website page counter শিক্ষকরা সমাজ ও রাষ্ট্রের আলোকবর্তিকা - শিক্ষাবার্তা ডট কম

বুধবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৮ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

শিক্ষকরা সমাজ ও রাষ্ট্রের আলোকবর্তিকা

ইসমাইল মাহমুদঃ

‘বাদশাহ আলমগীর

কুমারে তাঁহার পড়াইত এক মৌলভী দিল্লীর।

একদা প্রভাতে গিয়া দেখেন বাদশাহ-

শাহজাদা এক পাত্র হস্তে নিয়া

ঢালিতেছে বারি গুরুর চরণে

পুলকিত হৃদে আনত-নয়নে,

শিক্ষক শুধু নিজ হাত দিয়া নিজেরি পায়ের ধুলি

ধুয়ে মুছে সব করিছেন সাফ সঞ্চারি অঙ্গুলি।’

‘শিক্ষকের মর্যাদা’ শিরোনামের এই কবিতাটি পড়েননি এমন পাঠক পাওয়া সত্যিই বিরল। কবিতাটি রচনা করেন কবি কাজী কাদের নেওয়াজ।

‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতার গল্পটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দিল্লীর বাদশাহ আলমগীর তাঁর পুত্রকে শিক্ষা প্রদানের দায়িত্ব অর্পন করেন একজন মৌলভী শিক্ষকের ওপর। একদিন বাদশাহ আলমগীর পুত্র কিভাবে শিক্ষা অর্জন করছে তা দেখতে গেলেন মৌলভীর দরজায়। গিয়ে দেখলেন বাদশাহ আলমগীরের পুত্র শিক্ষকের চরণে বা পায়ে পানি ঢালছে। মৌলভী শিক্ষক নিজ হাতে তাঁর চরণ ধুয়ে পরিস্কার করছেন। বাদশাহকে দেখে শিক্ষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ। তিনি ভাবলেন, দিল্লীর অধিপতির পুত্রের হাতে সেবা নিয়েছি আজ আর আমার রক্ষা নেই। তবে এ সময়ে হঠাৎ করেই শিক্ষকের মনে হলো-

‘শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার

দিল্লীর পতি সে তো কোন ছার,

ভয় করি নাকো, ধারি নাকো ধার,

মনে আছে মোর বল-

বাদশাহ শুধালে শাস্ত্রের কথা শুনাব অনর্গল।’

তাঁর এ ভাবনার কথা শোনাতে হয়নি বাদশাহ আলমগীরকে। বাদশাহ-পুত্র শিক্ষাগুরুর চরণে পানি ঢেলেছে কিন্তু নিজ হাতে চরণ পরিস্কার করে দেয়নি বলে বাদশাহ পুত্রের আচরণে অত্যন্ত কষ্ট পেয়েছেন। বাদশাহ আলমগীর ওই শিক্ষককে অনেক বড় সম্মানে ভূষিত করেছেন। তিনি উচ্চস্বরে বলেছেন-

‘আজ হতে চির-উন্নত হলো শিক্ষাগুরুর শির

সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ আলমগীর।’

কবিতাটি ছোটবেলায় পড়েছি। আর মাথায় একটিই ভাবনা ঘুরপাক খেয়েছে একজন বাদশাহ কিভাবে একজন শিক্ষককে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মানে ভূষিত করেছেন। শিক্ষকের যোগ্য মর্যাদা দিতে দিল্লীর অধিপতিও কুণ্ঠাবোধ করেননি। বিশ্ব শিক্ষক দিবস তাই প্রতিটি মানুষের কাছে শুধু একটি আলাদা দিবসই নয়; একটি অত্যন্ত শ্রদ্ধা-ভালোবাসা আর আবেগের একটি মহান দিবস।

আজ ৫ অক্টোবর ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’। বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে ও জাতিকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার কর্মে যারা নিয়োজিত সেই মহান শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতিবছর দিবসটি বিশ্বের প্রায় সব দেশে পালন করা হয়।

১৯৯৩ সালে বিশ্বের ১৬৭টি দেশের ২১০টি জাতীয় সংগঠনের প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ সদস্যের প্রতিনিধিত্বকারী আন্তর্জাতিক শিক্ষক সংগঠন ‘এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল’ গঠিত হয়। এ সংগঠন কর্তৃক প্রণীত দলিলটি যথাযথ বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করার জন্য জাতিসংঘের কাছে উদ্যোগ গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম অধিবেশনের গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ড. ফ্রেডারিক এম মেয়র প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এ ঘোষণার ফলে ১৯৯৫ সাল থেকে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই মর্যাদা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ পালিত হয়ে আসছে।

‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ পালনে এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল ও তার সহযোগী ৪০১টি সদস্য সংগঠন মূল ভূমিকা রাখে। প্রতি বছর দিবসটি পালন উপলক্ষে এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল একটি প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করে থাকে।

সারা বিশ্বের মতো আমাদের বাংলাদেশেও শিক্ষকতা একটি মহান পেশা হিসেবে স্বীকৃত। পরিপূর্ণ জাতি গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানসম্মত শিক্ষা। বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফলে বর্তমানে আগের তুলনায় পাসের আধিক্য বেড়েছে অনেকগুন। একটা সময় পরীক্ষায় পাস করা অনেক কঠিন বিষয় ছিল। কিন্তু বর্তমানে ফেল করা খুবই কঠিন একটা বিষয়। পরীক্ষায় পাসের আধিক্য বেড়েছে ঠিকই তবে শিক্ষার মান বেড়েছে কি? এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েও অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজিতে ৫ নাম্বার পেতেও হিমসিম খায়। ফলে শুধু পাসের আধিক্য বাড়লে হবে না, বাড়াতে হবে শিক্ষার মান। আর মানসম্মত শিক্ষাদানের জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও দক্ষতাসমপন্ন শিক্ষক দ্বারা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান নিশ্চিত করা। এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল (ঊফঁপধঃরড়হ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ-ঊও) তাদের গবেষণায় মানসম্মত শিক্ষার মূল উপাদান হিসেবে নির্ধারণ করেছে তিনটি বিষয়কে। আর তা হলো : (০১) মানসম্মত শিক্ষক, (০২) মানসম্মত শিক্ষা উপকরণ এবং (০৩) মানসম্মত পরিবেশ।

সুদক্ষ শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ব্যতীত শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষাদান অসম্ভব। মানসম্মত শিক্ষা প্রতিটি শিশুর মানবিক ও মৌলিক অধিকার। তাই মানসম্মত শিক্ষার জন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মধ্য দিয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের যে সমপর্ক বিদ্যমান একজন শিক্ষকের সঙ্গে একজন শিক্ষার্থীর সমপর্ক তেমনি হওয়া আবশ্যক। শিক্ষকরা সমাজ, রাষ্ট্রের আলোকবর্তিকার মতো কাজ করেন। ফলে শিক্ষককে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দিতে হবে।

আমাদের দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখতে পাই বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজ প্রধান শিক্ষকের নিজ হাতে করতে হয়। প্রতি বছর সস্নিপের যে বরাদ্দ আসে তার দায়ভার নিতে হয় প্রধান শিক্ষককে। শিক্ষা প্রদানের পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভোটার তালিকা তৈরি ও হালনাগাদ, আদম শুমারী, উঠান বৈঠক, হোম ভিজিট, কৃষি শুমারী, উপবৃত্তি তালিকা তৈরি, বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার হলে ডিউটি করাসহ রাষ্ট্রিয় ও সামাজিক সকল কাজে অংশগ্রহণ করতে হয়। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো রাষ্ট্রীয় কাজে শিক্ষককে ব্যস্ত থাকতে হয়। এখন প্রশ্ন হলো শিক্ষকরা এতো কাজের পর শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সময় দেন কখন? প্রায় প্রতি মাসেই কোন না কোন দিবসতো লেগেই আছে। শহরের বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এসব দিবসে র‌্যালী ও আলোচনা সভায় অংশ নিতে উপজেলা পরিষদে উপস্থিতি এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এতোসব প্রতিকূলতার মধ্যে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা কতটুকু এগোচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অথচ প্রাথমিক বিদ্যালয়কে শিক্ষা প্রদানের সুতিকাগার বলা হয়ে থাকে। শিক্ষার প্রাথমিক ভিত মজবুত না হলে ভবিষ্যত নিয়ে সংশয় থাকাই স্বাভাবিক।

আশার কথা শত প্রতিকুলতা সত্ত্বেও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সর্বক্ষেত্রে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে ‘বাংলাদেশ’। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলা গড়ার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তা সফলতার দ্বারপ্রান্তে। চূড়ান্ত সফলতা বয়ে আনতে দেশের শিক্ষকসমাজকে জাতির সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। আর জাতি যত দ্রুত সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে ততো দ্রুত মানসম্মত, প্রযুক্তিসমৃদ্ধ, গুণগত, আধুনিক সোনার বাংলা বিনির্মাণ করা সম্ভব হবে।

ইসমাইল মাহমুদ : কলামিস্ট

এই বিভাগের আরও খবরঃ