website page counter কোচিংপ্রীতি শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের পথে অন্তরায় - শিক্ষাবার্তা ডট কম

শনিবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৬ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

কোচিংপ্রীতি শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের পথে অন্তরায়

এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর প্রায় প্রতিটি শিক্ষার্থীরই স্বপ্ন থাকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের। এ জন্য পছন্দের প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য রীতিমতো যুদ্ধে নামতে হয় শিক্ষার্থীদের। আর ‘ভর্তিযুদ্ধে’ জয়ী হতে কোচিং সেন্টারের প্রতি আস্থা রাখতে চায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী।

তাই এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কোচিং সেন্টারে ভর্তি হন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা।

তাদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে শুধু নিজের মেধা থাকলেই হবে না, কিছু টেকনিক বা কৌশল জানাও জরুরি। আর কোচিং সেন্টারগুলো ভর্তিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় লেখাপড়ার পাশাপাশি কিছু শর্ট টেকনিক শেখায়।যা স্বল্প সময়ের পরীক্ষায় ভালো করতে সহায়তা করে।

তবে কোচিং সেন্টারের প্রতি শিক্ষার্থীদের এই আগ্রহকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, কোচিংপ্রীতি শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের পথে অন্তরায়। ভর্তিপরীক্ষাসহ সব ধরনের পরীক্ষায় ভালো করতে হলে একাডেমিক পড়ালেখার কোনো বিকল্প নেই।

ঢাকার কোচিংপাড়া বলে খ্যাত ফার্মগেট এলাকার বিভিন্ন কোচিং সেন্টার ঘুরে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা বই-শিট নিয়ে ছুটাছুটি করছে। কারো ক্লাস শেষ, আবার কারো ক্লাস শুরু। লাইব্রেরি, ফটোকপির দোকানগুলোতেও ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের ভিড় লেগে আছে।

অধিকাংশ শিক্ষার্থীই কোচিংয়ের দেয়া পড়া নিয়ে বেশ চিন্তিত। তারা জানায়, প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিনই শেষ করতে না পারলে পিছিয়ে পড়তে হবে। তাই সময় নষ্ট করার মতো সময় তাদের হাতে নেই। কোচিং সেন্টারগুলো যে দিকনির্দেশনা দেয় তা খুবই কার্যকরী বলে মনে করেন তারা। আইকন প্লাস কোচিং সেন্টারে কোচিং করছেন ইসরাত জাহান রিয়া।

তিনি বলেন, কোচিং আসলে দিকনির্দেশনা দেয়। বিশেষ করে স্বল্প সময়ের মধ্যে পরীক্ষায় ভালো করার জন্য যে শর্ট টেকনিক শেখায় তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর বাইরে মডেল টেস্টগুলোও খুব ভালো হয়। ভর্তিপরীক্ষার আদলে নেয়া মডেল টেস্টগুলোতে নিয়মিত অংশ নিলে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।

সৈকত শাহরিয়ার নামের এক ভর্তিচ্ছু বলেন, কোচিংয়ে আসলে অনেক শিক্ষার্থীর সাথে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ থাকে। ফলে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরাও প্রতিযোগিতার কারণে ভালো হয়ে যায়। এ জন্য কোচিংয়ের প্রতি আমাদের একটা দুর্বলতা রয়েছে।

আয়েশা জাহান নামের এক ভর্তিচ্ছু বলেন, এইচএসসি পরীক্ষার পর ভর্তিপরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য যে সময় পাওয়া যায় তা খুবই কম। নিজে নিজে বাসায় পড়লে প্রস্তুতি নেয়া যায়, তবে তা জোরালো হয় না। দিকনির্দেশনা ছাড়া প্রস্তুতি নেয়াও কষ্টসাধ্য।

তাই কোচিংয়ে এসেছি। রাতুল হাসান নামের অন্য এক শিক্ষার্থী বলেন, কোচিংয়ে সেরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি আলাদা ব্যাচ করা হয়। যাকে স্পেশাল ব্যাচ বলে। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চায় তাদের জন্য এই ব্যাচে জায়গা করে নেয়াটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেক লেখাপড়া করতে হয়। কোচিংয়ে না এলে এই সুযোগ পাওয়া সম্ভব না।

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং পরিচালনার সাথে জড়িতরাও বলছেন, স্বল্প সময়ে ভালো প্রস্তুতির জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা জরুরি। কোচিং সেন্টারগুলো মূলত সেই কাজগুলোই করে। এতে শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি হয়। ফলে ভর্তিযুদ্ধে জয়ী হওয়ার বিষয়ে মানসিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি পায়।

ইউসিসি কোচিং সেন্টারের পরিচালক মো. কামাল উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, আমরা আসলে সহায়ক হিসেবে কাজ করি। শিক্ষার্থীর মেধাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা আমরা দিয়ে থাকি। তাছাড়া স্বল্প সময়ের পরীক্ষায় কীভাবে ভালো করা যায় সে কৌশলও আমরা শিখিয়ে থাকি।

তিনি আরও বলেন, আমরা ৩৪ বছর ধরে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং পরিচালনা করে আসছি। আমাদের এখানে পড়ে ঢাবিসহ দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। আমরা মনে করি, শিক্ষার্থীদের সাফল্যে আমরা কিছুটা অবদান রাখতে পারছি।

আইকন প্লাস কোচিং সেন্টারের এক্সিকিউটিভ আনিস বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিতে আমাদের শিক্ষার্থীদের সাফল্য মোটামুটি ভালো। গত বছর প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী ঢাবিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রসিদ্ধ একটি কোচিং সেন্টারের পরিচালক বলেন, শুধু ব্যবসার কথা যদি কেউ বলেন তাহলে তা অন্যায় হবে। আমরা শিক্ষার্থীদের যথাযথভাবে গাইড করি। ফলে তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। পড়ালেখার পাশাপাশি ভর্তিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে এই আত্মবিশ্বাস বেশ জরুরি।

এদিকে শিক্ষার্থীদের কোচিং নির্ভরতাকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তারা বলছেন, এখন বাচ্চারা ছোটবেলা থেকেই কোচিংমুখী।

ফলে তাদের মনের মধ্যে একটা ধারণা জম্মেছে, কোচিং না করলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যাবে না। কিন্তু বিষয়টি তা নয়, একাডেমিক পড়ালেখা ঠিক মতো করলেই ভর্তিপরীক্ষার প্রস্তুতি হয়ে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, কোচিং সেন্টারগুলো লেখাপড়ার পাশাপাশি কিছু ভালো দিকনির্দেশনা দেয় এটা যেমন ঠিক, তেমনি এতে শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার গণ্ডি ছোট হয়ে যায়। অনেকেই শুধু কোচিংয়ের শিট নির্ভর হয়ে যায়। যা শিক্ষার্থীর মেধা বিকাশের পথে অন্তরায়।

আব্দুল্লাহ আল মামুন নামের একজন শিক্ষক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির ক্ষেত্রে প্রতিবছরই মাত্রাতিরিক্ত হারে শিক্ষার্থী কোচিংমুখী হচ্ছে। আমার মনে হয়, আস্তে আস্তে এই প্রবণতা থেকে শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনা জরুরি।

এই বিভাগের আরও খবরঃ