website page counter এমপিও বিতর্কঃ দুই নম্বর কাজ হলো এক নম্বর পদ্ধতিতে - শিক্ষাবার্তা ডট কম

শুক্রবার, ১৫ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৩০শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

এমপিও বিতর্কঃ দুই নম্বর কাজ হলো এক নম্বর পদ্ধতিতে

দীর্ঘ ৯ বছর পর এমপিওভুক্তির বন্ধ দরজা খুলছে ২০১৯ সনের ২৩ অক্টোবর রোজ বুধবার দুপুর ১২টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে ২৭৩০টি প্রতিষ্ঠান এম,পি,ও ভুক্তির ঘোষণা দেন। এর মধ্যে প্রায় প্রচুর বিতর্কিত অথবা প্রায় অস্তিত্বহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবার এমপিওভুক্ত হয়েছে। ভাড়া বাড়ীতে পরিচালিত, শিক্ষার্থী নেই, পাস নেই, স্কুল ঘর নেই এবং সরকারি হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানও এমপিও পেয়েছে। এমপিওভুক্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানও এমপিওভুক্তির তালিকায় স্থান পেয়েছে। যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামী, শান্তি কমিটির নেতা এবং বিএনপি-জামায়াত নেতাদের প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও এমপিও পেয়েছে। এতে বোঝা যায় তালিকা যাচাই-বাছাই কতটা উদাসীনভাবে হয়েছে।

উদাহরন স্বরুপ পঞ্চগড়ের আটোয়ারি উপজেলার সন্দেশদীঘি নিম্ন-মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে ৩ বছরে ২০ জন জেএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। একই জেলার বোদা উপজেলার ঝলইশাল শিরি ইউনিয়নের নতুন হাট টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। নীতিমালা অনুযায়ী চার শর্ত পূরণ করলে এমপিও পাওয়া যায়। শর্তগুলো হল- প্রতিষ্ঠানের বয়স বা স্বীকৃতির মেয়াদ, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ও পাসের হার। প্রতিটি পয়েন্টে ২৫ করে নম্বর থাকে। কাম্য শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এবং স্বীকৃতির বয়স পূরণ করলে শতভাগ নম্বর দেয়া হয়। সর্বনিম্ন ৭০ নম্বর পাওয়া প্রতিষ্ঠানও এমপিওভুক্তির জন্য বিবেচিত হয়েছে। এবারে আবেদন করা প্রায় ৭২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান যোগ্যতা ও শর্তপূরণ করতে না পারায় এমপিও পায়নি।

কিন্তু বাস্তবে অনেক নতুন এমপিও ভুক্ত প্রতিষ্ঠানের তথ্যের সাথে বাস্তবতার মিল পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিটি জেলায় মাউশিতে নিম্ন মাধ্যমিক স্তর, মাধ্যমিক স্তর, উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ, স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ডিগ্রি স্তর, মাদ্রাসার দাখিল, আলিম, ফাজিল, কামিল ও কারিগরির এস,এস,সি ভোকেশনাল, এইচ.এস.সি বি.এম, কৃষি ডিপ্লোমা সহ মোট ১২টি স্তরে এমপিও প্রদান করা হয়। শুধুমাত্র ১টি জেলার ১টি স্তরের উদাহরন স্বরুপ বলা যায় এস,এস,সি ভোকেশনাল শিক্ষাক্রমে পটুয়াখালী জেলায় ২টি মাত্র প্রতিষ্ঠানের ১টি করে ট্রেড এমপিওভুক্ত হয় যার মধ্যে একটি পটুয়াখালী সদর উপজেলার মরিচবুনিয়া টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউটের জেনালের ইলেকট্রনিক্স ট্রেড যার ২০১৭ সনে পরীক্ষার্থী ছিল ২০জন, ও পাশ করেছিল ১২জন, ২০১৮ সনে পরীক্ষার্থী ছিল ৩০জন, ও পাশ করেছিল ২০জন, একই ভাবে মির্জাগঞ্জ উপজেলার সমবায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিভিল কন্সট্রাকশন ট্রেড যার ২০১৭ সনে পরীক্ষার্থী ছিল ৮জন, ও পাশ করেছিল ৫জন, ২০১৮ সনে পরীক্ষার্থী ছিল ১৭জন ও পাশ করেছিল মাত্র ৩জন।

এখানে দেখা যাচ্ছে ২০১৮সনে মরিচবুনিয়া টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউটের জেনালের ইলেকট্রনিক্স ট্রেড এর ২০ জন শিক্ষার্থী ও সমবায় আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিভিল কন্সট্রাকশন ট্রেড এর ৩ জন শিক্ষার্থী পাশ করার পর এমপিও ভুক্ত হয় । তাহলে পটুয়াখালী জেলার অন্যান্য এস.এস,সি ভোকেশনাল শিক্ষাক্রম পরিচালনাকারী প্রতি ট্রেডে ১০জন শিক্ষার্থীর অধিক পাশকরা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে একটা তুলনামুলক বিবরণ প্রদান করা যেতে পারে । মির্জাগঞ্জ উপজেলার ঝাটিবুনিয়া ম ই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জেনারেল ইলেকট্রিক্যাল ওয়াকর্স ট্রেড যার ২০১৭ সনে পরীক্ষার্থী ৩৪জন ও পাশ ৩২জন, ২০১৮ সনে পরীক্ষার্থী ২৩জন, ও পাশ ৫জন। কলাপাড়া উপজেলার নাওভাঙ্গা সালেহিয়া আলিম মাদ্রাসার ফ্রুট এন্ড ভেজিটেবল কালট্রিবেশন ট্রেড যার ২০১৭ সনে পরীক্ষার্থী ১১জন ও পাশ ৭জন, ২০১৮ সনে পরীক্ষার্থী ১৭জন, ও পাশ ১০জন

। লালুয়া জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জেনারেল ইলেকট্রিক্যাল ওয়াকর্স ট্রেড যার ২০১৭ সনে পরীক্ষার্থী ৬জন ও পাশ ৪জন, ২০১৮ সনে পরীক্ষার্থী ১৮জন ও পাশ ৯জন। গলাচিপা উপজেলার বাঁশবাড়ীয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ফ্রুট এন্ড ভেজিটেবল কালট্রিবেশন ট্রেড যার ২০১৭ সনে পরীক্ষার্থী ১৯জন ও পাশ ১৫জন, ২০১৮ সনে পরীক্ষার্থী ২৯জন ও পাশ ২৫জন, ২০১৮ সনে ভর্তি ৩০জন। সদর উপজেলার বদরপুর শহীদ স্মৃতি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি ট্রেড ২০১৮ সনে পরীক্ষার্থী ৪১জন ও পাশ ১৯জন। দুমকী উপজেলার উত্তর শ্রীরামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জেনারেল ইলেকট্রিক্যাল ওয়াকর্স ট্রেড যার ২০১৭ সনে পরীক্ষার্থী ১৩জন ও পাশ ১৩জন, ২০১৮ সনে পরীক্ষার্থী ৬জন ও পাশ ৪জন।

উপরোক্ত বিশ্লেষন থেকে দেখা যায় ১ম বাশবাড়ীয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২য় মরিচবুনিয়া টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট, ৩য় ঝাটিবুনিয়া ম ই মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৪র্থ বদরপুর শহীদ স্মৃতি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এমপিও ভুক্ত হওয়ার যোগ্য ছিল । কিন্তু সেখানে শুধুমাত্র মরিচবুনিয়া টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউটকে এমপিও ভুক্ত করা হয়, অপরদিকে নীতিমালায় অনেক পিছিয়ে থাকা মির্জাগঞ্জ উপজেলার সমবায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়টিকে এমপিও ভুক্ত করা হয়। এক্ষেত্রে যদি উল্লেখিত সকল প্রতিষ্ঠান সমুহকে যদি এমপিও ভুক্ত করা হত তবে কোন প্রকার সমালোচনার অবকাশ থাকত না ।

বেশির ভাগ অযোগ্য ও অস্বিস্তবিহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমুহ দুইটি পদ্ধতি অবলম্বন করে এমপিও অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে । এর মধ্যে প্রথমটি হলোঃ স্বীকৃতি পাওয়ার পর পরই প্রতিষ্ঠান সমুহ কোন প্রকার শিক্ষক নিয়োগ শিক্ষার্থী ভর্তি না করে শুধু মাত্র ই.এম.আই.এস ও ব্যানবেইসে মিথ্যা ও মনগড়া তথ্য এন্ট্রি করা । অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী ভর্তি না করেও তাহার অনলাইনে ব্যানবেইস অথবা ই.এম.আই.এস এ বরাদ্দকৃত কোটার সিংহ ভাগ ভর্তি দেখিয়েছেন । তথ্য পুরণ করার সময় শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রেরণের জন্য কোন প্রকার প্রমানের দরকার হয়নি বিধায় এটা করা সম্ভব হয়েছে ।

অযোগ্য ও অস্বিস্তবিহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমুহ অনেক ক্ষেত্রে ই.এম.আই.এস ও ব্যানবেইসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির স্থাপনের তারিখ নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী পরিবর্তন করে মিথ্যা ও মনগড়া তথ্য এন্ট্রি দিয়েছেন । প্রতিষ্ঠান প্রধানরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীরও পরীক্ষার জন্য ফরম পুরন না করে ও পরীক্ষায় পরীক্ষার্থী অংশ গ্রহন না করিয়ে অনলাইনে ব্যানবেইস অথবা ই.এম.আই.এস এ তাদের ইচ্ছা মাফিক পরীক্ষার্থী ও পাশের সংখ্যা এর পাশের হার বসিয়ে দিয়েছেন । এক্ষেত্রেও ডাটাএন্টির সময় ব্যানবেইস অথবা ই.এম.আই.এস এ ফলাফল সিটের প্রয়োজন হয়নি ।

এখন এ সমস্যা থেকে পরিত্রান পাওয়ার জন্য (১) নতুন এমপিও ভুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রথম স্বীকৃতি সরাসরি বোর্ড থেকে সংগ্রহ করা প্রয়োজন। (২) যে সকল শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীর ভর্তির সংখ্যা দেখানো হইয়াছে, ঐ সকল বর্ষে প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনের প্রিন্ট আউট ও টাকা জমাদানের রশিদের মুল কপি সরাসরি বোর্ড থেকে সংগ্রহ করা প্রয়োজন । (৩) পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ও পাশের সংখ্যার সঠিক হিসাব সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট বছরের ফলাফল সীট সরাসরি বোর্ড থেকে সংগ্রহ করা প্রয়োজন । (৪) এছাড়া প্রতিষ্ঠান সমুহ নিজস্ব জমিতে স্থাপন করা রয়েছে কিনা তা প্রমানের জন্য জেলা শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে সাব রেজিষ্ট্রি অফিস থেকে প্রত্যয়ন পত্র সংগ্রহ করতে হবে । এখানে যদি সরাসরি বোর্ড বা জেলা শিক্ষা অফিস থেকে তথ্য সমুহ সংগ্রহ না করে প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করা হয়, তবে পুনরায় টেম্পারিং বা জাল জালিয়াতির সুযোগ থাকবে । এছাড়া ভবিষ্যতে ব্যানবেইস অথবা ই.এম.আই.এস ডাটাএন্ট্রির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ও পাশের সংখ্যা সরাসরি বোর্ড থেকে সংগ্রহ করার জন্য অনুরোধ জাননো হচ্ছে।

দ্বিতীয়টি যদি হয় তবে তা হবে রাষ্ট্রে বিরুদ্ধে মারাত্মক ষড়যন্ত্রের সামিল, এটি না হলেই ভাল । ব্যানবেইসে প্রাথমিক ভাবে সঠিক তথ্য প্রদানের পর, ব্যানবেইস এর অসাধু কর্মকর্তা অথবা কর্মচারী কর্তৃক যদি অনলাইনের তথ্য পরিবর্তন করে এমপিও অর্জন করতে সক্ষম হয়। এ ব্যাপারে সন্দেহ দুর করার জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের এমপিও জন্য আবেদনকৃত অনলাইন আবেদনপত্র খানা তারিখসহ মুল কপি সরাসরি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের বিভাগে জমা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহন করা । আবেদনের তারিখে যে তথ্য ছিল আর এমপিও ফলাফল যে তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে তা মিলিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরী । এক্ষেত্রে ইতিপুর্বে যারা দায়িত্বে ছিল তাদের অব্যহতি দিয়ে নতুন করে কমিটি করে তথ্য সমুহ পর্যালোচনা করা বিতর্ক অনেকাংশে কমে যাবে ।
অধিদপ্তর কর্তৃক এমপিও প্রদানের লক্ষ্যে শিক্ষকদের তথ্য সংগ্রহ করার পুর্বে উপরোক্ত বিষয় সমুহ পর্যালোচনা করে যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করে সত্যিকারের যোগ্য প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হলে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে ।

লেখক-

প্রকৌশলী রিপন কুমার দাস
কলাম লেখক ও ট্রেড ইন্সট্রাক্টর
ডোনাভান মাধ্যমিক বিদ্যালয়,
পটুয়াখালী।

এই বিভাগের আরও খবরঃ