website page counter এখন তো ছাত্র রাজনীতি নেই - শিক্ষাবার্তা ডট কম

মঙ্গলবার, ১৪ই অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৩০শে আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

এখন তো ছাত্র রাজনীতি নেই

রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীকে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার পর সার্বিকভাবে আলোচনায় এসেছে পুরো ছাত্ররাজনীতির বিষয়ই। কেন নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে ছাত্র নেতৃত্ব- সে ব্যাপারে মত দিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। তাদের কেউ কেউ বলছেন, ছাত্র রাজনীতি এখন নেই বললেই চলে। পুরো রাজনীতিই এখন কলুষিত হয়ে পড়েছে। তারা বলেছেন, ছাত্ররাজনীতি পরিশুদ্ধ করতে হলে বড় ধরনের কার্যক্রম প্রয়োজন। ছাত্ররাজনীতিকে মূল দলের রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, সাম্প্রতিককালে ছাত্রলীগের মধ্যে যে ঘটনা ঘটেছে সেটা ধরা পড়েছে দেখে এখন আলোচনায় আছে। এটা অনেক আগেই উদ্‌ঘাটন হওয়ার কথা ছিল। খুঁজলে হয়তো এমন আরো অনেক পাওয়া যাবে।

 

যুবলীগের অনেক নেতাও চাঁদাবাজি করে বেড়ায়। চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, দুর্নীতি কোথায় নেই। তবে হ্যাঁ সবার ক্ষেত্রে অ্যাকশন নেয়া হয় না। এক্ষেত্রে অ্যাকশন নেয়া হয়েছে এটা ভালো। ভবিষ্যতে তারা সবাই এ সমস্ত করতে যেন সাহস না পায় সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ছাত্ররাজনীতি পরিশুদ্ধ করার জন্য সরকারের ভূমিকা পরিবর্তন করতে হবে। সরকার যদি ছাত্র সংগঠনকে লাঠিয়াল বা সন্ত্রাসী বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করতে চায় তাহলে অন্তত সরকারনির্ভর সংগঠন কখনো ঠিক হতে পারবে না। যারা লাঠিয়াল বাহিনী তারাই আসবে। সরকারের ভূমিকা এবং ইচ্ছা পরিবর্তন হলেই ছাত্ররাজনীতিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এটা তো অনেক দিনের একটি সমস্যা। এটা নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। অনেক কথা হয়েছে। এখন মুশকিলটা হলো এদেরকে নিয়োগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। হয়তো সে কারণে অনেকে মুখ খোলেনি। বা প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত ঘটনাটি যায়নি। এখন এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী কঠিনভাবে অ্যাকশন নিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী অনেকগুলো কথা বলেছেন। তাতে মনে হয়েছে একটি কঠোর মনোভাবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এবং আল্টিমেটলি ছাত্রলীগ, ছাত্রদল বা আরো যারা আছে এরা তো প্রকৃতপক্ষে দলের সঙ্গে মিশে গেছে। প্রকৃত দল আর এদের মধ্যে কোনো তফাৎ তো আমি দেখি না। তিনি বলেন, ছাত্ররাজনীতির যে অধঃপতন হয়েছে এর অন্যতম কারণ হচ্ছে টাকা পয়সা। এবং ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, বিভিন্ন লীগ নামধারী তারা একধরনের এত শক্তিশালী হয়েছে যে, প্রশাসনের পক্ষেও তাদেরকে নিভৃত করা সম্ভব হয় না। ছাত্ররাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করতে প্রথমত আমি যেটা মনে করি, ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সরকার এবং প্রধান দলের একেবারে সম্পূর্ণরূপে কোনো সম্পর্ক না রাখা। এবং ছাত্রদের পরিচালিত ছাত্রলীগ, ছাত্রদল ইত্যাদি পরিচালিত হবে তাদের নিজস্ব সংবিধানে। নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের নেতাকর্মীদের নির্বাচিত করতে হবে। এবং ছাত্ররাজনীতি ছাত্রদের মধ্যে রাখতে হবে। যে মুহূর্তে তার ছাত্রত্ব থাকবে না সেই মুহূর্তে সে যে পদেই থাকুক না কেন তাকে পদত্যাগ করতে হবে। এবং আদর্শগতভাবে একটি দলের আদর্শ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই ছাত্র সংগঠনকে একেবারে নিজের মধ্যে নিয়ে নেবে- এটা যতদিন থাকবে ততদিন দল পরিশুদ্ধ হবে না।

শিক্ষক ও বিশ্লেষক ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, যাদেরকে ভারপ্রাপ্ত করা হয়েছে তারা কোনো নতুন নেতৃত্ব না। যাদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা তো ওই কমিটিরই লোক। কাজেই এটা কোনো নতুন নেতৃত্ব নয়। পুরান নেতৃত্ব। যা ছিল তাই। এখানে শুধুমাত্র দায়িত্ব বদল হয়েছে। এখানে নতুন নেতৃত্ব দেখছি না। যারা ইতিমধ্যে ছাত্র সংগঠনে আছেন তাদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। এটা নিয়ে যদি সরকার একটি তদন্ত কমিটি করে আসল ঘটনা বের হয় সেটাই হবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এখন কাকে নতুন নেতৃত্ব দিয়েছে সেটা কিন্তু বড় বিষয় না। আমি তো মনে করি না এখন ছাত্ররাজনীতি বলে কিছু আছে দেশে। অথবা এটাকে লালন করার মতো কিছু আছে। এখন যেটা করা দরকার সেটা হলো আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক দলগুলোকে ছাত্ররাজনীতি থেকে নিজেদের মুক্ত করা। ছাত্ররাজনীতি ছাত্র রাজনীতির মতোই গড়ে উঠুক। কোনো রাজনৈতিক দলের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে অথবা তাদের অঙ্গ সংগঠন হয়ে কোনো ছাত্ররাজনীতি এদেশে থাকার প্রয়োজন নেই। ছাত্ররাজনীতি স্বাভাবিক পন্থায় ছাত্রদের মধ্যে থেকেই গড়ে উঠুক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, ছাত্রলীগকে দিয়ে যে সব অনৈতিক কর্মকাণ্ড করানো হয় এটা তো ছাত্রলীগের দোষ না। কোটা আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক এগুলোকে দমন করা বা সরকারবিরোধী যেকোনো ছাত্র সংগঠনের আন্দোলনকে দমন করতে তাদেরকে যেভাবে ব্যবহার করা হয় এবং ছাত্রলীগকে যে সব কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করা হয় এখানে তারা দোষী না। যারা করায় তাদের দোষ। নিজেরা ক্ষমতায় থাকার জন্য নিজেদের সুবিধার জন্য যারা ছাত্রলীগকে বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত করায় তারা যদি নিজের জায়গায় থাকে আর দুজন ছাত্রলীগের নেতা পরিবর্তন হয় তাহলে ছাত্রলীগের শ্রেণি চরিত্র তো পরিবর্তন হবে না। আমার কাছে বরং দুঃখ লাগে যে, ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এত বড় অবদান রেখেছে সেই সংগঠনকে আজকে কী পরিমাণ দূষিত করে ফেলা হয়েছে। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের মূল নেতৃত্ব ঠিক করতে হবে। তাদের নিয়ত যদি ভালো থাকে ছাত্রলীগ ভালোভাবে চলবে। তিনি বলেন, ছাত্ররাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে ছাত্র রাজনীতিকে সম্পূর্ণভাবে মূল দল থেকে আলাদা করে দেয়া। এখন কে নেতা হবে সে সমস্ত কিছু মূল দল ঠিক করছে। এবং মূল দলের মধ্যে যতগুলো বিষয় থাকে সবগুলো ছাত্র সংগঠনের মধ্যে প্রতিফলিত হয়।

টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অপসারণ করার ঘটনাটি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা যায়। আরো অনেক আগে হতে পারতো এরকম দৃষ্টান্ত। সময় অনেক অতিবাহিত হয়েছে। যে কারণে ঘটনা অনেক দূর গেছে। কারণ হচ্ছে অভিযোগের প্রেক্ষিতে তারা অপসারিত হয়েছে। কাজেই এই অপসারণ যথেষ্ট না। এখানে সুস্পষ্টভাবে একটি দুর্নীতি এবং অনিয়ম হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে। এটার জন্য অন্য যেকোনো নাগরিকদের মতো তাদেরকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। এই সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বিভিন্নভাবে একই ধরনের অপরাধে জড়িত ছিল কিনা সেটা খতিয়ে দেখতে হবে। এ বিষয়ে যদি সরকার সত্যিকার অর্থেই প্রতিকার চায় তাহলে বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। দ্বিতীয়তঃ ছাত্র সংগঠন এই ঘটনা এককভাবে করেনি। নিশ্চয় এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কারো কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা সেটা দেখতে হবে। এবং তাদেরকে যদি এই বিচারের ঊর্ধ্বে রাখা হয় তাহলে এই সমস্যার সমাধান কোনোদিন হবে না।

বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, রাব্বানী আর শোভনের বিষয়ে যে ঘটনাটি ঘটেছে আমার কাছে একটু অবাকই লাগছে। ছাত্রলীগ তো বাংলাদেশের বা বাংলাদেশের রাজনীতির বাইরের কোনো অঙ্গন নয়। হঠাৎ করে এই দুটি ছেলের কাছে এত হাইয়েস্ট মোরাল বা উচ্চ মাত্রায় নৈতিকতা আশা করা কতটুকু যৌক্তিক। গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন স্থানে বলা হয়ে থাকে ছাত্রলীগের ঐতিহ্য। ছাত্রলীগের ঐতিহ্য তো আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যের চেয়ে বড় না। বর্তমান এমপি/মন্ত্রীদের দুর্নীতির কথা যে প্রতিদিন শুনছি আমরা সেখানে ছাত্রলীগকে বাইরে রাখার কি আছে?

এই বিভাগের আরও খবরঃ