website page counter বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটিগুলো চলছে যেভাবে - শিক্ষাবার্তা ডট কম

শুক্রবার, ২১শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটিগুলো চলছে যেভাবে

নিজামুল হক।।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা তদারকি এবং লেখাপড়ার মান নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ধারণা থেকে পরিচালনা পর্ষদের সৃষ্টি। যে কারণে সরকার স্কুলের জন্য ম্যানেজিং কমিটি ও কলেজের জন্য গভর্নিং বডি বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। বিধিমালায় ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির ১৬টি দায়িত্ব পালনে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে এ পরিচালনা কমিটি কোথাও ভালো কাজ করছে, আবার কোথাও প্রতিষ্ঠানটিকে নিজেদের পকেট ভারী করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। শহরের প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ অনিয়মের পাল্লা ভারী হলেও গ্রামে উলটো চিত্র দেখা গেছে। জানা গেছে, কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের বোঝা বাড়িয়েছে। নিয়োগ ও ভর্তিবাণিজ্য এবং প্রতিষ্ঠানের ফান্ড থেকে বেনামে টাকা খরচ করা ছাড়া তাদের খুব একটা দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায় না। এছাড়া অন্য দায়িত্বগুলোর প্রতিও তাদের আগ্রহ নেই। অন্যদিকে অসংখ্য ভালো উদাহরণও রয়েছে। উপজেলা ও জেলা সদরে, গ্রামাঞ্চলে এমন প্রতিষ্ঠানও আছে যেখানে গভর্নিং বডির সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে স্কুলগুলোতে আর্থিক সহায়তা দেন। এমনকি শিক্ষার্থীদের টিউশন ফিও মওকুফ করে দিয়েছেন। শিক্ষার মান উন্নয়নে নিয়মিত কার্যকর ভূমিকা রাখছেন তারা।

কমিটির দায়িত্ব : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে : প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি, ভবন, খেলার মাঠ, বই, ল্যাবরেটরি, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করা। প্রতিষ্ঠানের তহবিল সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা। ডোনেশন সংগ্রহ, শিক্ষক নিয়োগ, সাময়িক বরখাস্ত ও অপসারণ, বার্ষিক বাজেট অনুমোদন ও উন্নয়ন বাজেট অনুমোদন, ছাত্রছাত্রীদের বিনা বেতনে অধ্যয়ন মঞ্জুরি, ছুটির তালিকা অনুমোদন, ছাত্রছাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত স্থান সংকুলান ও স্টাফদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, বিভিন্ন ধরনের আর্থিক তহবিল গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণ, স্কুলের সম্পত্তির কাস্টোডিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে প্রদান নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের নিয়ে প্রি-সেশন সম্মেলনের ব্যবস্থা করা।

যেভাবে অনিয়ম :শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনিয়ম বেশি হচ্ছে। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানের সব লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের সঙ্গে ব্যাংক চেকে সভাপতির স্বাক্ষর থাকতে হয়। আর এই লেনদেন ইচ্ছেমতো করেন সভাপতি। বিভিন্ন খাতে ব্যয় দেখিয়ে তছরুপ করা হয় প্রতিষ্ঠানের ফান্ড। প্রধান শিক্ষক কোনো কাজে স্বাক্ষর না দিতে চাইলে তাকে হয়রানি, এমনকি চাকরিচ্যুত করা হয়। কখনো গভর্নিং বডির সঙ্গে মিলেমিশে অনিয়ম করেন প্রধান শিক্ষক কিংবা অধ্যক্ষ। এছাড়া এতদিন সহকারী শিক্ষক ও প্রভাষক পদে নিয়োগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতেন তারা। দক্ষতার চেয়ে টাকাকেই বড়ো করে দেখতেন। কিন্তু বর্তমানে এন্ট্রি পদে নিয়োগের ক্ষমতা সরকার নিয়ে নেওয়ায় এখন অন্য পদগুলোতে ঠিকই বড়ো অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেন তারা। এ কাজগুলোর বাইরে আর কোনো দায়িত্বই পালন করেন না ম্যানেজিং কমিটি এবং গভর্নিং বডির সদস্যরা। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লেখাপড়ার উন্নয়নে কোনো পরামর্শও দেন না তারা। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, এ কমিটি কি শুধু টাকা-পয়সা ভাগ-বাটোয়ারার জন্যই?

ভালো কিছু উদাহরণ :তবে গভর্নিং বডি স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করে এমন বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকার বাইরের একটি উপজেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কিরণ বসু জানান, তার প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের টিউশন ফি মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে। অর্থ আত্মসাত্ তো দূরের কথা, গভর্নিং বডির সদস্যরা প্রায়শই অনুদান দিয়ে থাকেন। স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুদান তো আছেই। তিনি মনে করেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের নজরদারি থাকলে গভর্নিং বডি অনিয়মের সুযোগ কম পায়। তার প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমনটি হচ্ছে বলে তিনি জানান।

অপর একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য সফিজ উদ্দিন মৃধা জানান, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা ঠিকমতো স্কুলে আসেন কিনা, শিক্ষার্থীরা উপস্থিত থাকে কিনা, লেখাপড়া ঠিকমতো হয় কিনা, তা নিয়মিত তদারকি করেন তিনি। অন্য উপজেলায় গভর্নিং বডির সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তার উপজেলায় এ অভিযোগ নেই।

অপর একটি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য মানিক হাওলাদার জানান, তার স্কুল তো দূরের কথা তার উপজেলার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই অনিয়মের সুযোগ নেই। তবে বিচ্ছিন্ন কিছু অনিয়ম হলেও হতে পারে বলে তিনি জানান।

অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সদস্যসচিব ও প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান এ প্রতিবেদককে জানান, তাদের এখানে কোনো অনিয়মের সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি। মামুন নামে এক অভিভাবক জানান, গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা জানেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রতিষ্ঠানের সব বিষয় মনিটরিং করছেন। এ কারণে অনিয়মের সুযোগ কম। জলিল হাওলাদার নামের এক অভিভাবক বলেন, ম্যানেজিং কমিটির কী কাজ জানি না। তবে আমাদের উপজেলার ম্যানেজিং কমিটি খুব একটা অনিয়ম করতে পারে না।

‘অভিযোগ প্রমাণিত হলেই কমিটি বাতিল’ : ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির অনুমোদন দেওয়া এবং বাতিল করার এখতিয়ার শিক্ষা বোর্ডগুলোর। এ বিষয়ে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বাতিল করার একাধিক নজির আছে। তিনি বলেন, যে প্রতিষ্ঠানে সভাপতি ও প্রতিষ্ঠানপ্রধান মিলেমিশে অনিয়ম করে, তা বাইরে প্রকাশ পায় না। কিন্তু যেখানে এই দুই জনের মধ্যে মিল থাকে না সেখানেই ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির অনিয়ম প্রকাশ পায়। তিনি আরো বলেন, কোনো কমিটির সভাপতি বা সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সংশ্লিষ্টদের নোটিশের মাধ্যমে অবহিত করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কমিটি বাতিল করা হয় বলে তিনি জানান।

প্রসঙ্গত, স্বাধীনতার পর থেকে ব্যক্তি উদ্যোগেই চলত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ১৯৮০ সাল থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়। তখন মূল বেতনের ৫০ শতাংশ দিত সরকার। এরপর তা বাড়তে থাকে। ২০০৪ সাল থেকে শতভাগ বেতনই দিচ্ছে সরকার। ১৯৭৭ সালে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ম্যানেজিং কমিটি বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। ২০০৯ সালে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা সংশোধন করে সরকার। এরপর আদালতের আদেশে এ বিধিমালা আরেকবার সংশোধন করা হয়।সুত্র ইত্তেফাক

এই বিভাগের আরও খবরঃ