website page counter শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা এবং স্কাউটিংয়ের প্রয়োজনীয়তা - শিক্ষাবার্তা ডট কম

বুধবার, ১১ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং, ২৬শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা এবং স্কাউটিংয়ের প্রয়োজনীয়তা

মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন
কথায় বলে, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। সুস্থ দেহে সুন্দর মন। রোগমুক্ত জীবনযাপন করতে হলে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নাই। শৈশব এবং কৈশোর জীবনে, খেলাধুলার গুরুত্ব অনেক। খেলাধুলা ছাড়া শিক্ষার্থীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে বিকাশ লাভ করতে পারে না। খেলাধুলা শুধু শরীরকে সুস্থ রাখে না। এটি ছাত্রছাত্রী তথা মানুষকে শারীরিক মানসিকভাবে বিকাশ লাভ করে সুনাগরিক করে তোলে। আলোচ্য প্রবন্ধের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা এবং স্কাউটিংয়ের মাধ্যমে লেখাপড়া করে কিভাবে উন্নতি লাভ করতে পারে তাই আলোচনার মুখ্য বিষয়। শিশু মনোবিজ্ঞানীরা বলেছেন, শিশুদের খেলতে খেলতে শিক্ষা দিতে হবে। শৈশবকালে তাদের হেসেখেলে শিক্ষাদান করে পারদর্শী করে তুলতে হবে। উন্নত দেশে বিদ্যালয়ে শিশুদের সব কিছু শিক্ষা দেয়া হয়। তাদের লেখাপড়া থেকে শুরু করে খেলাধুলা চিত্ত বিনোদন ইত্যাদি বিদ্যালয়ে শিক্ষাদান করে থাকে। বই, পুস্তক, খাতা কলম ইত্যাদি বিদ্যালয়ে থাকে। বাড়িতে কোনো লেখাপড়া নাই। কিন্তু আমাদের দেশে তথা ভারতীয় উপমহাদেশে এর বিপরীত। ব্রিটিশরা এদেশে আসার আগে এ উপমহাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল অন্য রকম। অর্থাৎ, এ উপমহাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল আনানুষ্ঠানিক। মক্তব, মাদ্রাসার মাধ্যমে শিক্ষা দেয়া হতো। ফার্সি ভাষা ছিল তখনকার রাজা-বাদশাদের ভাষা। তারপর ইংরেজরা এসে আনুষ্ঠানিকভাবে লেখাপড়া করার পদ্ধতি তৈরি করেছেন। তারা তাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিটেয়ে দেয়ার জন্য ইংরেজি শিক্ষা প্রচলন করেছিলেন। সেই থেকে যে শুরু হয়েছিল তা এখনো আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা করবে তা স্বাভাবিক নিয়ম। গ্রামগঞ্জে যে সকল স্কুল-কলেজ আছে আমি দেখেছি সেখানে প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়েই খেলার মাঠ দেখা যায়। কিন্তু শহরাঞ্চলের প্রতিটি বিদ্যালয়ে কি খেলার জায়গা বা মাঠ আছে? তা আমরা দেখলেই বুঝতে পারি। লেখাপড়া শিক্ষাগ্রহণ করতে যেমন ইনডোরে পরিশ্রম বেশি করতে হয়, তদরূপ খেলাধুলা করতে হলে আউটডোরে পরিশ্রম বেশি করতে হয়। লেখাপড়া খেলাধুলা এবং স্কাউটিং-এ তিনটি বিষয় খুবই অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। এদের একটিকে বাদ দিলে অপরটি পূর্ণতা পায় না। আমাদের দেশে জাতীয়ভাবে সাধারণত আন্তঃস্কুল, কলেজ খেলাধুলা অনুষ্ঠিত হয়। একটি গ্রীষ্মকালীন অপরটি শীতকালীন। গ্রীষ্মকালীন খেলাধুলা সাধারণত ফুটবল, হ্যান্ডবল, কাবাডি, সাঁতার, হকি ইত্যাদি। অপরদিকে শীতকালীন খেলাধুলা হলো অ্যাথলেটিকস্, ব্যাডমিন্টন, ভলিবল, বাস্কেটবল ইত্যাদি। এখন প্রশ্ন হলো এই খেলাধুলাগুলো বাংলাদেশের প্রতিটি স্কুলে কতটুকু গুরুত্বের সাথে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে? সাধারণ লেখাপড়ার মতো খেলাধুলাকে কতটুকু গুরুত্ব দেয়া হয়? অনেক পিতা-মাতা, অভিভাবকে ছেলেমেয়েদের বলতে শুনা যায় খেলাধুলা করে লেখাপড়া নষ্ট করছো কেন? বাস্তবে খেলাধুলা যে লেখাপড়ার অন্তর্ভুক্ত তা কি সবাই উপলব্ধি করে? খেলাধুলা শুধু লেখাপড়ার অস্তর্ভুক্ত নয়। এটি লেখাপড়ার প্রাণশক্তি জোগায়। খেলাধুলা না করলে সাধারণ শিক্ষায় উৎসাহ-উদ্দীপনা পাওয়া যায় না। মনের একঘেয়ামী জড়তা দূর করার জন্য খেলাধুলার কোনো বিকল্প নাই। শারীরিক শিক্ষা ও খেলাধুলা সাধারণ শিক্ষার মতো একটি বিষয়। এই শিক্ষাটিকে সাধারণ শিক্ষার মতো গুরুত্ব দেয়া উচিত। ২০১২ সাল থেকে বিষয়টি নবম ও দশম শ্রেণিতে বাধ্যতামূলকভাবে পাঠ্য করা হয়েছিল। একই সাথে জেএসসি পরীক্ষায়ও ছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো বিষয়টি ২০১৮ সাল থেকে ঐচ্ছিক করে দেয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা আগের মতো বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পড়ে না। তাই শিক্ষার্থীদের শারীরিক বিকাশের কথা চিন্তা করে উন্নত দেশের মতো এ বিষয়টিকে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আবশ্যিকভাবে পাঠ্য করা উচিত। শারীরিক শিক্ষা ও খেলাধুলা বিষয়টি আবশ্যিক করা হলে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলে থেকেও খেলোয়াড় তৈরি সহজ হবে। এভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে খোলোয়াড় তৈরি করে জাতীয়ভাবে কর্মশালা তৈরি করে দিনের পর দিন প্র্যাকটিস করলে এশিয়ান গেমস এবং অলিম্পিকসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পদক পাওয়া সহজ হবে। যদিও বাংলাদেশের ১৯৯২ সালে থেকে বিশ্ব অলিম্পিকে ধারাবাহিকভাবে অংশগ্রহণ করলেও আজ পর্যন্ত কোনো পদক পায় নাই। আসা-যাওয়াই একমাত্র পালা। আমরা বাঙালি জাতি একটি বিশ্বের প্রাচীনতম জাতি। বাংলাদেশের চেয়ে অনুন্নত দেশ অলিম্পিকে পদক জয় করতে পারলেও আমরা পারছি না। এভাবে আর কতদিন বসে থাকা যায়? বিশ্ব সেভাবে এগিয়ে চলছে সেভাবে আমাদেরও চলতে হবে। বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া শিক্ষকের একটি পদ থাকে। শুধু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উক্ত শিক্ষকের পদটি নাই। স্কুল থেকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পদটি আছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১টি পদ, কলেজে ১টি পদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক পদ ও ক্রীড়া বিভাগ থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পদটি প্রথম শ্রেণির। যখন আন্তঃস্কুল এবং আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। তখন অল্প সময়ের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে খেলাধুলা করানো হয়। থানা/উপজেলা পর্যায় থেকে খেলতে খেলতে জাতীয় পর্যায় গিয়ে খেলা শেষ হয়। এই খেলাধুলা চলাকালীন সময়ে থানা এবং জেলা সদরের স্কুলগুলো আয়োজক হিসেবে মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। আমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থানা সদরের আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং উপজেলা মডেল পাইলট হাইস্কুলে পড়েছি। প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময় যখন খেলাধুলা শুরু হতো তখন স্কুলে উৎসব অনুষ্ঠান বিরাজ করতো। ছাত্র-শিক্ষক সবাই খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। ক্লাস তখন ঐচ্ছিক হয়ে যেতো। তখন কি যে মজা লাগতো! তা এখন ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আমার যতটুকু মনে আছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুলভিত্তিক বাছাই-এর পর ক্লাস্টারভিত্তিক প্রতিযোগিতা হতো। তারপর প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় স্থান অধিকারীদের নিয়ে থানা পর্যায়ে একসাথে প্রতিযোগিতা হতো থানা পর্যায় থেকে প্রথম দ্বিতীয় স্থান অধিকারী জেলা পর্যায় অংশগ্রহণ করানো হতো। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অ্যাথলেটিক ছাড়াও নাচ গান এবং সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা হতো। এভাবে শিক্ষার্থীরা স্বতস্ফূর্তভাবে খেলাধুলায় মেতে উঠতো। এখন সেই খেলাধুলার পরিবেশে আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। শহরের ছেলেমেয়েরা নিজস্ব মাঠের অভাবে খেলতে পারছে না। লেখাপড়ার চাপে তারা খেলাধুলার কথা ভুলেই যায়। শিক্ষার্থীদের যদি উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং কর্মশালা তৈরি করে শিক্ষার মূল থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে তৈরি করা হতো, তাহলে আমার মনে হয় খেলাধুলায় আরো বেশি উন্নতি করতো এবং কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যেতো। এভাবে পরিকল্পনামাফিক খেলাধুলা করলে বাংলাদেশের ক্রীড়া শিক্ষা বিশ্ব অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত হতো। শহরাঞ্চলে কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্লাব, সমিতির মধ্যে খেলাধুলা সীমাবদ্ধ না রেখে মূল থেকে খেলোয়াড় বাছাই করে তৈরি করতে হবে। তার জন্য দরকার হবে সরকারের মেগা বাজেট তৈরি। বাংলাদেশের প্রতিটি থানা, উপজেলায় ও জেলায় একটি করে সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ তৈরি করে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা শিখাতে হবে। আলাদাভাবে শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে এ শিক্ষায় আন্তর্জাতিক মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করতে হবে। ভাবতে অবাক লাগে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় নাই। তা থেকে বুঝা যায় বাংলাদেশের খেলাধুলায় স্থানীয় জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মান কতটুকু। মুখে খেলাধুলার উন্নতির কথা বলে বাস্তবে তার মান উন্নয়ন করা হবে না তা হতে পারে না। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বি.কে.এস.পি। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা সহজে ভর্তি হয়ে খেলাধুলা করতে পারে না, বা অনেকেই আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে ভর্তি হতে পারে না। গ্রামের দরিদ্র শিক্ষার্থীরা এখানে খুবকমই সুযোগ পায়। গ্রাম নিয়ে শহর, গ্রাম আছে বলেই শহরের দাম আছে, আগে গ্রামকে প্রধান্য দিয়ে কাজ করলে পুরো বাংলাদেশের উন্নতি হবে। বি.কে.এস.পি’র মতো ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আরো স্থাপনা করে বাংলাদেশের খেলাধুলা শিক্ষাকে সহজলভ্য করতে হবে। এই বিশ্বায়নের যুগে শুধু ক্রিকেট ছাড়া বাংলাদেশের প্রায় সকল খেলারই তেমন আন্তর্জতিক মান নাই। ফুটবল খেলাতো এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। দেশ স্বাধীনের আগে ও পরে ফুটবল খেলা গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত যে জনপ্রিয় ছিল এবং যেভাবে খেলতো এখন আর সেভাবে খেলা হয় না। ফুটবলে ঢাকা লীগ খেলা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। আগে জুন-জুলাই মাস আসলে ঢাকা লীগ শুরু হতো। তা নিয়ে সারা বাংলাদেশে আনন্দে মেতে উঠতো। তাছাড়া, গ্রাম-গঞ্জের প্রতিটি মাঠে ফুলবল খেলা শুরু হতো মানুষ দল বেঁধে খেলা দেখতে যেতো। এখন আর সেই দৃশ্য চোখে পড়ে না। তাছাড়া, থানা সদরের হাইস্কুলের প্রতিটি মাঠে আন্ত স্কুল ফুটবল খেলা চলতো তাতে সারা থানার মানুষ এসে একসাথে দেখতো এবং আনন্দ পেতো। এখন আন্তঃস্কুল কলেজ খেলাধুলা হয় ঠিক কিন্তু এর মান বৃদ্ধি পায় না এবং নতুন নতুন খেলোয়াড় তৈরি হয় না। যার ফলে বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে ভালো খেলোয়াড় ও দেখা যায় না। যার অন্যতম কারণ হতে পারে পরিকল্পিত প্রশিক্ষণের অভাব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতি বছর বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা করা একান্ত জরুরি। তাছাড়া এর সাথে সাথে আন্তঃহাউজ ফুটবলসহ প্রতিটি খেলাধুলা আয়োজন করা দরকার। লেখাপড়ার ক্ষতি হবে বিধায় খেলাধুলা করানো যাবে না বা ম্যাচ হবে না এরূপ মনমানসিকতা আমাদের পরিত্যাগ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে সাধারণ শিক্ষার সাহায্যে যে রূপ উন্নতি করা যায়, তদরূপ খেলাধুলার সাহায্যে আরো বেশি উন্নতি বা সুনাম বৃদ্ধি করা যায়। বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলোয়াড়দের দিয়ে বাংলাদেশ নামটি আজ বিশ্বব্যাপী পরিচিত। সাকিব আল হাসান, মুশফিক, মুস্তাফিজ নামটি শুনলেই বাংলাদেশের নাম সারা বিশ্বে জ্বলে উঠে। আমরা শৈশব এবং কৈশোরে যত খেলাধুলা করছি আমাদের ছেলেমেয়েরা তার অর্ধেকও খেলতে পারে না। তারা লেখাপড়ার চাপে খেলাধুলার কথা ভুলে যায়। উপযুক্ত শারীরিক ও কায়িক পরিশ্রম না করার কারণে তাদের শরীর অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। এভাবে যদি খেলাধুলা ও শারীরিক পরিশ্রম থেকে দূরে থাকে আমার মনে হয়, তারা অচিরে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে যাবে। তাছাড়া, শহরে উপযুক্ত মাঠ না থাকার কারণে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাসহ অন্যান্য খেলাধুলা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তেমনভাবে আয়োজনই করতে পারে না। ফলে খেলাধুলার স্বাভাবিক চর্চা তো হয় না বরং বন্ধ থাকে। আবার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অন্য প্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠ ব্যবহার করে খেলতে দেখা যায়। নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ না থাকলে কতটুকু খেলাধুলায় উন্নতি হবে তা নিজেকে প্রশ্ন করলেই বুঝা যায়। তবে গ্রাম বল, শহর বল সকল প্রতিষ্ঠানেরই নিজস্ব যুগোপযোগী খেলার মাঠ থাকা দরকার যাতে ছেলেমেয়েরা মুক্তমনে খেলাধুলা করতে পারে। শিক্ষা শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ নয়, ব্যক্তির শারীরিক, সামাজিক, আবেগিক ও অন্যান্য দিকেরও সুষম বিকাশ সাধন করে। শিক্ষা জীবনব্যাপী বিস্তৃত। শিক্ষা শুধুমাত্র বিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, শিক্ষা অর্জিত হয় পরিবারে, খেলার মাঠে এবং সর্বত্র। শারীরিক শিক্ষার ব্যবহারিক দিক হচ্ছে খেলাধুলা। খেলাধুলার কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো গত উন্নয়ন খুবই জরুরি। বাংলাদেশের মাধ্যমিক বিদ্যায়ের শিক্ষার্থীদের ক্রীড়ায় উৎসাহী করার জন্য শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন দুটি ক্রীড়া অনুষ্ঠান ও বিনোদনমূলক প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা বয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে বছরে একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন করেই ক্রীড়া ক্ষেত্রে তাদের খেলাধুলা কার্যক্রম শেষ করে থাকে। দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। তাদের মধ্যে অনেকই সাঁতার জানে না। সাঁতার না জানার কারণে তারা বিভিন্ন সময়ে দুর্ঘটনায় পড়ে এমন কি মৃত্যুবরণ করে। যদি প্রতিটি বিদ্যালয়ে একটি পুকুর বা সুইমিং পুল থাকে তবে শিক্ষার্থীরা সাঁতার শিখে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারবে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাবে। বিদ্যালয়গুলোতে একদিকে রয়েছে সঠিক খেলার মাঠের অভাব তেমনি রয়েছে মানসম্মত ক্রীড়া সামগ্রীর ঘাটতি। অবকাঠামোগত অসুবিধার কারণে খেলাধুলা করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে শিক্ষার্থীরা বেড়ে উঠলে ভবিষ্যতে জাতীয় স্বাস্থ্য হুমকির সম্মুখীন হবে। তাই অবকাঠামোগত আস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এজন্য স্থানীয়ভাবে স্টোডিয়াম, সুইমিংপুল ও খেলার মাঠের উন্নয়ন করতে হবে। সেই সাথে বিদ্যালগুলোতে মানসম্মত ক্রীড়া সমগ্রীর সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। মানব জীবনের একটি স্বাভাবিক ও সুস্থ ক্রীড়া হচ্ছে খেলাধুলা। একটি মানব শিশু খেলাধুলার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। খেলাধুলার জন্য কর্মক্ষম ও সুস্থ দেহ খুবই প্রয়োজন। মানব দেহ বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সমন্বয়ে গঠিত। সঠিক অঙ্গ সঞ্চালনে দেহের বিভিন্ন অঙ্গের কর্মক্ষমতা, শারীরিক ও মানবিক সুস্থতা বৃদ্ধি পায়। কেবল খেলাধুলার মাধ্যমে এ কাজটি করা সম্ভব। শরীরের সমন্বয়হীনতা দূর করার জন্য শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা করা অপরিহার্য। সুস্থ, সবল, নিয়োগ ও কর্মক্ষম শরীর গঠন, অর্থাৎ সুন্দর জীবনের জন্য সবাইকে খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করা উচিত। এবার আসা যাক স্কাউটিং-এর কথা। স্কাউটিং একটি অরাজনৈতিক মানব সেবামূলক যুব আন্দোলন-এর মধ্যে ধর্ম, কর্ম সব কিছু আছে। বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ স্কাউট লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল ১৯০৭ সালে মাত্র ২০ জন স্কাউট নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে স্কাউটিং শুরু করেন। তিনি যুব সমাজকে স্কাউটিং-এর মাধ্যমে একত্রিত করে নৈতিক চরিত্র গঠন করে আদর্শ মানুষ হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। স্কাউটিং শব্দটির অর্থ হলো সদা প্রস্তুত। সদা প্রস্তুত বলতে বুঝায় ভালো কাজ করার জন্য। স্কাউটিং এর তিনটি শাখা রয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় কাব, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে স্কাউট এবং কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রোভার শাখা। এ তিনটি শাখার মাধ্যমেই মানব সেবা করা যায়। স্কাউটিং-এর মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য হলো- আত্মমানবতার সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেয়া। যা স্কাউটিং-এর আইন ও প্রতিজ্ঞার মাধ্যে দৈনন্দিন প্রতিফলন ঘটছে। বিপির জন্ম ১৮৫৭ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি ইংল্যান্ডে এবং মৃত্যু ১৯৪১ সালে ৮ জানুয়ারি। বিপি মাত্র ১৭ বছর বয়সে তৎকালীন ভারতীয় আর্মিতে অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। জন্মের তিন বছরের মধ্যে তার পিতা মারা যায়। তাঁর পিতার নাম রেভাবেন্ট এইচজি ব্যাডেন পাওয়েল। বিশ্ব বিখ্যাত অঙ্ফোর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিজ্ঞানী ছিলেন। মায়ের নাম হেনরিয়েটা গ্রেস। মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি বড় হন এবং বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন। বি.পি. ১৯২১ সালে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ স্কাউট হিসেবে ভারতবর্ষে আসেন এবং এখানে সর্বপ্রথম উপদল পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। বি.পির লিখা বই স্কাউটিং ফর বয়েজ ১৯০৮ সালে প্রকাশিত হয়। বি.পি. স্কাউটিং তার বোন এগনেস ব্যাডেন পাওয়েল এবং স্ত্রী অলিভ ব্যাডেন পাডয়েল গালর্স গাইড প্রতিষ্ঠার অবদান রাখেন। স্কাউটিং পদ্ধতিতে ইংল্যান্ডের বালক বালিকাদের চরিত্রের বিভিন্ন গুণাবলীর উন্নতি দেখে তিনি সারাবিশ্বে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৯২০ সালে বিশ্ব স্কাউট সংস্থা গঠিত হয় এবং এর প্রধান কার্যালয় সুইজারল্যান্ডের রাজধানী জেনেভায় অবস্থিত। স্কাউট আন্দোলনের লক্ষ্যই হচ্ছে একজন স্কাউটকে চরিত্রবান করে আদর্শ মানুষে রূপান্তরিত করা। স্কাউটিং-এ শিক্ষার্থীদের ব্যাজ প্রদানের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়। ব্যাজ দুই প্রকার দক্ষতা এবং পারদর্শিতা ব্যাজ, দক্ষতা ব্যাজ প্রদান করা হয় একটি নির্দিষ্ট সিলেবাস শেষ করে পরীক্ষায় পাস করলে এ ব্যাজ প্রদান করা হয়। দক্ষতা ব্যাজ চার প্রকার। সদস্য স্ট্যান্ডার্ড, প্রোগ্রেজ এবং সার্ভিস। প্রেসিডেন্ট স্কাউট এওয়ার্ড কোজ ব্যাজ নয়। এটি একটি পুরস্কার। নির্দিষ্ট একটি কাজে পারদর্শিতা অর্জন করলে পারদর্শিতা ব্যাজ প্রদান করা হয়। যে ছাত্রছাত্রী উল্লেখিত ব্যাজ অর্জন করে প্রেসিডেন্ট স্কাউট এওয়ার্ড পাওয়ার জন্য মনোনীত হবে সে শিক্ষার্থী অবশ্যই নৈতিক গুণাবলী সম্পন্ন আদর্শ মানুষ হবে। একজন পি.এস. এওয়ার্ডধারী স্কাউট কখনো খারাপ ছাত্র হতে পারে না। সে কখনো মিথ্যা কথা বলতে পারে না। সে হবে সব দিক দিয়ে একজন নম্র ভদ্র শিক্ষার্থী। তাকে বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী অনুকরণ এবং অনুসরণ করবে। স্কাউটিং কার্যকলাপের মাধ্যমে সে সকল গুণের অধিকারী সম্পন্ন আদর্শবান হবে। বিদ্যালয়ের জন্য স্কাউটিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং উপকারী। শিক্ষার্থীরা স্কাউটিং কাজকর্মের মাধ্যমে সবার মনকে জয় করে নিবেন এটিই যথার্থ। স্কাউট এবং গালর্স গাইডে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবক দল হিসেবে কাজ করে সুনাম অর্জন করে এবং বিভিন্ন পারদর্শিতা ব্যাজ পেয়ে থাকে। বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, আন্তঃহাউস বিভিন্ন খেলাধুলা, বিভিন্ন ইনডোর এবং আউটডোর অনুষ্ঠানে সহযোগিতামূলক কাজকর্ম করে অনুষ্ঠানকে সার্বিকভাবে সাফল্যম-িত করে তোলে।

পরিশেষে একথা বলতে পারি যে, একটি বিদ্যালয়ের জন্য খেলাধুলা এবং স্কাউটিং খুবই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উন্নতিকল্পে খেলাধুলা এবং স্কাউটিং-এর কোনো বিকল্প নাই। এই দু’টি বিষয় লেখাপড়ার গতি সঞ্চার করে, শিক্ষার্থীদের সুনাম বৃদ্ধি করে মেধার বিকাশ ঘটায়। তাই লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা এবং স্কাউটিং-এর প্রতি অবশ্যই সবার আরো অধিক যত্নবান এবং গুরুত্ব দেয়া উচিত।

এই বিভাগের আরও খবরঃ