website page counter পরিচালনা পর্ষদ হোক শিক্ষাবান্ধব - শিক্ষাবার্তা ডট কম

সোমবার, ১৮ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

পরিচালনা পর্ষদ হোক শিক্ষাবান্ধব

সাহাদাৎ রানা :

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। একটি দেশকে সুখী সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তাই সব রাষ্ট্রই নিজেদের প্রয়োজনে তার শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেয়। এর বাইরে নয় বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রগতির জন্য নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এখনো সেই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কারণ শিক্ষা ব্যবস্থার বিষয়টা সময়ের সাথে পরিবর্তন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধন হয়। অর্থাৎ যুগের প্রয়োজনে এমন হওয়াটা স্বাভাবিক বিষয়।

স¤প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি পদ সংক্রান্ত প্রবিধানমালায় সংশোধনী আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতোমধ্যে এ সিদ্ধান্তটি অনুমোদনের জন্য শিক্ষামন্ত্রীর কাছে পাঠানোও হয়েছে। যদি এই সিদ্ধান্ত পাস হয় তবে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য পছন্দ অনুযায়ী ব্যক্তিকে সভাপতি মনোনীত করতে পারবেন।

যেখানে এর আগে নিয়ম ছিল সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি বা নাগরিককে সভাপতি করা হবে। এছাড়া আরো একটি প্রস্তাব আলোচিত হয়েছে। বিষয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিষয়ে। এখন থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হতে হলে ন্যূনতম স্নাতক পাস হতে হবে। পূর্বে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষা বা সার্টিফিকেটের কথা বলা ছিল না।

এখন দুটি প্রস্তাবের বিষয়ে আলোচনা করা যাক। কারণ দুটি বিষয়ই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। প্রথম প্রস্তবটি হলো- মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য পছন্দ অনুযায়ী ব্যক্তিকে সভাপতি মনোনীত করতে পারবেন। বর্তমানে যে প্রবিধানমালায় এই প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হচ্ছে তা ২০০৯ সালে করা হয়েছিল।

যেখানে সংরক্ষিত আসনের এমপি, জনপ্রতিনিধি, সরকারি/আধাসরকারি/স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বর্তমান-সাবেক কর্মকর্তা, শিক্ষানুরাগী এবং স্থানীয় মান্যবর সমাজ সেবকদের মধ্য থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি করার কথা বলা রয়েছে। সেখানে স্থানীয় এমপির ‘অভিপ্রায়’ অনুযায়ী সভাপতি করার কথা বলা হয়নি। তাই সেখানে ইচ্ছে করলেই কেউ সভাপতি হতে পারতেন না।

সভাপতি হতে হলে উপরোক্ত নিয়মের মধ্যে থেকে আসতে হতো। কিন্তু এখন নতুন প্রবিধানমালা পাস হলে স্থানীয় এমপির পছন্দ বা ইচ্ছাই মুখ্য হবে। তিনি যাকে যোগ্য মনে করবেন তিনিই হবেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সভাপতি। এখানে এমপির প্রভাব আরো বেড়ে গেল এক্ষেত্রে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য তা ইতিবাচক নয়।

কারণ বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সময় লক্ষ্য করা গেছে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি পদে মনোনয়ন নিয়ে মতপার্থক্য। এখন এখানে এমপির একক ক্ষমতা দেয়া হলে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি পদে মনোনয়ন নিয়ে আরো বেশি মতপার্থক্য দেখা দেবে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলাও দেখা দিতে পারে। কারণ স্থানীয় এমপি অবশ্যই চাইবেন তার অতি কাছের বা আস্থাভাজন কেউ যেন ঐ পদে বসেন। এভাবে মনোনয়ন দেয়া হলে এটা ঐ প্রতিষ্ঠানের জন্য সুখকর নয়। তাই এমপির ইচ্ছায় মনোনয়ন দেয়ার এমন সিদ্ধান্ত থেকে অবশ্যই সরে আসতে হবে।

তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদসংক্রান্ত প্রবিধানমালায় সংশোধনীর একটি বিষয় খুব ইতিবাচক। বিষয়টি হলো- নতুন প্রবিধানমালায় ইচ্ছা করলেই প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত করতে পারবে না কমিটি। এটা অবশ্যই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। আগে প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল কমিটিকে। এবার যা রোহিত করা হলো।

এছাড়া আরো একটি ভালো প্রস্তাব রয়েছে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ সংক্রান্ত প্রবিধানমালার সংশোধনীতে। যেখানে বলা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নোটিস দেয়া ছাড়াও স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তাদের নির্বাচনের খবর প্রকাশ করতে হবে। এর ফলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়বে।

সবার মধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে আরেঅ আগ্রহ সৃষ্টি হবে। তবে সভাপতি নির্বাচনে এমপির একক ক্ষমতার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয় এক্ষেত্রে। কেননা, বর্তমানে সারাদেশে মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে প্রায় ৩০ হাজারের বেশি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাই এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিষয় একটু ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়া সমীচীন।

আর একটি বিষয়ের দিকে এবার দৃষ্টি দেয়া যাক। সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদে সভাপতি হতে যোগ্যতা হিসেবে স্নাতক পাস নির্ধারণ করা হচ্ছে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে এমন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরকে প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে।

প্রস্তাব পাওয়ার পর এ বিষয়ে নির্দেশনা জারি করা হবে। এটা আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি ইতিবাচক খবর। কারণ সারাদেশে বতর্মানে প্রায় ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সুষ্ঠুভাবে বিদ্যালয় পরিচালনায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে ১১ সদস্যবিশিষ্ট পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। যেখানে রয়েছে পদাধিকার বলে প্রধান শিক্ষক হবেন সদস্য সচিব।

এছাড়া সেখানে একজন শিক্ষক প্রতিনিধি, নিকটবর্তী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক প্রতিনিধি, জমিদাতার একজন প্রতিনিধি, কাউন্সিলর বা ইউপি সদস্য, শিক্ষানুরাগী দুজন, অভিভাবক প্রতিনিধি চারজনসহ মোট ১১ জন সদস্য নির্বাচন করা হয়। তাদের মধ্যে একজনকে সভাপতি ও একজনকে সহ-সভাপতি হিসেবে নির্বাচন করার নিয়ম রয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো- এই পর্ষদে অনেক সময় শিক্ষাসংশিষ্ট নন বা অল্পশিক্ষিত ব্যক্তিকে সভাপতি করা হয়। এতে নিরক্ষর বা অল্পশিক্ষিত ব্যক্তিকে নির্বাচন করায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় বিভিন্ন সময়ে নানা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতিরা বিদ্যালয় পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করেন। প্রতিষ্ঠান সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বিভিন্ন সময় তাদের অনেক সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ বাস্তবায়ন করতে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে সভাপতি অযোগ্য বা অশিক্ষিত হলে দেখা দেয় অনেক সমস্যা।

বিশেষ করে প্রথম প্রতিবন্ধকতা হলো নিজেদের পর্যাপ্ত শিক্ষা না থাকায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও শিক্ষার মান বাড়াতে তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সহায়তা ও দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হন। স্থানীয় প্রভাবশালী হওয়ায় অনেক সময় ক্ষমতার অপব্যবহারও করেন অনেকে। এক্ষেত্রে সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত নতুন সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবশ্যই ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

তবে শুধু সভাপতি নয়, অন্য যেসব প্রতিনিধির কথা বলা হয়েছে তাদের ন্যূনতম শিক্ষার বিষয়টি এখানে যুক্ত হলে আরো উপকৃত হবে শিক্ষা খাত। তবে সরকার এত কিছু করেও কোনো লাভ হবে না, যদি না শিক্ষাবান্ধব পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হয়। শিক্ষাবান্ধব পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হলে সবার আগে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।

আর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যোগ্য লোকদের নিয়ে পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হলে সার্বিকভাবে উন্নতি হবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার। যেখানে শিক্ষক থেকে শুরু করে পরিচালনা পর্ষদ সবাই একযোগে কাজ করবে শিক্ষার মানোন্নয়নে।
– লেখক : সাংবাদিক

এই বিভাগের আরও খবরঃ