website page counter বাংলাদেশে রোভার অঞ্চল ও রোভার ফারুক হোসেন - শিক্ষাবার্তা ডট কম

শুক্রবার, ২১শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে রোভার অঞ্চল ও রোভার ফারুক হোসেন

রফিকুল আলম, মেহেরপুর।।

আজ ২৩ শে অক্টোবর, বাংলাদেশের রোভার স্কাউট সদস্যদের কাছে একটি শোকাবহ দিন ২৩ শে অক্টোবর। ১৯৯৭ সালের ২৩ শে অক্টোবর দিনটি ছিলো রোভার লীডার এবং রোভার স্কাউটস সদস্যদের সবার কাছে একটি স্বপ্নের দিন ছিলো। সিলেটের লাক্কাতুরা চা বাগানে ১৯৯৭ সালে অনুষ্ঠিত ৯ম এশিয়া প্যাসিফিক ও ৭ম বাংলাদেশ রোভার মুট এ অংশগ্রহন করার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল মেহেরপুর জেলা রোভারের ৪ টি টিমে ৩৬ জন সদস্য।

রোভার মুটে অংশগ্রহনের জন্য মেহেরপুর জেলার রোভাররা আনন্দের ক্ষন গুনতেছিল আর সেই সাথে রোমাঞ্চ অনুভব করছিলো। অবশেষে এসে গেল ১৯৯৭ সালের ২৩ শে অক্টোবরের সেই দিনটি। রোভার মুটে অংশগ্রহনকারীরা বাড়ী থেকে বিদায় নিয়ে জমায়েত হয় মেহেরপুর সরকারি কলেজ চত্বরে। আনন্দঘন পরিবেশে মুটে অংশগ্রহনকারী চারটি দল মেহেরপুর সরকারি কলেজ রোভার দল, মুজিবনগর সরকারি কলেজ রোভার দল, মেহেরুল্লা মুক্ত রোভার দল, ও মুন্সি জমিরউদ্দীন মুক্ত রোভার দল উপস্থিত হলো।

১৯৯৭ সালের ২২শে অক্টোবর রাত ৯.০০ টার সময় চারটি দলের মোট আটজন করে রোভার এবং একজন রোভার নেতা সহ রিজার্ভ করা হয় একটি মিনিবাস। মেহেরপুর সরকারি কলেজ থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। ফেরীঘাটে দীর্ঘসময় যানজটে আটকে থাকার পর গাড়িটি ঘাট পার হয় তখনও রোভার সদস্যের কেউ ঘুমায়নি সারারাত আনন্দ উল্লাস করে সময় পার করছিলো। কেউ ভাবতে ও পারেনি তাদের জন্য সামনে কি ভয়াবহ সময় অপেক্ষা করছিল। ফেরী পার হওয়ায় পর সবার চোখে তখন ঘুমের ভাব এসেছিল সেই সময় আর কোন যানজট ছিল না।

ড্রাইভার গাড়ির গতি বাড়িয়ে যাচ্ছিলেন। সে সময় মেহেরপুর সরকারি কলেজের শরীরচর্চা শিক্ষক হাজী রমজান আলী ড্রাইভারকে গাড়ি ধিরে চালানোর জন্য অনুরোধ করার পরও তিনি র্কণপাত করেননি। ২৩ শে অক্টোবর ভোরে রোভারদের বহনকারী গাড়িটি ধামরাই এর জয়পুর নামক স্থানে পৌছলে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলেই পাঁচজন রোভার মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা সমগ্র বাংলাদেশের রোভারদের জন্য শোকাবহ হয়ে ওঠে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মেহেরপুর সরকারি কলেজের রমজান আলী, মুজিবনগর কলেজের আনোয়ার স্যারসহ অনেকেই আহত হয় তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুতর আহত হয় মেহেরপুর সরকারি কলেজের রোভার ফারুক হোসেন।

ঘটনাস্থলে নিহত হন রোভার মোঃ মাসুম হোসেন, মোঃ মনিরুল ইসলাম, মাহফুজুর রহমান মাফুজ, জাভেদ ওসমান, পিএস ও রোভার এস এম আমিনুল ইসলাম। লাক্কাতুরা ক্যাম্পে যখন এ খবর পৌছায় তখন সেখানে নেমে আসে শোকের ছায়া। ২৩ তারিখ সেখানে শোক পালন করা হয়। বাংলাদেশের রোভার স্কাউটস ইতিহাসে এই দিনটি চিরদিন স্বরণীয় হয়ে থাকবে। সবচেয়ে বেশী আহত হয় ফারুক হোসেন তখন মেহেরপুর সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র এবং রোভার দলের একজন সক্রিয় সদস্য। সেদিন সম্পর্কে ফারুক বলেন, ২৩ শে অক্টোবর ভোর হবার কিছুক্ষণ আগে আমি ঘুমিয়ে যায়, যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন হাসপাতালের বেডে। প্রথমে আমি কিছুই মনে করতে পারছিলাম না।

পরে জানতে পারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমি দীর্ঘ ৭৫ দিন অচেতন অবস্থায় ছিলাম। আমার যখন জ্ঞান ফিরে আসে তখন আমার অবস্থা সদ্য ভুমিষ্ট শিশুর মতো। আমার নিজে থেকে কোন কাজ করার ক্ষমতা ছিলোনা। ওঠা, বসা, খাওয়া, কথা বলা, লেখার কোন ক্ষমতা ছিলোনা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘ তিনমাস আমি বিছানায় কাটিয়েছি। আমার সবচেয়ে বেশী আঘাত লেগেছিল মাথাসহ বামপাশে। কানসহ অর্ধেক জায়গায় কোন চামড়া ছিলনা ।

পায়ের উরু থেকে চামড়া নিয়ে পরে সেখানে প্রতিস্থাপন করা হয়। আমি যতদিন বেচে থাকবো ততদিন আমাকে এই স্মৃতি মনে থাকবে। সেই সময় মাননীয় রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ আমাকে দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন বৃটেন সফররত তিনি সেখান থেকে শোকবার্তা পাঠিয়েছিলেন এবং নিয়মিত খোঁজ খবর নিতেন । বাংলাদেশ রোভার অঞ্চলের সম্মানিত স্যাররা সবসময় আমার সমস্ত দায়িত্ব নিয়ে আমার পাশে থেকে সহযোগিতা করেছেন। আমি আল্লাহর অশেষ রহমতে সকল প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে লেখাপড়া সম্পন্ন করেছি।

তিনি আরও বলেন, স্কাউটস আমার প্রাণ, আমার বাঁচার অনু প্রেরণা। ফারুক হোসেন বর্তমানে মুজিবনগর উপজেলার আনন্দবাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন । তিনি ২০১৮ সালে জেলার শ্রেষ্ট শিক্ষক নির্বাচিত হন। এ বছরে সরকারিভাবে ভিয়েতনাম সফর করেন। তিনি বর্তমানে কাব শাখাতে উডব্যাজ প্রাপ্ত হয়ে উপজেলা লিডারের দায়িত্বে আছেন। তিনি বলেন চেষ্টা ও ইচ্ছা থাকলে অনেক কিছু জয় করা যায় তার বড় প্রমাণ আমি নিজেই। আল্লাহু আমাকে সে সুযোগ করে দিয়েছেন।

মর্মান্তিক সেই দিনটিকে স্বরণ রেখে বাংলাদেশ স্কাউটস রোভার অঞ্চলের একটি প্রতিনিধি দল ২০১৮ সালের ২৩ শে অক্টোবর মেহেরপুর জেলার শহীদ রোভারদের স্মতিসৌধে পুস্পমাল্য অর্পন করেন, দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে শরীক হন। রোভার অঞ্চলের পক্ষ থেকে শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং শুভেচ্ছা উপহার এবং প্রাইজবন্ড প্রদান। ১৯৯৭ সাল থেকে মেহেরপুর জেলা রোভার প্রতিবছর এই দিনটি পালন করে আসছে। সেই থেকে জেলা রোভারের দাবী ছিল এই দিনটি রোভার অঞ্চল পালন করার।

দীর্ঘদিনের দাবীর সাথে একমত হয়ে রোভার অঞ্চলের সম্পাদক প্রফেসর এ কে এম সেলিম এবং রোভার অঞ্চলের যুগ্ম সম্পাদক প্রফেসর কে এম এ এম সোহেলের নেতৃতে প্রতিবছর রোভার অঞ্চল এই দিনটিকে রোভার অঞ্চল তাদের কর্মসূচী হিসেবে পালন করবে। যা মেহেরপুর জেলা রোভারের জন্য অত্যান্ত গর্বের বিষয়।

স্বাধীনতার পুন্যভুমি মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সেই মুজিবনগর তথা মেহেরপুরের জন্য এটাও একটি বড় পাওয়া। ৫ জন শহীদ রোভারের জন্য মেহেরপুরের নজরুল শিক্ষা মঞ্জিলে নির্মিত হয়েছে শহীদ রোভার স্মতিসৌধ। তাদের কবরগুলো আছে মেহেরপুর পৌর কবরস্থানে। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও মেহেরপুর জেলা রোভার ব্যাপক কর্মসূচী পালন করবে।

তার মধ্যে রয়েছে সরকারীভাবে স্মৃতিসৌধে পুষ্পমাল্য অর্পন, দোয়া মাহফিল ও আলোচনাসভা। মেহেরপুর জেলা প্রশাসক আতাউল গনি সকল কর্মসূচীতে উপস্থিত থাকবেন । ঢাকা থেকে আসবেন কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল। রোভার অঞ্চলের প্রতিনিধি দলের উপস্থিতিতে শহীদ রোভারদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরও ঐ দিনের বিভিন্ন ঘটনা যারা স্বচক্ষে দেখেছিলেন তাদের কাছ থেকে বর্তমান রোভাররা সেদিনের সেই দুঃসহ স্মৃতি জানতে পারবে। তাদের স্বরণে মেহেরপুর পৌরসভার বিভিন্ন সড়কের নাম করণ করা হয়েছে।

সে দিনের গুরুতর আহত ফারুক বলেন, যারা ঐ দিন নিহত হয়েছিলেন তাদের নামে যদি কোন শিক্ষা বৃত্তি চালু করা যেত তবে আমাদের রোভাররা আরও উজ্জীবিত হতো। এছাড়া দুর্ঘটনার পর থেকে মেহেরপুরের কোন অভিভাবক রোভারিং করতে ছেলেমেয়েদের দিতে চাইতো না। দীর্ঘ সময় মেহেরপুর জেলা রোভার এ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলো। আস্তে আস্তে সে সমস্যা কাটিয়ে উঠছে মেহেরপুর জেলা রোভার।

এখন মেহেরপুরের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রোভারিং চালু আছে। মেহেরপুরে রোভারের আজও নিজস্ব কোন অফিস নেই । জেলা পর্যায়ে রোভারের কোন অফিস না থাকায় রোভারিং এর কার্যক্রমে অনেক সমস্যা হচ্ছে। রোভারের সাথে জড়িত সকলের প্রত্যাশা মেহেরপুরে রোভার বিল্ডিং করার জন্য একটি জায়গা দরকার। সরকারী বা বে-সরকারি যে ভাবেই হোক একটি জায়গার ব্যবস্থা করা হোক মেহেরপুর জেলা রোভার জন্য তবেই মেহেরপুর জেলা রোভার আরও গতি পাবে।

এই বিভাগের আরও খবরঃ