website page counter বেসরকারি শিক্ষক ও কর্মচারিদের অবসর সুবিধা প্রাপ্তির হিসাব - শিক্ষাবার্তা ডট কম

বুধবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৮ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বেসরকারি শিক্ষক ও কর্মচারিদের অবসর সুবিধা প্রাপ্তির হিসাব

এম এ বাতেন ফারুকী।।

উপরের শিরোনামের বিষয়ে নূতন করে লেখার কথা না। কারণ বেসরকারি শিক্ষক ও কর্মচারি অবসর সুবিধা প্রবিধানমালা ২০০৫ এ বেসরকারি শিক্ষক ও কর্মচারিদের অবসর সুবিধা প্রাপ্তির হিসেবের বিশদ বিবরণ দেয়া আছে। তবু্ও কিছু লিখতে বাধ্য হচ্ছি। ইদানিং ফেসবুকে শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের কিছু অংশ না জেনে (না বুঝে বললাম না) ব্যানবেইস ভবনের অবসর সুবিধা বোর্ড অফিসের নোটিশ বোর্ডের একটি নোটিশকে নিয়ে বিভ্রান্তিতে ভোগছেন এবং বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। বিভ্রান্তিটা হলো এমন : ‘চাঁদা কর্তনের পর ৭৫ মাসের পরিবর্তে ৫০ মাসের সুবিধা’।

নোটিশটা মূলত চারটি কলামে বিভক্ত। অথচ চতুর্থ কলাম বেমালুম বাদ দিয়ে মূলত বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। বিষয়টি প্রথমে আমি নিজেও বুঝে ওঠতে পারছিলাম না। একটু পরেই আরেকটি পোস্ট দেখতে পেলাম। এটাতে কিনা পুরো নোটিশটিই দেখানো হয়েছে। ফলে বিষয়টি পরিস্কার হয়েছে যদিও পোস্টদাতা বিভ্রান্তিতেই রয়ে গেছেন। তিনি আবার তাঁর উপলব্ধির স্বপক্ষে প্রমাণ হিসেবে নোটিশের পাশাপাশি ডঃ সাধন কুমার বিশ্বাস সংকলিত ‘পরিপত্র ও বিধিবিধান সমগ্র’ গ্রন্থের ৯১৬ পৃষ্ঠা পড়ার কথা বলেছেন অথবা ব্যানবেইসের কাউকে ফোন করার কথাও বলেছেন। বইটি আমার কাছে নেই বিধায় পড়তে পারিনি।

এমনকি ফোন করারও প্রয়োজনবোধ করিনি। কারণ পরিপত্র ও বিধিবিধান বা প্রবিধান কিংবা নীতিমালা যা-ই বলি না কেন এগুলো রাতারাতি পরিবর্তন হয় না,হলেও শিক্ষা সংক্রান্ত অনলাইন পত্রিকাগুলোর সুবাদে আমরা তাৎক্ষণিক জানতে পারি। তাছাড়া পোস্টদাতার পোস্টে বইয়ের সংস্করণ উল্লেখ আছে : ফেব্রুয়ারি ২০১৮। অতএব বইটি পড়া নিষ্প্রয়োজন, এত আগে তো অবসর সুবিধার কোনো বিধান পরিবর্তন হয়নি। আর ফোন করার তো প্রশ্নই আসে না।

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারি অবসর সুবিধা প্রবিধানমালা ২০০৫ এর ১০ ধারার ১ উপধারায় চাকরির সময়কাল ও সুবিধা প্রাপ্তির একটি ছক দেয়া আছে। ছকটি সংক্ষেপে নিম্নরূপ :

ক্রমিক নং চাকরিকাল প্রাপ্য সুবিধা
০১) ১০ বছর বা <১১ বছর ১০ মাসের বেতন
০২) ১১ বছর বা <১২ বছর ১৩ মাসের বেতন
০৩) ১২ বছর বা <১৩ বছর ১৬ মাসের বেতন
০৪) ১৩ বছর বা <১৪ বছর ১৯ মাসের বেতন
০৫) ১৪ বছর বা <১৫বছর ২২ মাসের বেতন
০৬) ১৫ বছর বা <১৬বছর ২৫ মাসের বেতন
০৭) ১৬ বছর বা <১৭ বছর ২৯ মাসের বেতন
০৮) ১৭ বছর বা <১৮ বছর ৩৩ মাসের বেতন
০৯) ১৮ বছর বা <১৯ বছর ৩৭ মাসের বেতন
১০) ১৯ বছর বা <২০ বছর ৪২ মাসের বেতন
১১) ২০ বছর বা <২১ বছর ৪৭ মাসের বেতন
১২) ২১ বছর বা <২২ বছর ৫৩ মাসের বেতন
১৩) ২২ বছর বা <২৩ বছর ৫৭ মাসের বেতন
১৪) ২৩ বছর বা <২৪ বছর ৬৩ মাসের বেতন
১৫) ২৪ বছর বা <২৫ বছর ৬৯ মাসের বেতন
১৬) ২৫ বছর বা >২৫ বছর ৭৫ মাসের বেতন

কিন্তু উপ-প্রবিধান (৩)এ বলা আছে, উপ-প্রবিধান (১) ও (২) এ যাহাই থাকুক না কেন ১লা ডিসেম্বর ২০০২ ইং তারিখে বা তাহার পর কোনো শিক্ষক বা কর্মচারি চাকুরি হইতে অবসর গ্রহণ করিলে বা মত্যুবরণ করিলে তিনি বা ক্ষেত্রমত তাহার পরিবার উপ-প্রবিধান (১)এ বর্ণিত হারে অবসর সুবিধাদি প্রাপ্য হইবেন।

তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত শিক্ষক বা কর্মচারি এমপিওভুক্ত হইবার পর তাহার বেতন ভাতা হইতে যত বৎসর প্রবিধান ৯ এ উল্লেখিত হারে অবসর সুবিধা চাঁদা কর্তন করা হয় নাই তত মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ প্রাপ হইবেন না।

এই বিষয়টি বুঝানোর জন্য হয়তো কর্তৃপক্ষ নোটিশ বোর্ডে ব্যাখ্যা দিয়ে থাকবেন। কর্তৃপক্ষের পক্ষে আমি ব্যাখ্যা দিচ্ছি না বরং শিক্ষক হিসেবে বিষয়টি আমাদের জানা উচিত সে বোধ থেকেই আমি লিখছি। প্রসংগত বলে রাখা প্রয়োজন, আমি শিক্ষক এটাই আমার বড় পরিচয়। শিক্ষকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়েই আমি বরাবর লিখে থাকি। অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অতিরিক্ত ৪% কর্তনের প্রতিবাদস্বরূপ আমার একটি লেখা আছে।

নোটিশ বোর্ডের লেখাটি ভালো করে পড়লেই বিষয়টি বুঝা যাবে। নোটিশের ২ নম্বর কলামে প্রাপ্যতার হিসাব ও ৩ নম্বর কলামে ২০০৫ সনের আগের হিসাব এবং ৪ নম্বর কলামে ২০০৫ সনের পরে যত বছর চাঁদা দেয়া হবে তত মাসের মূল বেতন ৩ নম্বর কলামের প্রাপ্যতার সাথে যোগ হবে – এই বিষয়টি মূলত নোটিশদাতা কর্তৃপক্ষ বুঝাতে চেয়েছেন।

বিষয়টি সহজ ও বোধগম্য করার জন্য কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক : ধরি, একজন শিক্ষক ২০০৭ সনে অবসরে গিয়েছিলেন এবং তাঁর চাকরির বয়স হয়েছিল ১০ বছর। সে হিসেবে তাঁর এমপিওভুক্তি ছিল ১৯৯৭ বা ১৯৯৬ সনে। তিনি চাঁদা দেন নাই বা কর্তন হয় নাই ৬/৭ বছর। অবসর সুবিধা প্রবিধানমালা অনুযায়ী তিনি সর্বোচ্চ ৭ মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ কম পাবেন। অর্থাৎ তাঁর প্রকৃত প্রাপ্য হবে (১০-৭)=৩ মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ।

এখন নোটিশ মোতাবেক তিনি ৩ নম্বর কলামে প্রাপ্য হবেন ০০ মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ এবং ৪ নম্বর কলামে প্রাপ্য হবেন ২০০৫ সন থেকে চাঁদা প্রদানের দরুন ২/৩ মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ। মোটকথা ৩ মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ। আবার ধরা যাক, কোনো শিক্ষক ২০০৭ সনে অবসরে গিয়েছিলেন এবং তাঁর চাকুরি ১৯৮০ সনেরও আগে। সেক্ষেত্রে ১৯৮০ সন থেকে চাকরিকাল হিসাব করা হবে। তাঁর চাকরির বয়স হবে ২৫ বছরের বেশি।

প্রবিধান মোতাবেক তিনি ১৯৮০ থেকে ২০০২ সন পর্যন্ত মোট ২৩ বছর চাঁদা দেননি। সুতরাং তিনি পাবেন সর্বোচ্চ ৭৫ মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ থেকে ২৩ মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ কম।অর্থাৎ তাঁর প্রকৃত প্রাপ্যতা (৭৫-২৩)=৫২ মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ। অন্যদিকে নোটিশ মোতাবেক তিনি ৩ নম্বর কলামে প্রাপ্য হবেন ২৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বছরের জন্য ৫০ মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ এবং ৪ নম্বর কলামে প্রাপ্য হবেন ২০০৫ সনের পরে ২ বছরের চাঁদা প্রদান করার জন্য আরও ২ মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ। ৩+৪ কলাম মিলে তিনি সর্বমোট প্রাপ্য হবেন (৫০+২)=৫২ মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ।

আবার ধরা যাক, কোনো শিক্ষক ২০২০ সনে অবসরে যাবেন এবং ধরি ১৯৯০ সনে তিনি এমপিওভুক্ত হয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে তাঁর চাকরির বয়সও ২৫ বছরের বেশি। সুতরাং তিনি প্রবিধান মোতাবেক ১৩ বছরের চাঁদা দেননি। সেজন্য তিনি পাবেন (৭৫-১৩)=৬২ মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ। পক্ষান্তরে নোটিশ মোতাবেক তিনি ৩ নম্বর কলামে প্রাপ্য হবেন ৫০ মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ এবং ৪ নম্বর কলামে প্রাপ্য হবেন ২০০৫ সনের পর ১৫ বছর চাঁদা প্রদান করার দরুন ১৫ মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ। তিনি মোট প্রাপ্য হবেন (৫০+২৫)=৬৫ মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ। এ প্রেক্ষাপটে তাঁর ক্ষেত্রে অধিক সুবিধাই প্রযোজ্য হবে। এভাবে (২০০২+২৫)=২০২৭ সনে কোনো শিক্ষক অবসরে গেলে তাঁর চাকরির এবং চাঁদা প্রদানের হিসাব দুটোই ২৫ বছর অতিক্রম করবে। সেক্ষেত্রে তাঁর বেলায় আর কোনো জটিলতা থাকবে না তিনি পুরো ৭৫ মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ প্রাপ্য হবেন।

আসলে উল্লেখিত নোটিশটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারি অবসর সুবিধা প্রবিধানমালা ২০০৫ এর প্রতিরূপ বৈ আর কিছু নয়। ওখানে যাঁরা বসে আছে তাঁরা প্রবিধান ও নীতিমালার বাইরে কিছুই করতে পারেন না – এই বোধ ও বিশ্বাস আমাদের থাকা উচিত। যদি কেউ নিজের আসন পাকাপোক্ত করার জন্য স্বজাত্যবোধ পরিহার করে তা অবশ্যই ঘৃণিত। আশা করি বিষয়টি এবার স্পষ্ট ও বোধগম্য হয়েছে। এরপরও যদি বোধগম্য না হয় নিবন্ধটি দ্বিতীয় বারের মতো পড়তে অনুরোধ করি।

লেখক –
প্রধান শিক্ষক, সৈয়দ হাবিবুল হক উচ্চ বিদ্যালয়
বৌলাই, কিশোরগঞ্জ।

এই বিভাগের আরও খবরঃ