website page counter মানসম্মত শিক্ষায় প্রাধান্য জরুরি - শিক্ষাবার্তা ডট কম

শনিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৬ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

মানসম্মত শিক্ষায় প্রাধান্য জরুরি

ড. শামসুল আলম

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টতে সামগ্রিক বৈশ্বিক উন্নয়নের সঙ্গে মানব উন্নয়ন প্রাধান্য পেয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় উন্নয়নসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ‘জনমিতি’ (population dividend)-এর গুরুত্ব একটি অন্য মাত্রা পেয়েছে।

পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধি একটি সীমার মধ্যে রাখার পাশাপাশি সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে যথাযথ জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর ও দক্ষ সম্পদে পরিণত করা এখন গবেষকদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি অনস্বীকার্য যে উন্নয়নের সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। এক অর্থে এই বিষয়টি উন্নয়নের জন্য উদ্দীপকের ভূমিকা পালন করে। প্রশ্ন হলো কীভাবে? উন্নয়ন এজেন্ডায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রজনন-সক্ষমতা, অভিবাসন, নগরায়ণ ইত্যাদি উন্নয়নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে প্রভাবিত করে। এছাড়াও ভোগ, উত্পাদন, কর্মসংস্থান, আয়-ব্যয়, দারিদ্র্য ইত্যাদি ক্ষেত্রেও জনসংখ্যা পরিবর্তনের প্রভাব বিদ্যমান। জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাবকগুলোর সঠিক উপায়ে ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও নীতিমালার আবশ্যকতা রয়েছে। মোট জনসংখ্যায় কর্মক্ষম জনসংখ্যার আধিক্যকে জনমিতিক লভ্যাংশ হিসেবে ভাবা হয়।

জনসংখ্যা ও বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট :সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে জনসংখ্যার সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মানবগোষ্ঠীকে সম্পদে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। World Population Prospect: The 2017 Revision-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ২৬৫ জন লোকের বসবাস। একই সঙ্গে সার্কভুক্ত দেশগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে বাংলাদেশ শীর্ষে অবস্থান করছে। প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাসকারী লোকের সংখ্যা জনবহুল ভারতে ৪৫০ জন, পাকিস্তানে ২৫৫ জন, নেপালে ২০৪ জন এবং শ্রীলঙ্কায় ৩৩২ জন। এর বাইরে কিছু দেশ, যেমন—ব্রাজিলে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৫ জন এবং আফ্রিকা মহাদেশের নাইজেরিয়াতে ২০৯.৬ জন লোক বাস করে। এই রিপোর্টের সঙ্গে ২০৩০ সালের এই দেশগুলোতে জনসংখ্যার ঘনত্ব কত হবে সেই সম্পর্কেও ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। তা থেকে দেখা যায় যে, বাংলাদেশ ২০৩০ সালে জনসংখ্যার ঘনত্ব হবে ১৪২৫.৭ জন/বর্গকিমি। অর্থাত্ জনসংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকবে। অত্যধিক জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা আমাদের জন্য সংবেদনশীল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ বিষয়।

বাংলাদেশের ১৯৬০-২০৫০—এই ৯০ বছরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, মোট প্রজনন সক্ষমতার হার (TFR), জন্মকালীন সময়ে প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল এবং প্রতি ১ হাজারে পাঁচ বছরের নিচে শিশুমৃত্যুর হারের একটি তুলনামূলক চিত্র আলোচনা করা প্রয়োজন, যাতে করে এগুলো অর্জনে এবং জনমিতিক লভ্যাংশ-সম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থা নিরূপণ করা সহজতর হয়। ১৯৬০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল বছরে ২.৯৯ শতাংশ, যা ২০২০ সালে ১.১৫ শতাংশে নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০৫০ সাল নাগাদ বৃদ্ধির হার হবে ০.২৪ শতাংশ। একইভাবে ১৯৬০ সালে বাংলাদেশের নারীপ্রতি সন্তান জন্মহার ছিল ৬.৮ জন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সরকারি-বেসরকারি নানা ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ, জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি, নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সফলতা ইত্যাদি কারণে ২০১৯ সালে নারীপ্রতি সন্তান জন্মহার ১.৯৪ জনে আসবে, আর তা ধীরে ধীরে আরো কমে ২০৫০ সাল নাগাদ ১.৬৬ শতাংশে এসে দাঁড়াবে। জন্মকালীন আয়ুষ্কালের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন অনুকরণীয়।

জনমিতিক লভ্যাংশ ধারণাটিতে নির্ভরশীল ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭০ সালে ১৫ বছরের নিচে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ৪৪.৭ শতাংশ, ২০১০-এ ছিল ৩১.৭ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে তা ১৭.৩ শতাংশ হবে। অর্থাত্ মোট জনসংখ্যায় শিশুদের হার দ্রুত কমে যাচ্ছে। একইভাবে ২০৫০ সালে ২০ বছরের নিচে থাকা জনগোষ্ঠী হবে মোট জনসংখ্যার ২৩.৫ শতাংশ, যা ১৯৭০ সালে ছিল ৫৪.৭ শতাংশ। নির্ভরশীল জনগণের সংখ্যা কমে যাওয়ার সঙ্গে কর্মক্ষম জনগণের (১৫-৫৯) পরিমাণ বেড়ে যাবে, ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ বাড়বে। ২০৪০ সালে দেশে মোট জনগোষ্ঠীর ৬০.৩ শতাংশ কর্মক্ষম লোক থাকবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ লোকের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও তাদেরকে দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি পরিকল্পনা নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই সময়ে নির্ভরশীল বৃদ্ধদের সংখ্যা হবে ১৫ শতাংশ, যা এখন প্রায় ৭ শতাংশ। এ কারণে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।

জন্মনিয়ন্ত্রণ সব সময়ই দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার পেয়েছে। সুখী সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়তে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি জনগণের অধিকার। এরই ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে বাস্তবসংগত কারণেই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতি নারীতে শিশু জন্মহার (TFR) ভিন্ন। যেমন, সিলেটে সর্বোচ্চ ২.৯ জন এবং খুলনায় সর্বনিম্ন ১.৯ জন। এই বিষয়টিকে মাথায় রেখে জন্মনিয়ন্ত্রণের আঞ্চলিক প্যাকেজ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণের ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। এছাড়া বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ রোধ করার পাশাপাশি নারীশিক্ষা জোরদারকরণ, জন্মনিয়ন্ত্রণ বিষয়ে জনসাধারণকে সচেতন করা, স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

বাস্তুতন্ত্র ও জনসংখ্যার আনুপাতিক বিন্যাস :আমাদের পরিবেশে উপস্থিত সকল প্রাকৃতিক উপাদানের একে অপরের সঙ্গে যে মিথস্ক্রিয়া তা বাস্তুতন্ত্র নামে পরিচিত। একটি দেশের বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে জনসংখ্যার সম্পর্ক রয়েছে। যে কোনো বাস্তুতন্ত্রের ধারণক্ষমতা নির্দিষ্ট। কোনো দেশের জনসংখ্যা সেই পরিমাণ হওয়া উচিত, যেই পরিমাণ হলে বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি অর্থাত্ প্রাকৃতিক সম্পদের স্থায়ী বিনষ্টি ছাড়াই টেকসই উপায়ে বাস্তুতন্ত্রে ঐ পরিমাণ জনগোষ্ঠী সংশ্লিষ্ট প্রাণিকুল টিকে থাকতে পারে। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত জনগোষ্ঠী বাস্তুতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর, যার ফলে পরিবেশের বিপর্যয়, প্রাকৃতিক উপাদানসমূহের জোগানে ঘাটতি প্রভৃতি সমস্যা দেখা দেয়। ফলে বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হয়। জনসংখ্যার বহনক্ষমতা বাস্তুতন্ত্রের (Eco-system) সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। বাস্তুতন্ত্রের সক্ষমতার অতিরিক্ত জনসংখ্যা হলে প্রাকৃতিক সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে, যা পূর্বাবস্থায় আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় নয়। সারা পৃথিবীর বাস্তুতান্ত্রিক ভিত্তিতে জনসংখ্যার বহনক্ষমতা ৯ বিলিয়ন হিসেবে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এর বেশি হলে পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়তে থাকবে।

বাস্তুতন্ত্রের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত জনগণ থাকলে পরিবেশের অবনতি ঘটতে থাকে। পরিবেশের নানা উপাদান, যেমন—পানি, মাটি, বাতাস ইত্যাদির দূষণের মাত্রাও বেড়ে যায়। ফলে পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। পরিবেশ দূষণ, মরুকরণ, বন উজাড়, কৃষিজমির অপরিকল্পিত ব্যবহার ইত্যাদির জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অতিরিক্ত জনসংখ্যা দায়ী। বাংলাদেশ বিশ্বের নবম জনবহুল দেশ এবং উল্লেখযোগ্য ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। এই মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে পরিবেশ দূষণের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। গত বেশ কয়েক দশকে বন উজাড়, জলাভূমি ধ্বংস, ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থিত পানির দূষণসহ নানা পরিবেশগত সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যেমন—খরা, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বর্তমান সরকার পরিবেশ দূষণ রোধ করে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির প্রভাব মোকাবিলায় নানা নীতিমালা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর পাশাপাশি যেটা প্রয়োজন, তা হলো সমস্যার উত্স জানা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমস্যার সমাধান খোঁজা। কোনো বাস্তুতন্ত্রে মানুষের পরিমাণ যত বাড়বে, এতে যে পরিমাণ সম্পদ আছে তার ব্যবহার বাড়তে থাকবে। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত জনগোষ্ঠী যত বাড়তে থাকবে মাথাপিছু সম্পদের ওপর চাপ বাড়তে থাকবে। এতে করে প্রাকৃতিক সম্পদের অতিব্যবহার বেড়ে যাবে। যেমন, বাংলাদেশে জনসংখ্যা অতিরিক্ত হওয়াতে ভোগ্যপণ্য উত্পাদনের ওপর চাপ থাকে। ফলে একদিকে যেমন কৃষিজমি উজাড় করে বসতবাড়ি বানানোর হার বেড়েছে তেমনি অল্প জমিতে অধিক ফসল ফলানোর বিষয়টিও মাথায় রাখতে হচ্ছে। এটি দেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে অতিমাত্রায় ব্যবহারের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ কমছে, নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। শিল্পায়নের ফলে ভূ-উপরিস্থিত জলাশয়ের পানিও মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে। জলাভূমির জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে, স্বাদু পানির মাছের উত্পাদন কমছে। চাপ বাড়ছে খাদ্যশৃঙ্খলের ওপর। নদীভাঙন, লবণাক্ততাসহ অন্যান্য কারণে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের কারণে শহরে মানুষের চাপ বাড়ছে। এর ফলাফলে অপরিকল্পিত নগরায়ণের শিকার দেশের বেশিরভাগ মেট্রোপলিটন শহর।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জনসংখ্যা : বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাগুলোতে মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। চলমান সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রধান একটি উদ্দেশ্য হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন। আশা করা যাচ্ছে, আগামী অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও এর ব্যত্যয় ঘটবে না। বর্তমানে বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, রূপকল্প-২০৪১ প্রণয়নের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এতে সামগ্রিক উন্নয়নের মূলে যে জনগণ তা মাথায় রেখেই প্রণয়নের কাজ চলছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অধ্যায় ১০-এ উল্লিখিত ‘জনসংখ্যা কর্মসূচি’তে এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এতে ধারণা করা হয়েছে, বর্তমান হারে বৃদ্ধি ঘটলে ২০২০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১৭ কোটি। যেহেতু বাংলাদেশের সামনে ‘জনমিতির লভ্যাংশ’র মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভাবতে হচ্ছে, ফলে ২০৬১ সালে এ দেশের কর্মক্ষম (১৫-৫৯) জনসংখ্যা হবে ১৩ কোটি, যা ২০১১ সালে ছিল সাড়ে ৮ কোটি। এই বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে ভাবনার বিষয়। এদেরকে দক্ষ জনগোষ্ঠীতে রূপান্তর করে দেশের উন্নয়নে কার্যকর অংশগ্রহণের উপযোগী করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এ সময়ের জন্য হবে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। এই জনগোষ্ঠীকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হবে যুবসমাজ। যেহেতু আমরা ইতিমধ্যে জনমিতির লভ্যাংশ সময়ের বেশ কিছুটা পাড়ি দিয়ে এসেছি। সঠিক মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার বাস্তবায়নের দিকে আমরা নজর রেখেছি এবং জনসংখ্যার ব্যবস্থাপনাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে নীতি কৌশল প্রণয়ন করছি।

রূপকল্প-২০৪১ ও জনসংখ্যা : বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড়ো অঙ্গীকার হলো ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করা। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পদক্ষেপস্বরূপ রূপকল্প-২০৪১ প্রণয়নের কার্যক্রম সরকার হাতে নিয়েছে। এই রূপকল্পটি প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, রূপকল্প-২০২১-এর পরবর্তী ধাপ। ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠী দাঁড়াবে ২০ কোটির ওপরে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তা সঠিক উপায়ে ব্যবহার করে সকল জনগণের সেবা প্রাপ্যতা নিশ্চিত করে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা থাকবে এই পরিকল্পনা দলিলে যার অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হলো চরম দারিদ্র্য দূর করে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করা।

প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সকল স্তরের মানসম্মত শিক্ষা জোরদারকরণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এর জন্য সবার প্রথমে প্রয়োজন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ। এর ফলে সকল স্তরে মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের পাশাপাশি জনসম্পদ তৈরিতে নিরক্ষরতার হার অবশ্যই কমাতে হবে। আবার বাস্তুতন্ত্রের বহনক্ষমতা ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাপ্যতা বিবেচনায় রেখে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

ইতিমধ্যে ২০১৭ সালের ১৫+ বয়সিদের সাক্ষরতার হার ৭২.৯ শতাংশে এসে পৌঁছেছে, যা ২০১০ সালে ছিল ৫৮.৬ শতাংশ। মাধ্যমিক শিক্ষায় ২০১০ সালের ভর্তির হার ছিল ৪৬ শতাংশ, যা ২০১৬-তে ৬২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তৃতীয় স্তরের উচ্চশিক্ষার উন্নয়নে সরকার ২০১৭ সালে ‘Strategic Plan for Higher Education in Bangladesh: 2017-2030’ গ্রহণ করেছে।

এছাড়াও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে মহিলাদের নানা কর্মমুখী প্রশিক্ষণ প্রদান এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত সকলের জন্য অবৈতনিক শিক্ষাসেবা সরবরাহ করার অঙ্গীকার পরিকল্পনা দলিলে করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ২০৪১ সালের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কর্মদক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে উল্লিখিত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা হবে : (ক) কারিগরি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ; (খ) গ্রামীণ প্রশিক্ষণ জোরদারকরণ; (গ) প্রশিক্ষণ প্রদানে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব নিশ্চিতকরণ; (ঘ) কর্মবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা।

জনমিতির লভ্যাংশের সুযোগ গ্রহণ যে কোনো দেশ ও জাতির জন্য একটি বিরল সুযোগ। বাংলাদেশের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রূপকল্প-২০৪১-এ বর্ণিত পথনির্দেশনাকে সামনে রেখে উন্নত দেশের মর্যাদা অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়া। সময়োচিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে তার সফল বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। এ বিষয়ে আমরা সচেতন আছি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার পথে আমাদের উজ্জীবিত পথচলা অব্যাহত থাকবে।

ড. শামসুল আলম :অর্থনীতিবিদ

সূত্রঃ ইত্তেফাক

এই বিভাগের আরও খবরঃ