website page counter ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা এবং সংস্কার প্রসঙ্গে - শিক্ষাবার্তা ডট কম

শুক্রবার, ২১শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা এবং সংস্কার প্রসঙ্গে

জুবায়ের আহমেদ
রাজনীতি দেশ ও জাতির কল্যাণের জন্য হলেও রাজনীতি এখন ক্ষমতার প্রদর্শনী ও ভোগ বিলাসের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। আর ছাত্ররাজনীতি পরিণত হয়েছে মানুষ মারার রাজনীতিতে, যার মাধ্যমে অকালেই নিঃশেষ হয়ে যায় বহু প্রাণের, বহু স্বপ্নের। সর্বশেষ ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র নেতাদের দ্বারা বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদের নির্মম হত্যাকা-ের পর আবারো প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক দলভিত্তিক ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজন আছে কিনা। সদ্য কলেজে পা রাখা ছাত্রটি দৈহিক গঠনে বেড়ে উঠলেও শিশুসূলভ আচরণ তার মধ্যে বিদ্যমান থাকা ছাড়াও রাজনীতি কেমন হবে, কিসের জন্য রাজনীতি এসব বুঝার আগেই ছাত্রছাত্রীরা ক্ষমতার দাপট কিভাবে দেখাতে হয়, ক্ষমতা কিভাবে কাজে লাগাতে হয়, সেসব শিখে ফেলে ছাত্ররাজনীতিতে থাকা বড় ভাইদের কল্যাণে, যার মাধ্যমে রাজনীতিতে করতে আগ্রহী ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়ার চেয়েও বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ে ক্ষমতার দাপটের দিকে। কলেজেই শুরু নয়, স্কুলভিত্তিক সংগঠনও রয়েছে এখন দেশে, যেখানে সরাসরি রাজনীতি না হলেও রাজনীতির কলাকৌশল, ক্ষমতার দাপট ঠিকই দেখা যায় ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে।

একটি ছাত্রকে নিয়ে পরিবারের অনেক স্বপ্ন থাকে। আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী পরিবারগুলোর সন্তানেরা রাজকীয়ভাবেই পড়ালেখা করলেও দরিদ্র পরিবারের মেধাবী ছাত্রদের কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির মাধ্যমে একটি স্বপ্নের ডালপালা মেলতে থাকে। লেখাপড়া শেষ করে পিতা-মাতার মুখ উজ্জ্বল করাসহ দরিদ্র পরিবারটির হাল ধরার স্বপ্ন থাকে ছাত্রটির মনে। কিন্তু ছাত্ররাজনীতির বিষাক্ত ছোবলে অকারণে বহু মেধাবীর প্রাণ ঝরে যাওয়াসহ বহু মেধাবী ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে নানা অপকর্মে জড়িয়ে স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ব্যাহত করার বহু নজির বাংলাদেশে বিদ্যমান, যার মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজনীয়তার চেয়ে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার দাবি জোরালো হয় বারবার।

রাজনীতি কোনো পেশা নয়, একজন মানুষ ভবিষ্যতে রাজনীতিবিদ হওয়ার জন্য ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে পা রাখলেও তাকে নিজ যোগ্যতায় ব্যবসা কিংবা চাকরির মাধ্যমেই জীবিকা নির্বাহ করতে হয়, আর রাজনীতিতে প্রবেশ করলেও রাজনীতি থেকে কোন অর্থ আসবে, এমন কোনো নিয়ম নেই, যারা রাজনীতি করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান, তারাই শুধুমাত্র বেতনসহ আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকে। কাজেই আদর্শিক রাজনীতি যেখানে অর্থের যোগান দেয় না এবং সেখানে দীর্ঘ সাত থেকে আট বছর ছাত্ররাজনীতিতে জড়িত থাকা কোনো অর্থবহ বিষয় নয়। একজন ছাত্রের মনে দেশ ও জাতির কল্যাণে রাজনীতিবিদ হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও সে তার লেখাপড়া সম্পন্ন করেও রাজনীতিতে যুক্ত হতে পারে, একজন ভালো রাজনীতিবিদ হওয়ার জন্য একজন ভালো মানুষের দরকার, ভালো বক্তা হওয়া দরকার, যার জন্য দীর্ঘ সাত থেকে আট বছর রাজনীতির প্রয়োজন হয় না।

রাজনীতির প্রয়োজনীয় বা অনেক ইতিবাচক দিক থাকলেও ছাত্ররাজনীতির শিকার হয়ে যেভাবে মেধাবী ছাত্ররা মৃত্যুবরণ করছেন এবং একটি পরিবারের স্বপ্ন ভাঙছে প্রতিনিয়ত সেখানে ছাত্ররাজনীতির হাজারটা সুফলের মাঝে একটি প্রাণও যদি ছাত্ররাজনীতির বলি হয়, সেই একটি প্রাণের মূল্যের কাছে ছাত্ররাজনীতির হাজারটা সুফল ও প্রয়োজনীয়তাও মূল্যহীন হয়ে যায়। যেহেতু ছাত্ররাজনীতির ফলে লেখাপড়ার ব্যাঘাত ঘটছে সারা বছর জুড়ে, শুধু হত্যাকা-ই নয়, ক্ষমতায় থাকা দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের অমানবিক ও আইন বিরোধী টর্চার সেলের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে সাধারণ ও বিরুদ্ধ মতের ছাত্রছাত্রীরা, যা দিন দিন বর্বরতায় রূপ নিচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র সংগঠনের হাতে ক্ষমতা না থাকলেও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য তারাও হিংস্র কর্মকা-ে লিপ্ত হচ্ছে, হত্যাকা-ের মতো ঘটনাও সংঘটিত হয় প্রায় সময়।

একজন ছাত্র কলেজ-ভার্সিটিতে পা রেখেই ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িয়ে আদর্শিক রাজনীতির চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতিতেই বেশি মনোযোগী হয়। ছাত্ররাজনীতি এখন ক্ষমতা ও ভোগের রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে, যার বলি হচ্ছে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা। কাজেই ছাত্ররাজনীতির কতটুকু প্রয়োজন তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। ছাত্ররাজনীতির শিকার হয়ে নিয়মিত ছাত্রছাত্রী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, মৃত্যুবরণ করবে, আন্দোলন হবে, প্রতিবাদ প্রতিরোধ হবে, বিচার হবে বা আসামিরা পার পেয়ে যাবে, এভাবে আর চলতে পারে না। এভাবে চললে সারা বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে লেখাপড়ার চেয়েও বেশি অরাজকতার পরিবেশ তৈরি হয়ে থাকবে, যেখানে শিক্ষার চেয়ে হাহাকার থাকে বেশি। সময় এসেছে কঠোরভাবে এসব দমন করার, গোড়াতে হাত দেয়ার কোনো বিকল্প নেই।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ছাত্ররাজনীতি ছিল সকলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে দেশের জন্য, ভাষার জন্য। ১৯৭১ পরবর্তী ‘৯০-এর স্বৈরাচার সরকার পতনের আন্দোলনেও অন্যান্য সকল রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলোর ঐক্যবদ্ধতার মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এরপরের চিত্রই ভিন্ন। ঐক্যবদ্ধতা বিনষ্ট হয়ে পরবর্তীতে ছাত্ররাজনীতি পরিণত হয়েছে নিজ নিজ দলের স্বার্থভিত্তিক, যেখানে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র শিবির, বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে বিরোধের রাজনীতি, যার সুফলের পরিবর্তে কুফলই দৃশ্যমান বেশি।

দেশ ও জাতির স্বার্থে রাজনীতির অবশ্যই প্রয়োজন আছে, ভালো ও মেধাবী ছাত্ররাই আগামীর রাজনীতির হাল ধরবে, তাই ছাত্র থাকাবস্থায় রাজনীতির নূ্যনতম প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে এইচএসসি থেকে অনার্স-ডিগ্রি পর্যন্ত ছাত্ররাজনীতি বাতিল করে শুধুমাত্র মাস্টার্সেই ছাত্ররাজনীতি বহাল রাখার নতুন নিয়ম করা দরকার। একজন ছাত্র দেশ ও জাতির কল্যাণের জন্য নিজেকে রাজনীতিতে নিয়োগ করার স্বপ্ন দেখলে সে স্বপ্ন এইচএসসি থেকে অনার্স-ডিগ্রি পর্যন্ত নিজের ভালো মনমানসিকতা, মানুষের কল্যাণে কাজকর্ম করার মাধ্যমে জিইয়ে রেখে মাস্টার্সে উত্তীর্ণ হবার পর ভবিষ্যৎ রাজনীতির প্রয়োজনে শুধুমাত্র মাস্টার্সেই ছাত্ররাজনীতি করবে। এইচএসসি থেকে দীর্ঘদিন ধরে বুকে লালিত স্বপ্ন পূরণের জন্য যখন একজন ছাত্র মাস্টার্সে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হবে, তখন তার মধ্যে বয়সে ও শিক্ষায় পরিণত বোধ তৈরি হবে, যেখানে ক্ষমতার রাজনীতি ও ভোগের রাজনীতি করার চেয়েও দেশ ও জাতির জন্য রাজনীতি করার স্পৃহা তৈরি হবে, যা দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর হতে পারে। ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজনীয়তাকে মূল্যায়ন করে তা শুধুমাত্র মাস্টার্সেই বিদ্যমান রাখার নতুন নিয়ম করার জোর দাবি জানাচ্ছি।

এই বিভাগের আরও খবরঃ