ জন নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হন। আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি নতুন শিক্ষকদের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগদান করার কথা।

এই বিভাগের আরও খবরঃ