website page counter  মান অপমানের বেড়াজালে শিক্ষক - শিক্ষাবার্তা ডট কম

সোমবার, ১৮ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

 মান অপমানের বেড়াজালে শিক্ষক

এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।

বলা হয়ে থাকে শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। আর এ মেরুদন্ড কে সোজা ও শক্ত আর সতেজ করে তোলতে যিনি কাজ করেন তিনি হচ্ছেন জাতি গড়ার কারিগর শিক্ষক। আর শিক্ষক হচ্ছেন জাতির বিবেক। একজন শিক্ষকই আগামী জাতি গঠন করতে সাহায্য করে থাকেন। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ আর এ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলতে একজন শিক্ষক তার মেধা বিলিয়ে দেন তার ছাত্র ছাত্রীর মাঝে।

 

অর্ধাহারে অনাহারে পরিবার পরিজন নিয়ে শিক্ষকতা পেশায় টিকে থাকেন একজন শিক্ষক, পেশার প্রতি তার মায়া হয়ে যায়। তাই এ পেশা তিনি ত্যাগ করতে পারেন না। একজন আদর্শ শিক্ষক সারা জীবন দেশ ও দশের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেন। যদিও এর ব্যতিক্রমও আছে আমাদের বর্তমান সমাজে। কোচিং বাণিজ্য আর ছাত্রী ধর্ষণ এর মতো জঘন্য ঘটনাও ঘটছে কিছু শিক্ষক নামধারি মানুষরূপী অমানুষ দ্বারা।

 

যদিও আমি ঐ সব শিক্ষককে কখনও মানুষই ভাবি না। এরা সমাজের কীট। এই সব কিছু কীটের কথা বাদ দিলে বাকী শিক্ষক ও শিক্ষক সমাজ দেশ ও জাতি গঠনে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। আর এসব আদর্শ শিক্ষকের কারণেই দেশে শিক্ষার হার দিন দিন বেড়ে চলেছে। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার যে বিস্তৃতি হচ্ছে তার প্রতিটি ধাপে আছে একজন শিক্ষকের ঘামে ভরা পরিশ্রমের ফল। হাজার হাজার স্কুল কলেজ আর মাদ্রাসা ব্যক্তি পর্যায়ে আর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছে যেখানে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন এদেশের শিক্ষকরা।

সরকারি পর্যায়ের শিক্ষকরা বেতন ভাতা সহ রাষ্ট্রের যাবতীয় সুযোগ সুবিধা ভোগ করলেও বেসরকারি ও এমপিও ভুক্ত শিক্ষকরা সেই সব সুযোগ সুবিধা থেকে অনেকটাই বঞ্চিত হয়ে আছেন। ননএমপিও বেসরকারি অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে বেতন দেয়া হয় তা বলতে গেলে আজকের বাজারের প্রেক্ষিতে এটা কোনো বেতনই না। অভুক্ত, অনাহারে আর অর্ধাহারে থেকেও শিক্ষকরা শিক্ষকতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

মড়ার উপর খাড়ার ঘা এর মতো এখন শুরু হয়েছে শিক্ষক লাঞ্ছনা। সাধারণত পশুরাও যে কাজ করেনা সে রকম কাজ করা হচ্ছে শিক্ষকদের সাথে। ১১ মে ২০১৬ বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের কাঠালিয়া গ্রামে স্থানীয় জাতীয় পার্টির নেতা জাহাঙ্গীর মৃধা ও মাসুম সরদারের লোকজন মাদ্রাসার সুপার মোঃ আবু হানিফের মাথায় প্রকাশ্যে মল-মুত্র ঢেলে দেয়। আর এসব অপকর্ম তারা নিজেরাই ফেসবুক  এ লাইভ করে প্রকাশ করে। একজন মাদ্রাসা শিক্ষকের সাথে যে রকম আচরণ করা হয়েছে তা কোনো সভ্য সমাজে ঘটতে পারে না। ধিক্কার জানাবো নাকি ঐ নর পশুর মুখে থুথু ফেলবো ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।

  কোনো পশু কি এ রকম আচরণ করবে? এক পশু কি আরেক পশুর মাথায় এরকম মল-মূত্র ত্যাগ করবে। কিন্তু জাহাঙ্গীর মৃধা ও তার দলবল পশুকেও হার মানিয়েছিলেন।

  বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি আর গভর্নিং বডির দৌরাত্বে ঘটে চলেছে এরকম অনাকাংখিত, অমানবিক কিছু ঘটনা যা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ধ্বংস ডেকে আনছে। শিক্ষককে অপমান করে, লাঞ্ছিত করে, অবহেলা আর বঞ্চনা করা নিত্যনিম্তিক ব্যাপার।

২০১৬ সাল ১৬ জানুয়ারি স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য মোহাম্মদ ইসহাক সপ্তম শ্রেণির  ক্লাস চলার সময় এক শিক্ষার্থীকে ভর্তির জন্য তদবির করেন। শিক্ষক অস্বীকৃতি জানালে শিক্ষার্থীদের সামনেই তাকে লাঞ্ছিত করেন ওই সদস্য।  জাতীয় পার্টির ঐ নেতা একজন স্কুলের প্রধান শিক্ষককে কান ধরে উঠ বস করিয়েছিলেন। নারায়ণগঞ্জের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশে কান ধরে উঠ-বস করানো হয়েছিল।

 

সেই ঘটনা নিয়ে দেশ জুড়ে তোলপাড় হয়েছিল কিন্তু ঘটনার প্রকৃত বিচার আজও হয়নি। উল্টো ঐ প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে অন্য মামলায় জড়ানো হয়েছিল। আর এসব ঘটনার বিচার হয় না বলেই নতুন নতুন ঘটনা, দুর্ঘটনার জন্ম হয়। অপরাধীরা অপরাধ করার সাহস পায়।   মহৎ ও মহান পেশা মনে করে আমরা শিক্ষকতা পেশায় আসি যদিও অল্প বেতন এবং সুযোগ সুবিধাও সীমিত।

 

কিন্তু সম্মান আছে, সম্মান পাওয়া যায় এসব বিবেচনা করেই একজন শিক্ষক এ পেশায় কষ্ট করেও টিকে থাকার চেষ্টা করে যান সারা বছর, সারা জীবন। এখন যদি সেই সম্মানই না থাকে তাহলে আর থাকলো কি? অপমান, লাঞ্ছনা আর বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন জাতির বিবেক শিক্ষকরা। সব খবর তো আর আসেনা পত্রিকার পাতায়। কিন্তু যে দুটি ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে তা জাতি হিসেবে আমরা লজ্জিত ও অপমানিত বোধ করছি।

কেন এমন ঘটনা, কেন এমন আচরণ আজ শিক্ষকদের প্রতি করা হচ্ছে? মনে হয় যে আমরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সময়েই রয়েছি। ওই সময়ে ইংরেজ বাহাদুর এবং তাঁদের প্রতিনিধিরা নিজেদের কর্তৃত্ব আর প্রভাব বিস্তার ও বজায় রাখার জন্য নিজেদের দারুণভাবে মহিমান্বিত করার প্রয়াসে আর নেটিভদের তাক লাগিয়ে ক্ষমতা জাহির করার যেসব প্রয়াস নিতেন, এখনো তেমন হাবভাব লক্ষণীয়।

 

ইংরেজ শাসনকে মহিমান্বিত করতে তৈরি করেছিল লাট সাহেবের বাসভবন আর ছোটখাটো ইংরেজ সাহেবেরা কোথাও গেলে নেটিভরা যেভাবে স্বাগত জানাত, তার অধুনা সংস্করণ আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনেও দেখা যায়। আমাদের বড়, মাঝারি, এমনকি পাতিনেতাদের গলায় মালা পরানোর সংস্কৃতি, বিশাল বিশাল তোরণ আর নেতার আগমনে স্কুলের কার্যক্রম বাদ দিয়ে প্রধান শিক্ষক থেকে স্থানীয় আমলাদের রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে স্বাগত জানানোর দৃশ্য দেখে ইংরেজ শাসনের কথাই মনে পড়ে।  আগে শিক্ষকের সম্মান করার বিষয়টি পাঠ্যপুস্তকে কত গুরুত্ব দেওয়া হতো।

নিচের ক্লাসের পাঠ্যপুস্তকে সম্রাট আলমগীরের পুত্রের কাহিনি পড়েছিলাম। ওই গল্পটি এমন ছিল যে একদিন সকালে হিন্দুস্তানের মহাপরাক্রমশালী সম্রাট দেখলেন যে শাহজাদা তাঁর শিক্ষকের পায়ে পানি ঢালছেন আর ওস্তাদ নিজের হাতে পা পরিষ্কার করছেন। হঠাৎ সম্রাটকে দেখে সবাই থতমত খেলেন। সম্রাট আলমগীর ওস্তাদকে ডেকে পাঠালেন। কম্পমান শিক্ষক বা ওস্তাদ হাতজোড় করে কম্পমান অবস্থায় শাহজাদাকে দিয়ে এমন কাজ করানোর জন্য অনুক্ষমা চাইবেন।

ওই শিক্ষকের কিছু বলার আগেই সম্রাট বললেন, ‘আপনি শাহজাদাকে সঠিক শিক্ষা দিচ্ছেন না। সঠিক শিক্ষা এবং শিক্ষকের সম্মান করা শেখালে শাহজাদা শুধু পায়ে পানি ঢালা নয়, নিজের হাতে আপনার পা ধুয়ে দিত।’ ওই শিক্ষক হতবাক হয়ে দরবার ত্যাগ করলেন। মায়ের ভক্তির ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের গল্প, আব্রাহাম লিংকনের চেরিগাছ কাটা এবং সত্যের সামনাসামনি হওয়ার গল্পগুলো এখনো পড়ানো হয় কি?

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন হয়েছে। ছোট ছোট শিশু গাধার মতো পিঠে ব্যাগবোঝাই বই বহন করছে আর পরে জিপিএ-৫-এর ছড়াছড়ি, ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পাস। আমরা মানুষ গড়ছি, না কিছু তোতাপাখি তৈরি করছি। এখন শিক্ষকেরা উচ্চ স্বরে ছাত্রদের শাসন করতে পারেন না, এমনকি স্কুলগুলোতেও নয়। আজ থেকে ৪০-৫০ বছর আগের কথা, বাবা-মায়ের অধিকারই শিক্ষকদের সমাজ দিয়েছিল।

 

আর আমাদেরই পরের প্রজন্ম বা তার পরের প্রজন্মদের সময়ে দেখছি ছাত্র কর্তৃক শিক্ষক লাঞ্ছিত, রাজনীতির কারণে ভাইস চ্যান্সেলর বা প্রিন্সিপাল বা প্রধান শিক্ষকের রুমে তালা। এঁদের মধ্য থেকেই তো বেশির ভাগ নেতা এবং সাংসদ জন্ম নেন। কাজেই তাঁদের কাছ থেকে কতটুকু শৃঙ্খলা, সৌজন্যবোধ এবং অপরকে সম্মান করার রীতি আশা করা যায়?

নারায়ণগঞ্জে যে ঘটনা ঘটেছে তা বিচ্ছিন্ন নয়। অহরহ এমন ঘটনা ঘটেই চলছে। এ ধরনের ঘটনা যেসব বিষয়ে প্রশ্ন তোলার এবং চিন্তার অবতারণা করে, তার মধ্যে প্রধানত আমাদের সামাজিক অবক্ষয়, শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসনের অসহায়ত্ব এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সংস্কৃতি। একটি গণতান্ত্রিক দেশে রাজনীতি দ্বারা দেশ ও সমাজ পরিচালিত, সেখানে গলদ হলে সবখানেই এমন অবস্থা হবে।

শেষ করার আগে মাও সেতুংয়ের কথা মনে পড়ল। মাছের পচন ধরে মাথা থেকে।   এই দেশের শিক্ষকদের জন্য এখন খুবই একটা খারাপ সময় । ছাত্রলীগের কর্মী এখন অবলীলায় তাদের শিক্ষকের গায়ে হাত তুলতে পারে, একজন সাংসদ প্রকাশ্যে চাবুক মারার ঘোষণা দিতে পারেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী শিক্ষকদের বেতনভাতা নিয়ে খোঁটা দিতে পারেন কেউ কিছু মনে করেন না।

আমি একজন শিক্ষক, তাই খুব সঙ্কোচের সঙ্গে শিক্ষকদের জীবন নিয়ে একটি দুটি কথা বলতে বসেছি। শিক্ষকরাও যে মনুষ্য জাতীয় প্রাণী, তাদেরও যে ক্ষুধা-তৃষ্ণা থাকতে পারে, পরিবার সন্তান থাকতে পারে এবং তারাও যে দেশের মানুষের কাছে একটুখানি সম্মান চাইতে পারেন বিষয়টি জেনে কেউ যদি অবাক হয়ে যান তাহলে তার জন্য অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

পাশাপাশি এ কথা রাজনীতিবিদেরও ভাবতে হবে যে, তারা বার বার ভুল করবেন– দেশকে ডোবাবেন, নিজেরা ডুববেন– আর দীনহীন আমরা তাদের উদ্ধারে বারবার এগিয়ে আসব এই জেনে যে, আমরা বঞ্চনা ও অবজ্ঞার পাত্র হতেই থাকব, তা আর কতদিন?

লেখক- প্রধান সম্পাদক,শিক্ষাবার্তা ডট কম পত্রিকা

এই বিভাগের আরও খবরঃ