website page counter আহা শিক্ষক, হায় শিক্ষক - শিক্ষাবার্তা ডট কম

শুক্রবার, ১৫ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৩০শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

আহা শিক্ষক, হায় শিক্ষক

কাকন রেজা :

একটা সংখ্যক শিক্ষকদের কর্মকান্ডে আমি হুমায়ূন আহমেদের মতই হতাশ বরাবর। হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, আইয়ুব খানের উর্দু হরফে বাংলা লেখার প্রকল্পে এনারাই দলবেঁধে যোগদান করেছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তীতেও এনাদের একই চেহারা দৃশ্যমান হয়েছে। গণতান্ত্রিক ধারণাকে বিসর্জন দিতে তাদের মুহূর্তও লাগেনি এবং বাধেনি। এখনো তাদের সে রূপ প্রকাশ্য।

একজন ভিসি প্রশ্নে অনেকে বলেছেন, ‘শিক্ষক এত বেহায়া হতে পারে, নির্লজ্জ হতে পারে!’ না, বিস্ময়ের কোনো কারণ নেই। নির্লজ্জ বেহায়ারা যেমন আছেন, বিপরীতে হায়া এবং শরম নিয়েও অনেকে আছেন। ব্যাখ্যা দিচ্ছি, একদল বেহায়া আর নির্লজ্জ হচ্ছেন অর্থ আর প্রভাবের লোভে। আরেকদল হায়া ও শরম নিয়ে বসে আছেন ঘরে, যাতে তাদের কোনো ফ্যাসাদে পড়তে না হয়। আর তৃতীয়পক্ষ মার খাচ্ছেন মাঠে। গণমাধ্যম তুলে ধরছে মার খাওয়া শিক্ষকের মাটিতে পড়ে থাকা ছবি। খবর হচ্ছে, পরীক্ষার সময় শেষ হবার পর বাড়তি সময় না দেয়ায় শিক্ষক লাঞ্ছিত ও প্রহৃত হবার ঘটনা।

এ ছবি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটাই মাটিতে পড়ে যাবার দৃশ্য। এ খবর শিক্ষা ব্যবস্থারই লাঞ্ছিত হবার বর্ণনা। একপক্ষ আগ্রাসী, অন্যপক্ষ অতি ভদ্র গৃহবাসী, কিংবা গুহাবাসী। আরেকপক্ষ ‘না ঘরকা না ঘাটকা’। তাদের কপালে জুটছে লাঞ্ছনা আর মারধর। তবে এই লাঞ্ছনার সয়ে নেয়া অপমান, মারের জেগে থাকা দাঁগ এগুলো কিছুই বৃথা যাবে না। আগ্রাসী ও গৃহবাসী সবাইকে ইতিহাস একসময় এক-কাতারে দাঁড় করাবে। ধর্ম যেমন বলে, জুলুমকারী ও জুলুম সহ্যকারী প্রায় সমকক্ষ, ঠিক তেমনি ইতিহাস নিশ্চিত তাদের এভাবেই চিহ্নিত করবে।

শিক্ষকদের উদাহরণ টানতে গেলে, বলতে হয় কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। সাম্প্রতিক সময়ে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি’র ছাত্র সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধী ছাত্রদের একহাত দেখিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে বিপুল সংখ্যক বহিরাগত নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের এই কুচেষ্টা সর্বাগ্রে ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই। দলমত নির্বিশেষে তারা হাতে হাত রেখে মানবপ্রাচীর তৈরি করেছিলেন যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে হলে তাদের মাড়িয়ে যেতে হয়। ফলে ওই ছাত্র সংগঠনের পান্ডাদের আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকা হয়নি। তবু মন্দের ভালো, তারা অন্তত শিক্ষকদের মাড়িয়ে যায়নি। ভূমিশয্যা নিতে হয়নি কোনো শিক্ষককে।

সাম্প্রতিক সমযে এমন ঘটনা দেখানতো, যেখানে আক্রান্ত হবার আগে প্রতিরোধে সারি বেঁধেছেন শিক্ষকরা। অবশ্য আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ডের পর বুয়েটের শিক্ষকদের একটা বড় অংশ জোটবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু সেটা ছিলো ‘চোর যাবার পর বুদ্ধি বাড়া’র মতন অবস্থা। একজন ছাত্র যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে, তখন তার নিরাপত্তার দায়িত্বটা অর্পিত হয় শিক্ষকদের উপরই। একজন অভিভাবক তাদের জিম্মাতেই সন্তানকে অর্পন করেন। অথচ আমরা অনেক ক্ষেত্রেই দেখছি তার উল্টো চিত্র। এসব চিত্র আরো ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায় যখন শিক্ষক বা শিক্ষকেরা নিজেদের স্বার্থে, প্রভাব রক্ষায় একদল ছাত্রকে আরেকদলের উপর লেলিয়ে দেন। ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা’র মতন বাঁকা কৌশল প্রয়োগ করেন।

দক্ষিণ এশিয়ায় বিশাল এক জনগোষ্ঠীর শিক্ষা শুরু হয়েছিলো ‘টোলে’র মাধ্যমে। মূলত ধর্ম শিক্ষার পাশাপাশি পার্থিব শিক্ষাও দেয়া হতো ‘টোল’ নামক সেসব বিদ্যালয়ে। যেথায় শেখানো হতো, মানুষকে রক্ষার মন্ত্র, মানুষ হবার তন্ত্র। সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে বলা হতো আচার্য। তারই পরিবর্তিত রূপ এখনকার উপাচার্য। অবশ্য পরিবর্তনের সাথে সেই উপাচার্য অনেকের আচরণও পরিবর্তিত হয়েছে বিস্ময়কর ভাবে। লোভ, হিংসা, ক্রোধ জয়ের শিক্ষার পরিবর্তে এখনের সেই আচার্যরা লোভ, হিংসা আর ক্রোধ এই তিনগুনের সমন্বয়ক হয়ে দাঁড়িয়েছেন, শিষ্যদের শেখাচ্ছেন সমন্বয়ের ক্রুর বিদ্যাই। বলিহারি সেসব শিক্ষাগুরুদের এমন পরিবর্তনে।

পুনশ্চ : যারা শিক্ষকদের তথা ‘উপাচার্য’দের লোভের মাত্রা নিয়ে চিন্তিত। যারা তাদের ধনসঞ্চয়ের নানাবিধ পন্থা দেখে বিস্মিত, তারা এরিস্টটলকে স্মরণে নিয়ে সান্তনা পেতে পারেন। মহামতি এরিস্টটল বলেছেন, ‘জ্ঞানীরা ধনসঞ্চয় করেন ধনীদের মুখাপেক্ষী না হবার জন্য’। আমাদের অত্যাশ্চর্য ‘উপাচার্য’গণ হয়তো তেমনটা ভেবেই সঞ্চয় করছেন!

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

এই বিভাগের আরও খবরঃ