website page counter ১২ রবিউল আউয়াল কি সত্যিই মিলাদুন্নবি? - শিক্ষাবার্তা ডট কম

শুক্রবার, ১৪ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৩০শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

১২ রবিউল আউয়াল কি সত্যিই মিলাদুন্নবি?

মুনীরুল ইসলাম ইবনু যাকির।।

মিলাদুন্নবি পরিচিতি

‘মিলাদ’ শব্দের অর্থ হলো জন্মসময়। যে কারও জন্মের মুহূর্তটাকে আরবিতে মিলাদ বা মাওলিদ বলা হয়। সে হিসেবে ‘মিলাদুন্নবির’ বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘নবির জন্মসময়’।

হাদিস ও ইতিহাসের আলোকে নবিজির জন্ম

এখানে আমরা ৪টি বিষয় নিয়ে কথা বলব। ১. নবিজির জন্মবার, ২. জন্মসাল, ৩. জন্মমাস ও ৪. জন্মতারিখ। এর মধ্যে প্রথম দুটি ব্যাপার সরাসরি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আর পরের দুটি নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে।

১. জন্মবার : নবিজি (সা.) জন্ম গ্রহণ করেছিলেন সোমবারে। হাদিসে এসেছে যে, নবি (সা.) প্রতি সোমবার নফল রোজা রাখতেন। এ ব্যাপারে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এই দিনে (সোমবারে) আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমি নবুয়ত লাভ করেছি।’ [মুসলিম, আসসাহিহ]

ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন, ‘নবি (সা.) সোমবারে জন্মগ্রহণ করেন, সোমবারে নবুয়ত লাভ করেন, সোমবারে ইন্তেকাল করেন, সোমবারে মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনার পথে রওয়ানা করেন, সোমবারে মদিনা পৌছান এবং সোমবারেই তিনি হাজরে আসওয়াদ উত্তোলন করেন।’ [আহমাদ, আলমুসনাদ]

২. জন্মসাল : রাসুল (সা.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন ‘আমুল ফিল’ তথা বাদশাহ আবরাহা যে বছর তার হস্তিবাহিনী নিয়ে পবিত্র কাবা ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল, সে বছর। আর ঐতিহাসিকদের মতে সেটা ছিল ৫৭০ অথবা ৫৭১ খৃস্টাব্দ। সাহাবি কায়স ইবনু মাখরামা (রা.) বলেন, ‘আমি ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুজনেই ‘হাতির বছরে’ জন্মগ্রহণ করেছি।’ [তিরমিযি, আসসুনান]

৩. জন্মমাস : হাদিসের কিতাবাদিতে রাসুলের জন্মের মাসের ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো বর্ণনা আসেনি। তাই ঐতিহাসিকদের মধ্যে এ নিয়ে অনেক মতভেদ হয়েছে। কেউ বলেছেন, তাঁর জন্ম তারিখ বা মাস সম্পর্কে জানা যায় না। তাই এ নিয়ে আলোচনা না করাই উত্তম। কেউ বলেছেন, তিনি রমজান মাসে জন্মগ্রহণ করেছেন। কারণ যেহেতু তিনি জন্মের চল্লিশ বছর পর রমজান মাসে নবুয়ত লাভ করেছিলেন। সুতরাং চল্লিশ বছর পূর্বে রমজান মাসেই তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কারও মতে, তিনি মহরম মাসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কারও মতে, তিনি সফর মাসে জন্মগ্রহণ করেছেন। কারও মতে, রজব মাসে। আবার কারও মতে, রবিউস সানি মাসে।

তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিকই রবিউল আউয়াল মাসের ব্যাপারটাই জোর দিয়েছেন। এতসত্ত্বেও রবিউল আউয়ালের ঠিক কত তারিখে তিনি জন্মেগ্রহণ করেছিলেন সেটা নিয়েও তাদের মাঝে অনেক মতভেদ আছে। আগেই বলেছি যে, এসব মতভেদের মূল কারণ হলো, এ ব্যাপারে হাদিসগ্রন্থসমূহে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।

৪. জন্ম তারিখ : যারা স্বীকার করেন যে, রবিউল আউয়াল মাসই রাসুলের জন্মমাস, তাদের মধ্যে কেউ বলেছেন, তিনি এ মাসের ২ তারিখ জন্মগ্রহণ করেছেন। হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দির বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ইতিহাসবিদ আল্লামা আবদুর রহমান আসদিন্দি এই মতটি গ্রহণ করেছেন। কারও মতে, রবিউল আউয়ালের ৮ তারিখ। ইমাম কাসতালানি ও যুরকানির মতে এই মতটিই অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও ইতিহাসবিদগণ গ্রহণ করেছেন। ইমাম ইবনু হাযম, ইমাম হুমাইদি, ইমাম ইবনু আবদিল বার প্রমূখ এই মতটিকেই বিশুদ্ধ বলেছেন।

সাইয়িদুনা হুসাইন (রা.) এর পৌত্র মুহাম্মাদ আল-বাকিরের মতে, নবিজির জন্ম তারিখ ১০ই রবিউল আউয়াল। দ্বিতীয় শতকের মুহাদ্দিস ইমাম শাবি ও তৃতীয় শতকের ইতিহাসবিদ ইমাম ওয়াকিদি এই মতটি গ্রহণ করেছেন।

ইমাম ইবনু ইসহাকের মতে, নবিজির জন্ম তারিখ ১২ রবিউল আউয়াল। কিন্তু এটি তিনি সনদবিহীন বর্ণনা করেছেন। সাধারণত তিনি সিরাতসংক্রান্ত বর্ণনাগুলো সনদ (বর্ণনাপরম্পরা) সহকারে বর্ণনা করে থাকেন, কিন্তু এটির কোনো সনদ তিনি উল্লেখ করেননি। তাই সিরাতবিশেষজ্ঞদের মতে, এই মতটি দুর্বল।

এছাড়াও কেউ কেউ ১৭, ১৮ ও ২২ রবিউল আউয়ালও বলেছেন।

কিন্তু আধুনিককালে এসে ইলমুল ফালাক বা অ্যাস্ট্রোনমি বিশেষজ্ঞগণ অনেক গবেষণার পর এটা প্রমাণ করেছেন যে, সেই বরকতময় দিনটা ছিল রবিউল আউয়ালের ৯ তারিখ। আধুনিককালের সিরাতবিশেষজ্ঞরাও এই মতটিই অধিক বিশুদ্ধ বলে গ্রহণ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন আল্লামা সালমান মনসুরপুরী, আল্লামা মুবারকপুরী, আল্লামা শিবলী নুমানি, আকবর শাহ নাজিবাবাদি প্রমুখ।

নবিজির মৃত্যুতারিখ

নবিজির জন্মতারিখ নিয়ে বিস্তর মতপার্থক্য থাকলেও মৃত্যুর তারিখ নিয়ে অতটা মতপার্থক্য নেই। অধিকাংশ আলিম, ইতিহাসবেত্তার মতেই ১২ রবিউল আউয়াল নবিজির মৃত্যুতারিখ। ঘটনাক্রমে সেই দিনটিও ছিল সোমবার। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে যে, আমরা ১২ রবিউল আউয়াল নবিজির জন্মদিনের আনন্দ উদযাপনের নামে নবিজির মৃত্যুদিনে আনন্দ করছি না তো?

এখানে আরেকটা ব্যাপার লক্ষণীয় যে, বিভিন্ন দেশে যার যার দেশের তারিখ অনুযায়ী ১২ রবিউল আউয়াল পালন করা হচ্ছে। যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, ১২ তারিখই নবিজির জন্মদিন তাহলে প্রশ্ন আসে যে, রাসুল (সা.) তো এসেছিলেন আরবে। গোটা আরববিশ্বে আগামিকাল (শনিবার) ১২ রবিউল আউয়াল। ভারত-বাংলাদেশে ১২ রবিউল আউয়াল তার পরের দিন (রবিবার)। যেদিন আরববিশ্বে ১৩ তারিখ। সুতরাং কোনোভাবেই তো রাসুলের জন্মদিন পালন করা যাচ্ছে না। একদিন পর কারও জন্মদিবস পালন করাটা কতটা হাস্যকর!

সারকথা

অবশ্যই আমরা এ ধূলির ধরনীতে নবিজির আগমনে প্রফুল্ল। তাঁর আগমনেই তো পৃথিবী হয়েছে আলোকোজ্জ্বল। মানুষ পেয়েছে চিরস্থায়ী সফলতার সোপান। তাঁর জন্মে আমরা যেমন খুশি, তাঁর মৃত্যুতেও আমরা মর্মাহত। কিন্তু তাই বলে তাঁর জন্ম বা মৃত্যুদিবস পালন করতে হবে, এ কথা তো তিনিও বলে যাননি। বরং আমাদের উচিত তাঁর মহান আদর্শকে বুকে ধারণ করা। তাঁর সুন্নাহকে মাড়ির দাঁত দ্বারা মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরা। তাঁর রেখে যাওয়া মিশনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তাঁর পক্ষ থেকে আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালন করা। বিশেষ করে এই রবিউল আউয়াল মাসে তাঁর মহান জীবনী আলোচনা-পর্যালোচনা করা ও নিজেদের জীবনে তাঁর মহান আদর্শকে বাস্তবায়ন করা। তাতেই প্রমাণ হবে সত্যিকারের নবিপ্রেম।

এই বিভাগের আরও খবরঃ