website page counter বিশ্ব শিক্ষক দিবসঃএকুশ শতকের শ্রমদাস - শিক্ষাবার্তা ডট কম

বুধবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৮ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বিশ্ব শিক্ষক দিবসঃএকুশ শতকের শ্রমদাস

সিরাজুল ইসলাম।।

আজ ৫৩ তম বিশ্ব শিক্ষক দিবস।মানুষ গড়ার কারিগর হিসাবে খ্যাত সকল শিক্ষকদের প্রতি রইল প্রাণঢালা অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। প্রতি বছরই আমাদের সামনে আসে বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে। এবছর বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ” The right to education means the right to a qualified teacher ” মানসম্মত শিক্ষার পূর্ব শর্ত হল যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষক এতে কোন সন্দেহ নেই। বাংলাদেশেও যে মানসম্মত শিক্ষা ও যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষক তৈরির চেষ্টা চলছে না তা বলা যাবে না।

 

তবে যে শিক্ষকরা মানসম্মত শিক্ষা দিবেন তারা যদি মানবেতর জীবনযাপন করেন বা সরকারি কাঠামোর মধ্যে থেকে বৈষম্যের শিকার হন তাহলে মানসম্মত শিক্ষা কি করে সম্ভব? আমি যাদের কথা বলছি তারা হচ্ছেন বেসরকারি কলেজর অনার্স-মাস্টার্সের শিক্ষকরা। তারা সত্যিই একুশ শতকের শ্রম দাসে পরিনত হয়েছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নামক কর্তৃপক্ষের পরিকল্পিত নীতিমালার অক্টোপাসে এই সকল শিক্ষকদের শ্রমদাস করে রাখা হয়েছে।

১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে বাংলাদেশের একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যাপীঠ। এর অধিভুক্ত কলেজগুলোতে প্রায় ২৫ লক্ষেরও বেশি ছাত্র ছাত্রী পড়াশোনা করে। ছাত্র ছাত্রীদের সংখ্যার দিক থেকেও বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশ্বের দ্বিতীয়। ইতিমধ্যে পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। সারা দেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সরকারি ও বেসরকারি কলেজের সংখ্যা ২ হাজার ১৫৪ টির মত, যার মধ্যে ৫৫৭ টিতে স্নাতক সম্মান পড়ানো হয়।

 

এর উল্লেখ যোগ্য একটি অংশ হচ্ছে বেসরকারি কলেজ যেখানে অনার্স মাস্টার্স পাড়ানো হয়। আর এই বেসরকারি কলেজের অনার্স মাস্টার্সে পাঠদানের সাথে জড়িত রয়েছে প্রায় ৩৫০০ নন এমপিও শিক্ষক যারা বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে এদের না আছে আর্থিক সচ্ছলতা না আছে সামাজিক মর্যাদা। সরকারি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা মেনে একজন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি ও একজন ডিজির প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বেসরকারি কলেজ কর্তৃপক্ষ এসকল শিক্ষকদের নিয়োগ দিয়ে থাকেন। কিন্তু বিধি মোতাবেক তাদের শতভাগ বেতন ভাতা কলেজ থেকে প্রদানের কথা থাকলেও বিভিন্ন অজুহাতে কলেজ কর্তৃপক্ষ তা প্রদান করেনা। কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের খেয়াল খুশি মত তাদের বেতন বাতা প্রদান করে যা বর্তমান সমাজ ব্যবস্হায় খুবই বেমানান।

 

অধিকাংশ কলেজে এই বেতনের পরিমান ৩-৫ হাজার টাকা। এই দিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে বর্তমান সমাজে জীবন যাপন খুবই কঠিন এবং একজন উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তির জন্য লজ্জাজনক। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই সমস্যার সমাধান কোথায় বা কে দিবে? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কি এর দায় এড়াতে পারে? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ২৫ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে যে পরিমান আয় করে তার একটি সামান্য অংশ দিয়ে এই ৩৫০০ অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকদের মাসিক বেতন দেওয়া খুব একটা কঠিন কাজ নয়। শুধু আন্তরিকতার প্রয়োজন মাত্র। কারণ এসকল শিক্ষকরা আন্তরিকতার সাথে পাঠদান করান বলেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় টিকে আছে।

কিছুদিন আগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসি মহোদয়ের সাথে এই বিষয়ে আমার কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। তার কাছে আমার প্রশ্ন ছিল,আপনি হচ্ছেন বেসরকারি কলেজের অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকদের অভিবাক তাহলে তাদের কলেজ থেকে শতভাগ বেতন দেওয়ার জন্য আপনার কি ভুমিকা? তিনি বলেন “এটা সম্পূর্ণ কলেজের বিষয়, আমাদের কিছু করার নেই। আপনারা যেটা পান অন্য কলেজের শিক্ষকরা সেটাও পায়না, অনেকে প্রতি ছয় মাসে ২-৩ হাজার টাকা পান। সুতরাং আপনারা অনেক ভালো আছেন।” এই সকল শিক্ষকদের বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যদি একটু আন্তরিক হয়ে একটি বিধিমালা তৈরি করে যেসকল কলেজ অনার্স মাস্টার্স শিক্ষকদের কলেজ থেকে শতভাগ বেতন দিবে না তাদের অনার্সের বা মাস্টার্সের পাঠদান বাতিল করবে বা অধিভুক্তি বাতিল করবে তাহলে একটা সমাধন হতে পারে। অথবা অনার্স মাস্টার্সের ছাত্র ছাত্রীদের কাছ থেকে যে বিপুল পরিমাণ আয় করে তা থেকেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ভাবে এমপিও চালু করতে পারে। যে শিক্ষকের বেতন ভাতা বিশ্ববিদ্যালয় দিতে পারবে না, সেই শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কি দরকার?

বেসরকারি এমপিও ভুক্ত কলেজের অনার্স মাস্টার্সের শিক্ষকদের এমপিও ভুক্ত করার দায় সরকারও এড়াতে পারেনা। একই পদ্ধতিতে নিয়োগ পেয়ে যদি ডিগ্রির তৃতীয় শিক্ষক এমপিও ভুক্ত হতে পারে তাহলে অনার্স মাস্টার্সের শিক্ষকরা কেন পারবেনা? একই পদ্ধতিতে নিয়োগ পেয়ে যদি অনার্স মাস্টার্সের শিক্ষক সরকারিকরণের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে তাহলে তাদের এমপিও দিতে সমস্যা কোথায়? তারা কেন সম নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।

 

শিক্ষার মত একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত যেখানে প্রতি বছরই সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ করা হয়ে থাকে, সেখানে কেন এই ৩৫০০ শিক্ষক বঞ্চনার শিকার হবেন। এখন সময় এসেছে ভেবে দেখার, কারণ দেশরত্ন, মানবতার দূত, শিক্ষার আলোকবর্তিকা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য এবং ভিশন-২০২১ সফল করার জন্য ইতিমধ্যে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেছেন। সরকারি কলেজ ও স্কুল বিহীন প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কলেজ ও স্কুল সরকারিকরণ করেছেন, তার হাত ধরেই শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে।

 

তার সময়ে একজন শিক্ষক কষ্টে জীবন যাপন করবে, মর্যাদাহীন থাকবে, শ্রমদাস হিসাবে বিবেচিত হবে, নাগরিক বৈষম্যের শিকার হবে এটা হতে পারেনা। শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষকদের নিয়ে যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে তার সমাধান একমাত্র তিনিই দিতে পারেন। এই প্রত্যাশা রইল। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে শিক্ষকরা তাদের প্রাপ্য অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে জ্ঞাননের আলো ছড়িয়ে দিক সমাজের প্রতিটি ঘরে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার- শুভ শিক্ষক দিবস। আমাদের মনে রাখতে হবে “Teaching is the profession that teaches the other professions”

এই বিভাগের আরও খবরঃ