website page counter শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে ডট বিডি, ডট বাংলা ব্যবহারের নির্দেশ - শিক্ষাবার্তা ডট কম

শনিবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৬ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে ডট বিডি, ডট বাংলা ব্যবহারের নির্দেশ

বিভাষ বাড়ৈ।।

প্রায় ১০ বছর আগে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করার কথা ছিল ২০১৮ সালের মধ্যে। কিন্তু ২০১৯ সালের শেষ প্রান্তে এসেও শিক্ষানীতির অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি। নীতি বাস্তবায়নে কয়েক দফা লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও ফল শূন্য। কেবল তাই নয়, নীতি বাস্তবায়ন করতে যে বিষয়টি সবচেয়ে জরুরী সেই শিক্ষা আইনও ঝুলে আছে বছরের পর বছর ধরে। শিক্ষা নীতিতে ২০১৮ সালের মধ্যে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতায় পড়েছে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। অসন্তোষ রয়েই গেছে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়ে। অর্থ সঙ্কট, ভয়াবহ অবকাঠামো ও শিক্ষক সঙ্কট আর শিক্ষকদের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখাই এখন নীতি বাস্তবায়নে প্রধান অন্তরায় হয়ে সামনে এসেছে।

ঠিক এমন অবস্থায় শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পিছিয়ে ২০২১ সালকে ‘টার্গেট বছর’ নির্ধারণ করা হয়েছে। জানা গেছে, ২০২১ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণীতে উন্নীত করা হলেও তার আগে চলবে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক সঙ্কট দূর কাজ। শিক্ষা নীতি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে। জানা গেছে, কয়েক বছর ধরেই শিক্ষানীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করছে দুই মন্ত্রণালয়। কিছু বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করলেও তার অগ্রগতি ঝুলে আছে কয়েকটি বৈঠক পর্যন্তই। কিছু বিষয়ে প্রথমদিকে মন্ত্রণালয় উদ্যোগী হলেও এখন সেই উদ্যোগ রীতিমতো বন্ধ হয়ে আছে। জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে যে বিষয়টি সবচেয়ে জরুরী সেই শিক্ষা আইন ঝুলে আছে প্রায় ৯ বছর ধরে। অথচ শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতেই সেখানে শিক্ষা আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। কখনও নোট গাইড, কখনও কোচিং সেন্টার, কখনও শিক্ষা বাণিজ্যে যুক্ত অন্য কোন গোষ্ঠীর কারণে আটকে যাচ্ছে শিক্ষা আইনের কাজ। শিক্ষানীতির পরই শিক্ষা আইন নিয়ে কাজ শুরু করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সাত বছর আগে এক বছরেই কাজে বেশ অগ্রগতি এসেছিল। শিক্ষা আইনের প্রথম খসড়া তৈরি করা হয়েছিল ২০১২ সালে। পরে নানা বিষয় সংযোজন-বিয়োজন করে জনমত যাচাইয়ের জন্য ২০১৩ সালে খসড়া প্রকাশ করা হয়েছিল মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে।

এর পর তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ দিয়ে সেটি ফেরত পাঠানো হয়। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের আলোকে এ পর্যন্ত তিনবার আইনের খসড়াটি ফেরত পাঠিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এর পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শুরু হয় নোট গাইড ব্যবসায়ীদের তদ্বির, আন্দোলনের হুমকি। কোচিং ব্যবসায়ীরাও সক্রিয় হন। শিক্ষা আইনকে দুর্বল করে অবাধ বাণিজ্য করার আশায় প্রতিবাদ কর্মসূচীও চালিয়ে যেতে থাকেন। আজ পর্যন্ত আইন করতে পারেনি মন্ত্রণালয়।

শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. শেখ ইকরামূল কবির বলছিলেন, নীতিতেই বলা আছে শিক্ষা আইনের কথা। এটি না করতে পারলে শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন হবে না। অনেক সময় চলে গেছে। শিক্ষায় আমাদের অনেক অর্জন আছে। তবে এটা না করতে পারলে আমাদের শিক্ষানীতি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হবে না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার বিষয়ে খুবই সজাগ। নতুন মন্ত্রী এসেছেন, তিনি নিশ্চয়ই এ বিষয়ে নজর দেবেন।

শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে অন্যতম চ্যালেঞ্জ মনে করা হয় অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। গত সরকারের শেষ তিন বছরে প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে দুই মন্ত্রণালয়ের কাজের সমন্বয়ের অভাবে উদ্যোগ আজও বাস্তবায়ন হয়নি।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন্ সময় বলেছে, ২০১৮ সালের মধ্যে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও সেটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দৃশ্যমান নানা সমস্যা সামনে চলে এসেছে। তাই আগে এ সংক্রান্ত সমস্যা দূর করে প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অষ্টম শ্রেণীর জন্য প্রস্তুত করা হবে। এরপর ২০২১ সালে শিক্ষানীতি অনুসারে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণীতে উন্নত করা হবে।

দুই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাই বলছেন, শিক্ষানীতি অনুসারে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা হবে। তবে তা ২০২১ সালে বাস্তবায়ন হবে। কারণ নানা সমস্যা আছে। অবকাঠামোর অভাব আছে, শিক্ষক সঙ্কট আছে, আছে নানা সীমাবদ্ধতা। এসব বাধা ২০২০ সালের মধ্যে দূর করার আশা মন্ত্রণালয়ের। এর পরই ২০২১ সালে দৃশ্যমান হবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা।

দুই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নীতি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় সঙ্কট হয়ে দাঁড়িয়েছে সারাদেশের হাজার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভয়াবহ অবকাঠামো সঙ্কট। খোদ রাজধানীতেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থা বেহাল। বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেই শিশুদের উপযোগী শ্রেণীকক্ষ। যাদের আছে তাও আকারে ছোট। অষ্টম শ্রেণী তো পরের কথা, ১৫ হাজার প্রধান শিক্ষকসহ ৫৪ হাজারের বেশি শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমই পড়েছে সঙ্কটের মুখে। শিক্ষানীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা চালুর সরকারী উদ্যোগের বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে এমন উদ্বেগজনক চিত্রই বেরিয়ে এসেছে।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, অসংখ্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দখলসহ নানা সঙ্কটের কারণে বর্তমানের পঞ্চম শ্রেণী চালু রাখাই দায়। এমন জটিলতা উত্তরণের চিন্তা ছাড়াই এতদিন ২০১৮ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল, যাকে ভুল চিন্তা বলেই বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এখন সরকারের সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাই বলছেন, প্রাথমিক শিক্ষা আপাতত অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত হচ্ছে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ সভাতেই এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ বছরও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনেই থাকছে।

কিন্তু কি কি সমস্যা আসলে সামলে চলে এসেছে? কেন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পিছিয়ে যাচ্ছে? জানা গেছে, নীতি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় সঙ্কট হয়ে দাঁড়িয়েছে সারাদেশের হাজার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভয়াবহ অবকাঠামো সঙ্কট। সঙ্গে আছে শিক্ষক সঙ্কট ও শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষার চ্যালেঞ্জ। তবে এরই মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষার নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন করার কাজ শুরু করেছে।

এদিকে মডেল উদ্যোগ হিসেবে ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীর অনুমোদন দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে ৫০০ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদান করানো হচ্ছে। কিন্তু এসব বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর পাঠদানের জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি। কোন কোন বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষকও দেয়া হয়নি। ফলে অনেক বিদ্যালয়ে এসব শ্রেণী চালু রাখাই অসম্ভব। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের ধীরগতি নিয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও সহসা কথা বলতে চান না।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব সামনে চলে আসা সমস্যার কথা তুলে ধরে বলছিলেন, জাতীয় শিক্ষানীতিতে আগামী বছরের মধ্যেই অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে কাজ করছে সরকার। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকা, শিক্ষক সঙ্কটসহ নানা বিষয় আছে। যেগুলোর আগে সমাধান করতে হবে। নানা সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।

দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এমনকি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই অনেকে বলছেন, দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যে অবকাঠামো আছে তা দিয়ে কোনভাবেই প্রাথমিকে অষ্টম শ্রেণী বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। আগে অবকাঠামোর উন্নয়ন করা প্রয়োজন। যে শিক্ষক আছে তা দিয়েও অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা নিশ্চিত করা যাবে না। তার ওপর সারাদেশেই প্রাথমিক শিক্ষকদেরও শিক্ষার বাইরে বিভিন্ন সরকারী কর্মসূচীতে নিযুক্ত করা হয়।

জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচী, শিশু জরিপ কর্মসূচী এবং নির্বাচনী ভোটার তালিকা তৈরিসহ নানা সরকারী কাজে ব্যস্ত রাখা হয় শিক্ষকদের। শিক্ষাবহির্ভূত অন্তত ২১ ধরনের কাজ করতে হয় প্রাথমিক শিক্ষকদের। যা শিক্ষার একটি বড় সমস্যা।

শিক্ষক সঙ্কট নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসেব বলছে, দেশের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫৩ হাজারের ওপর শিক্ষকের পদ শূন্য। এরমধ্যে প্রধান শিক্ষক পদ ২১ হাজার এবং সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য ৩২ হাজার। এছাড়া শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় বর্তমানের পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে আগামী কিছুদিনের মধ্যেই আরও ১২ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে।

ঢাকার বাইরে অবস্থিত সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হয় প্রায়ই। মাঝে মাঝেই দেখা যায় ভবন নেই, ‘শিশুরা ক্লাস করছে খোলা আকাশের নিচে’। আবার দেখা যায় ‘একজন শিক্ষক শিক্ষার্থী কয়েক শ’। কয়েক কিলোমিটার নৌকায় পাড়ি দিয়েও স্কুলে শিশুদের যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। এখানেই শেষ নয়। এই মুহূর্তেও দেশের দেড় হাজার গ্রামে নেই সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। এসব এলাকায় ইতোমধ্যেই বিকল্প হিসেবে বাড়ছে কেজি স্কুলসহ প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান।

এদিকে শিক্ষানীতিতে স্পষ্ট সমাধান দেয়া হলেও অসন্তোষ রয়েই গেছে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়ে। পঞ্চম শ্রেণীর এ সমাপনী পরীক্ষা নিয়ে অভিভাবকদের অসন্তোষ সবচেয়ে বেশি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এ পরীক্ষার বিষয়ে গেল কয়েক বছরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান। আগের প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বারবারই বলেছেন, পরীক্ষা থাকবে না। তিনিও সেটাই চান। তবে পরীক্ষাও রয়ে গেছে। তিনি শেষ পর্যন্ত বলেছেন, মন্ত্রিপরিষদ যতদিন পরীক্ষা বাতিলের কথা না বলছে ততদিন চলবে পরীক্ষা। ফলে চলছে এ পরীক্ষা।

শিশু, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের অধিকাংশই চান শিশুদের ওপর থেকে এ পরীক্ষার বোঝা নামানো হোক। আবার শিক্ষা নীতিতেও বলা আছে অষ্টম শ্রেণীতে এমন পাবলিক পরীক্ষা কথা। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে সেই স্তরের পরীক্ষা নেয়ার কথা বলা আছে। বলা আছে, পঞ্চম শ্রেণীতে স্থানীয়ভাবে পরীক্ষা নেয়া যেতে পারে।

জাতীয় শিক্ষানীতির সুপারিশ সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত ঝুলেই গেছে শিক্ষক নিয়োগে বহু প্রতীক্ষিত শিক্ষা কর্ম কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া। জাতীয় শিক্ষানীতি এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের এই দাবি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত হওয়ার পরও বছরের পর বছর ধরে এ সংক্রান্ত সকল কাজ বন্ধ হয়ে আছে। এমনকি কমিশন গঠনের বিষয়ে সচিব কমিটির অনুমোদনের পরও চলে গেছে ৬ বছর। কমিশন গঠনের কাজ আগানোর পরিবর্তে এখন বেসরকারী শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা নিয়ে যে প্রক্রিয়ায় নিয়োগ হচ্ছে তা নিয়েও বেধেছে জটিলতা।

জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) অধীনে নিয়োগের কথা বলা হলেও দিনের পর দিন অপেক্ষা করছেন আবেদনকারীরা। কোথায়, কিভাবে, কবে আসলে নিয়োগ হচ্ছে তা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন। আবার বিবন্ধনকারী ওই প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় শত শত সনদ জালিয়াতির তথ্য বেরিয়ে আসায় নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়েই সন্দিহান সারাদেশের লাখ লাখ আবেদনকারী। অথচ শিক্ষা নীতিতেই বলা হয়েছে, শিক্ষক নিয়োগে হবে আলাদা কর্ম কমিশন। যে কমিশন গঠনের পরই এনটিআরসিএ বিলুপ্ত করতে হবে।

শিক্ষানীতির সুপারিশ অনুসারে কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করার পর ঝুলে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য ও শিক্ষাবিদরা। ক্ষুব্ধ শিক্ষক সংগঠনের নেতারাও। কমিশন গঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষাবিদদের সুপারিশ মেনেই দ্রুত কাজ শেষ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল সরকার। সে অনুসারে ২০১২ সালের ১৬ অক্টোবর শিক্ষক নিয়োগে পৃথক কর্ম কমিশন গঠনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুমোদন করে সরকারের সচিব কমিটি। কমিটি একই সঙ্গে সেদিন শিক্ষা কর্ম কমিশন গঠনের সারসংক্ষেপ যাচাই-বাছাই করে মতামত দেয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয়েও পাঠিয়েছিল। কিন্তু সেই পর্যন্তই। কিছু আমলার ফাইল চালাচালির মধ্যেই এখন আটকে আছে বহু প্রতীক্ষিত শিক্ষা কর্ম কমিশন গঠন প্রক্রিয়া।

অথচ সব খাতের নিয়োগ সরকারী কর্ম কমিশন (পিএসসি) দেখাশোনা করায় সঙ্কট বাধে নিয়োগে। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সচিবদের সভায় শিক্ষা খাতে পৃথক কর্ম কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। এখন পর্যন্ত কমিশনের কাজের অগ্রগতি দৃশ্যমান না হওয়ায় হতাশ শিক্ষক, শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষা কমিশন গঠনের খবর শুনে সকলের মনে আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু কার্যক্রম থমকে যাওয়ায় শিক্ষক সমাজ হতাশ।

বিষয়টিতে হতাশ শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. শেখ ইকরামূল কবির। তিনি বলছিলেন, শিক্ষার উন্নয়নে সবার আগে দরকার দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক। দরকার স্বচ্ছ নিয়োগ। এজন্য শিক্ষানীতিতেই বলা হয়েছিল, শিক্ষক নিয়োগে হবে আলাদা কর্ম কমিশন। যে কমিশন গঠনের পরই এনটিআরসিএ বিলুপ্ত করতে হবে। কিন্তু কমিশন তো হয়নি। এনটিআরসিএ বিলুপ্ত হয়নি, একটু পদ্ধতি পাল্টে যেভাবে নিয়োগ হচ্ছে তাতে লাভ হচ্ছে না। তাই আমার আহ্বান থাকবে শিক্ষা কর্ম কমিশন গঠনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পদক্ষেপ নেবে।

উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর ছয় বছর চলে গেলেও ইংরেজী মাধ্যমের স্কুল পরিচালনায় নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারেনি শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিছু আমলার উদ্দেশ্যমূলক গাফিলতি এবং ইংরেজী মাধ্যমের স্কুলের কর্তাব্যক্তিদের তদবিরের জোরেই এই কার্যক্রম ঝুলে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ নীতিমালা প্রণয়নের নামে সভা, কর্মশালা এই ধরনের কাজে নিয়মিত মোটা অঙ্কের অর্থও ব্যয় হচ্ছে।

নীতিমালা না থাকায় শিক্ষার্থীদের উগ্র মতবাদে উদ্বুদ্ধ করা, ইচ্ছেমতো টিউশন ফি আদায়, অনুমোদনহীন পাঠ্যসূচী পাঠদান, জাতীয় দিবস পালন না করা ও জাতীয় সংগীতের প্রতি অবজ্ঞা করাসহ নানা ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে ইংরেজী মাধ্যমের স্কুলগুলো। কার্যত এই ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণই নেই।

‘জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০’ প্রণয়ন কমিটির সদস্যরা বলছেন, শিক্ষানীতির একটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কিন্ডারগার্টেন থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই নিবন্ধিত হতে হবে। কিন্তু ইংরেজী মাধ্যম স্কুলের ক্ষেত্রে সেটা আমরা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। এমনকি শিক্ষা আইনও করা হলো না এখন পর্যন্ত। যেভাবেই হোক এটা বারবার আটকে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে শিক্ষানীতি প্রণয়নের উদ্দেশ্য সফল হবে না।

শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন পিছিয়ে যাওয়ায় আশাহত হচ্ছেন কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত প্রতিটি মানুষ। শিক্ষানীতিতে ষষ্ঠ শ্রেণী থেকেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে কারিগরি শিক্ষা দেয়ার কথা বলা আছে। সে হিসেবে প্রত্যেক বিদ্যালয়ে কমপক্ষে একজন করে কারিগরির শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজন। সারাদেশে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিতদের কাজের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হবে এমন চিন্তা থেকে বিষয়টিতে সব সময় সক্রিয় থেকেছে ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইডিইবি) নেতৃবৃন্দ। এতদিন ২০২০ সালের মধ্যে শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ থাকলেও এখন বলা হচ্ছে ২০২১ সালে হবে নিয়োগ।

আইডিইবির সেক্রেটারি মোঃ শামসুর রহমান হতাশা প্রকাশ করে বলছিলেন, এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমরা আশা করেছিলাম ২০২০ সালে প্রত্যেক বিদ্যালয়ে একজন করে কারিগরি শিক্ষক নিয়োগ হবে। এখন বলা হয়েছে তা হবে ২০২১ সালে। আসলে পুরো বিষয়গুলো আমলাতন্ত্রিক জটিলতায় পড়েছে।

বলা হয়ে থাকে, ২০০৮ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাঁচ বছর যে কজন মন্ত্রী সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা পেয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ তাদের একজন। ওই মেয়াদে ব্যাপক জনবল নিয়োগ ও নিয়োগে স্বচ্ছতা আসার কারণে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন তৎকালীন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আফছারুল আমীন। এরপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের ক্ষমতার মেয়াদে প্রাথমিকের দায়িত্বে এসেছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার। শিক্ষার দায়িত্বে ছিলেন নুরুল ইসলাম নাহিদই। দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষায় দুজন তাদের সামনে চ্যালেঞ্জগুলোতেও তুলে ধরেছিলেন।

বলেছেন, সকল স্তরে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই শিক্ষায় তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে একই সঙ্গে আগের মেয়াদে সরকার যেসব কাজ শুরু করেও শেষ করতে পারেনি তা সমাপ্ত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছিলেন দুই মন্ত্রী। দুই মেয়াদে শিক্ষায় বাংলাদেশের অর্জন যে কোন সরকারের মেয়াদের চেয়ে বেশি। শিক্ষায় নারী- পুরুষের সমতা, প্রায় সকল শিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তি, প্রাথমিক থেকে সকল স্কুৃল শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যের পাঠ্যবই দেয়ার ঘটনাকে রোল মডেল হিসেবে প্রশংসিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মহলে। আছে আরও বহু অর্জন।

কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অসাধু কর্মকর্তাদের তৎপরতার বিপরীতে সরকারের কঠোর অবস্থানের অভাবে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে বড় কাজগুলো। কাজের যে বিশাল বোঝা ফাইলবন্দী হয়ে আছে তা কবে আলোর মুখ দেখবে তা জানেন না কেউ। আদৌ ঝুলে থাকা জনসম্পৃক্ত কাজগুলো বাস্তবায়ন হবে কিনা তার উত্তরও মিলছে না। এবার দুই মন্ত্রণালয়ের নতুন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। সৌজন্যে: জনকণ্ঠ

এই বিভাগের আরও খবরঃ