website page counter জাতীয়করণই দিতে পারে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মুক্তি - শিক্ষাবার্তা ডট কম

শনিবার, ৬ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং, ২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

জাতীয়করণই দিতে পারে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মুক্তি

মোঃ আবুল হোসেন।।

স্বাধীনতার এত বছরেও বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। পরিবর্তন হয়েছে শুধু সরকারি অংশের স্কেল সহ পূর্বের বাড়ি ভাড়া বাড়িয়ে করা হয়েছে ১০০০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা করা হয়েছে ৫০০ টাকা। সেই ২০০৪ সাল থেকে শুরু হলো ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা। সেই উৎসব ভাতা এক যুগেরও বেশি সময় অতিবাহিত হচ্ছে তার হলো না কোন পরির্বতন। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে কচ্ছপ গতিতে।

 

বর্তমান সময়ে দেশ এগুচ্ছে পরিবর্তনের স্লোগান নিয়ে। দেশ এখন ডিজিটাল যুগে পৌঁছে গেছে। ডিজিটাল হচ্ছে প্রতিটি সেক্টর। কিন্তু বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা রয়ে গেল এনালগ যুগে। দেশের সার্বিক দিক বিবেচনা করলে দেখা যাচ্ছে শুধু শিক্ষা সেক্টরেই বৈষম্য বিরাজমান। আর প্রতিটি সেক্টরের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে। শুধু আটকে গেল বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের যেখানে চাকরি শুরু সেখানেই শেষ। নির্দিষ্ট গন্ডির বাইরে যাবার উপায় নেই। বন্দী দশায় কাটাতে হয় চাকরি জীবন।

সমগ্র বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করলে এসে যাবে বদলি প্রথা। জাতীয়করণই সকল বৈষম্যের অবসানের পথ। জাতীয়করণ ছাড়া বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মুক্তি নাই। সমগ্র বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয় ব্যয়ের হিসেব সরকার বুঝে নিয়ে জাতীয়করণ করলে লাভ ছাড়া ক্ষতি হবে না। তবুও অবহেলিত রয়ে গেল বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জাতীয়করণ দাবি মেনে নিয়ে বৈষম্য মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার ঘোষণা চাই।

বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জীবন বৈষম্যের বেড়াজালে পিষ্ট । সরকারি শিক্ষকরা বদলি হতে পারবে কিন্তু বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নন। জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০১৮ তে উল্লেখ আছে সরকার যদি প্রয়োজন মনে করেন তাহলে বদলি সিস্টেমের ব্যবস্থা করতে পারবে। বদলি সিস্টেম চালু করার উদ্দেশ্যে বেশ কয়েক বার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজও বদলি সিস্টেম আলোর মুখ দেখল না। কিছু দিন আগে শোনা যাচ্ছিল ২০২০ সালে বদলি সিস্টেম চালু করা হবে। বদলি সিস্টেম চালু করার জন্য আলাদা সফটওয়্যার তৈরি করা হবে।

 

বদলি সিস্টেম চালু করার জন্য সফটওয়্যারে কাজ চলছে। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে বদলি সিস্টেমের কাজ সম্পূর্ণ করা হবে। ২০১৯ সাল প্রায় অতিবাহিত হচ্ছে তবুও এখনো পর্যন্ত বদলি সিস্টেমের কোন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। যেখানে বদলি সিস্টেম চালুর প্রক্রিয়ার সংবাদ প্রকাশ করে সরকার প্রশংসা কুড়িয়ে ছিলেন। আজ তা আস্তে আস্তে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। বদলি সিস্টেম নিয়ে কোন কার্যক্রম লক্ষ্যনীয় নয়। নেই কোন পদক্ষেপ। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্বপ্ন আজ চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাস্তব জীবন হলো সমস্যায় জর্জরিত। বছরের পর বছর একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার ফলে দুর্বিষহ হয়ে উঠে জীবন যাপন। যেখানে জাতীয়করণের মাধ্যমে নতুন পরিবেশে নতুন অভিজ্ঞতার সৃষ্টি হয়। অভিজ্ঞতাই এনে দিতে পারে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন। শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতিতে আনতে পারে পরিবর্তন।

শিক্ষিত জাতি দেশের উন্নয়নের রুপকার । শিক্ষিত জাতি গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে শিক্ষক সমাজ । শিক্ষা ব্যবস্থায় তাই শিক্ষকদের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাণ ফিরে আনতে প্রয়োজন বৈষম্য মুক্ত সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। শিক্ষা ব্যবস্থায় জাতীয়করণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রতিটি পেশায় আছে পূর্ণাঙ্গ সুযোগ সুবিধা। শুধু বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় নেই পূর্ণাঙ্গ সুযোগ সুবিধা । জাতীয়করণের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থায় কাজের গতি বৃদ্ধি পাবে। জাতীয়করণ শিক্ষা ব্যবস্থায় এনে দিতে পারে গতিশীলতা। শিক্ষার মান উন্নয়নে জাতীয়করণ জরুরি। শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকদের মনোযোগ বাড়াতে জাতীয়করণ একান্ত প্রয়োজন। জাতীয়করণের মাধ্যমে নিত্য নতুন অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ শিক্ষক তৈরি হবে। শিক্ষকরা পাঠদানের প্রতি মনোযোগী হবে। শিক্ষার্থীরা হবে উপকৃত। শ্রেণি পাঠদানের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সিন্ডিকেট দূর হবে।

 

কোচিং বাণিজ্যের হার কমে আসবে। শিক্ষা ব্যবস্থা গতিশীল করতে প্রয়োজন সমগ্র বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ । জাতীয়করণের মাধ্যমে শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতি পরিবর্তন সম্ভব। শিক্ষকরা নিত্য নতুন তথ্য উপাত্ত জানার চেষ্টা করবে । নতুন পরিবেশে প্রত্যেকে নিজকে মেলে ধরার চেষ্টা করবে। শিক্ষকরা নতুন নতুন তথ্য উপাত্ত শিক্ষার্থীদের মাঝে তুলে ধরার চেষ্টা করবে। এতে শিক্ষার্থীর মেধার বিকাশ গঠবে । শিক্ষা ব্যবস্থায় আসবে আমুল পরিবর্তন। একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার ফলে নিজের যোগ্যতা যাচাই করা সম্ভব হয় না। জাতীয়করণের মাধ্যমে নিজের যোগ্যতা যাচাই করা সম্ভব হবে। নতুন পরিবেশে পাঠদান পদ্ধতির পূর্বের ভুল গুলো সংশোধন করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করবে। বেশি দিন একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার ফলে শিক্ষকদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা কাজ করে।

 

আর এই হতাশার প্রভাব পড়ে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। যা শিক্ষা ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে স্থবিরতা এনে দিবে। শিক্ষা ব্যবস্থার মান উন্নয়নে তাই জাতীয়করণ একান্ত জরুরি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান প্রক্রিয়ায় গতি সঞ্চার করতে জাতীয়করণের বিকল্প কিছু হতে পারে না। আমরা বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সরকারি অংশ বা অনুদান সহ যে সামান্য বাড়ি ভাড়া পাই তা দিয়ে সংসারের ভরনপোষণ করাই কঠিন হয়ে পড়ে। সংসার চালানোর টাকা জোগাড় করতে হিমসিম খাচ্ছে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা। শিক্ষকদের পিছুটান দূর করতে না পারলে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব নয়।

 

তাই শিক্ষকদের আগে করতে হবে স্বাবলম্বী। বাড়ি ভাড়ার কথা বিবেচনা করে দেখা যাচ্ছে গ্রামাঞ্চলে সর্বনিম্ন বাড়ি ভাড়া ৪০০০ টাকা থেকে ১০০০০ টাকা পর্যন্ত। বাংলাদেশ বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বাড়ি ভাড়া পায় মাত্র ১০০০ টাকা। শহরাঞ্চলের বাড়ি ভাড়া সর্বনিম্ন ১০০০০ টাকা থেকে ২৫০০০ টাকা পর্যন্ত। সংসারের ভরনপোষণ করার পর বাকি বাড়ি ভাড়া পাবে কোথায় ? এই বাস্তবতায় শিক্ষকদের বর্তমান সময়ে তাদের অবস্থান কোথায় ? বর্তমান বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকরা সর্বোচ্চ সম্মানিত এবং এই শিক্ষকতা পেশায় সব মেধাবীরা নিজ আগ্রহে এগিয়ে আসে। কিন্তু বাংলাদেশের মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে চায় না কারণ বর্তমানে শিক্ষকদের সকল পেশার চাইতে শিক্ষকতা পেশায় সুযোগ সুবিধা কম। মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আনতে হলে প্রয়োজন বৈষম্যবিহীন বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

বর্তমান সময়ে নিজ জেলায় চাকরির সুযোগ না পেয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় সিংহ ভাগ শিক্ষক চাকরি করেন। দূর দূরান্তে চাকরি করার ফলে কারণে অকারণে আজ শিক্ষকরা হচ্ছেন নির্যাতিত। কেউ কেউ আজ হারাচ্ছেন চাকরি। এই বাস্তবতার কারণে আজ বাংলাদেশে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জাতীয়করণের দাবি পূরণে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এবং শিক্ষা উপমন্ত্রী সহ দায়িত্ব প্রাপ্ত সকল কর্মকর্তা গণের নিকট বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। আপনারা সম্মিলিত ভাবে জাতীয়করণ বিষয়ে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করে বৈষম্যের বেড়াজাল থেকে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মুক্ত করুন।

লেখক-
সিনিয়র যুগ্ম – মহাসচিব
বাশিস (কেন্দ্রীয় কমিটি)

এই বিভাগের আরও খবরঃ