website page counter স্বস্তির অপর নাম ডে-কেয়ার - শিক্ষাবার্তা ডট কম

মঙ্গলবার, ১৪ই অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৩০শে আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

স্বস্তির অপর নাম ডে-কেয়ার

একক পরিবারে মা-বাবা দুজনেরই চাকরি বা ব্যবসার ব্যস্ততা। নিজের শিশুর দেখাশোনা, তার প্রাক স্কুলশিক্ষা কিংবা স্কুলে আনা-নেওয়া করাটা বিশাল একটা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্তানের দেখাশোনার জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় মাকেই তার ক্যারিয়ারটা বলি দিতে হয়। কিন্তু দুজনের ক্যারিয়ার ধরে রেখেও শিশুর দেখাশোনা ও তার সুন্দর বিকাশ হতে পারে অল্প কিছু টাকা খরচ করেই। উন্নত বিশ্বের মতো রাজধানী ঢাকাতেও এখন ডে-কেয়ার সেন্টার (দিবাযত্ন কেন্দ্র) নাগরিক শহুরে জীবনে খুব জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে প্রয়োজনের বিপরীতে মানুষের মধ্যে ডে-কেয়ার সেন্টার নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এছাড়া সচেতনতা না থাকায় এখনো অনেক শিক্ষিত মা-বাবা সন্তানকে বাসায় প্রায় অশিক্ষিত গৃহকর্মীর কাছে রেখে যাওয়াকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। যদিও রাজধানী জুড়ে গড়ে উঠেছে মানসম্পন্ন ডে-কেয়ার সেন্টার ও প্রি স্কুল হাউজ।

এছাড়া দিন দিন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, গৃহকর্মী সংকটে কর্মজীবী মা-বাবা দিশাহারা। সন্তানকে গৃহকর্মীর কাছে রেখেও চিন্তার শেষ নেই। বাচ্চা খেয়েছে তো? কোনো বিপদ হলো না তো? কর্মজীবী মা-বাবার এমন হাজারো চিন্তার সমাধান হতে পারে ডে-কেয়ার সেন্টার। তার চেয়েও বড়ো বিষয় শুধু শিশুর খাওয়া-দাওয়া ও সঙ্গ দেওয়া নয়, ডে-কেয়ার সেন্টার দিচ্ছে তার স্বাভাবিক বৃদ্ধির নিশ্চয়তা।

বাচ্চাকে সকালে ডে-কেয়ার সেন্টারে রেখে নিশ্চিন্তে যেতে পারেন অফিসে। ফেরার পথে আবার বাচ্চাকে নিয়ে ফিরতে পারেন। এই সময়ের ফাঁকে আপনার শিশুটির প্রতিদিনের কাজগুলো যেমন—গোসল, খাওয়া, পড়ানো, হোমওয়ার্ক করানো সবকিছুই তদারকি করবে ডে-কেয়ার সেন্টারের প্রশিক্ষিত শিক্ষকরা। ভাবছেন এটা সম্ভব কি না? আসলেই সম্ভব। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেল স্থানভেদে অভিভাবকদের চাহিদা মাথায় রেখেই গড়ে উঠছে ডে-কেয়ার সেন্টারগুলো। তা ছাড়া, ছয় মাসের শিশু থেকে ১৪ বছরের শিশুর দেখাশোনা, তাদের খাওয়াদাওয়া, ঘুমানো, স্কুলে আনা-নেওয়া এর সবকিছুই করে ডে-কেয়ার সেন্টারগুলো। যেমন উত্তরা, গুলশান, ধানমন্ডি এসব এলকায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিশুদের রাখে ডে-কেয়ার সেন্টারগুলো। সেইসঙ্গে চাইল্ড সাইকোলজিতে প্রশিক্ষিত লোকবল রয়েছে প্রায় প্রতিটি ডে-কেয়ার সেন্টারে। এই ডে-কেয়ার সেন্টারগুলো খুঁজে পাওয়াও কঠিন কিছু না। সব ডে-কেয়ার সেন্টারেরই রয়েছে ফেসবুক সাইট। তাই গুগল সার্চ করে অনায়াসে খুঁজে নিতে পারেন আপনার এলাকার ডে-কেয়ার সেন্টারটি।

এ প্রসঙ্গে পরীবাগের কিডি প্লে হাউজের কর্ণধার নির্জনা সুলতানা মুনিয়া জানালেন, এই এলাকায় চিকিত্সকদের বসবাস বেশি। তাই তারা সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত তাদের শিশুকে ডে-কেয়ার সেন্টারে রাখতে আগ্রহী। এ সময়টায় শিশুদের খাওয়া, ঘুমানো, প্রি স্কুলে পড়াশোনা সব দায়িত্ব আমাদের।

উত্তরার মম অ্যান্ড চাইল্ড ডে-কেয়ার সেন্টারের পরিচালক নিলুফার ইয়াসমীন নীলা বলেন, আমরা সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শিশুদের রাখি। খাওয়াদাওয়া, স্কুলে আনা-নেওয়া, পড়াশোনা সব দায়িত্ব আমাদের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল এসব ডে-কেয়ার সেন্টারে দৈনন্দিন পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলা, আঁকা, গান শেখানো হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আপনার বাচ্চা নিঃসঙ্গ বোধ করবে না। অনেক বাচ্চার সঙ্গে সারা দিন হেসে, খেলে, দুষ্টুমি করে, পড়াশুনো, খাওয়া-দাওয়া এবং খেলনা ভাগাভাগি করে দিন কাটবে তাদের।

মোহাম্মদপুরের রেড সান ডে-কেয়ারের কর্ণধার হালিদা পারভীন জানান, আমি দশ বছর ধরে ডে-কেয়ার সেন্টার পরিচালনা করছি। যখন শুরু করি তখন মানুষের মধ্যে ডে-কেয়ারের ধারণাটা পরিষ্কার ছিল না। এখন মানুষের মধ্যে ডে-কেয়ারের প্রতি আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। সামনের দিনগুলোতে ডে-কেয়ার সেন্টারের সম্ভাবনা বেশ উজ্জ্বল। তিনি বলেন, যে সজন্য শিশুর মনোবিকাশে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের নিয়ে পরিচালনা করতে হবে। তাহলে মা-বাবার বিশ্বাস অর্জন করা যাবে।

এ প্রসঙ্গে মনোবিজ্ঞানী ড. মোহিত কামাল জানান, কর্মজীবী মা-বাবারা নিশ্চিন্তে ডে-কেয়ার সেন্টার বেছে নিতে পারেন। এতে শিশুদের বাড়িতে একা থাকতে হবে না। তারা সামাজিকতার মধ্যে বড়ো হবে। মিশতে শিখবে। কারণ বাড়িতে অশিক্ষিত গৃহকর্মীদের চাইতে ডে-কেয়ারের প্রশিক্ষিত কর্মীরা যে কোনো বিবেচনায় ভালো। তবে ডে-কেয়ারে দেওয়ার আগে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে তাহলো, বাচ্চার সাইকোলজিক্যাল, ভাষা ও ইমোশনাল ডেভেলপমেন্ট যেন ঠিকমতো হয়, সে বিষয়গুলো নিশ্চিত করা। বাচ্চাকে শুধু রেখে দেওয়ার জন্য ডে-কেয়ার নয়। এখানে বাচ্চা আচরণ শিখবে, শিখবে সুন্দর করে কথা বলা, শুদ্ধ উচ্চারণ, অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করা। এ ছাড়া প্রি-স্কুলিংয়ের সবকিছুই সে এখান থেকে শিখে নেবে। এসব বিষয় নিশ্চিত হলে ডে-কেয়ার শিশুর জন্য আদর্শ জায়গা হতে পারে।

খরচ কেমন: সব ডে-কেয়ার সেন্টারের খরচ খুব কাছাকাছি। যারা শুধু প্রি-স্কুলিং এ দেয় তাদের জন্য একরকম চার্জ। আর যারা ডে-কেয়ারের জন্য দেয় তাদের জন্য আলাদা চার্জ। ডে-কেয়ারে যারা রাখেন তাদের জন্য প্রি-স্কুলিং-এর জন্য আলাদা কোনো চার্জ নেওয়া হয় না। কিডি প্লে হাউজের নির্জনা সুলতানা মুনিয়া জানালেন, তারা দুই থেকে ছয় বছরের শিশুদের নিয়ে থাকেন। ডে-কেয়ারের জন্য খরচ দিতে হয় মাসে ছয় হাজার টাকা। আর প্রি-স্কুলিং-এর জন্য সাড়ে চার হাজার। আর ভর্তি ফি আট হাজার টাকা। এর বাইরে বই, খাতা, কলম সব ডে-কেয়ার থেকে দেওয়া হয়। উত্তরার মম অ্যান্ড চাইল্ড ডে কেয়ার সেন্টারের পরিচালক নিলুফার ইয়াসমীন নীলা বললেন, তারা সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা আটটা পর্যন্ত শিশুদের দেখশোনা করেন। এর জন্য ভর্তি ফি পাঁচ হাজার। আর মাসে দিতে হয় সাত হাজার টাকা। মা-বাবা খাবার না দিলে দিনের খাবারও দেন। এছাড়া বাচ্চার স্কুলে দেওয়া ও আনাও তারাই করে থাকেন।

ঢাকার যত ডে কেয়ার সেন্টার: গুলশান, বনানী, মহাখালী ও নিকেতন হাউজিং সোসাইটিতে রয়েছে ডে-কেয়ার সেন্টার ‘শৈশব’, ‘উইলার্ন’ প্রভৃতি। উত্তরায় রয়েছে ‘কিডজ লিডজ’, স্পর্শ ডে কেয়ার, ধানমন্ডিতে ‘কিডস প্যারাডাইস’, লালমাটিয়ায় ‘বাম্বিল্যান্ড ডে-কেয়ার সেন্টার’, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ‘হাট্টিমাটিম ডে-কেয়ার সেন্টার’ প্রভৃতি।

এই বিভাগের আরও খবরঃ