website page counter কাশ্মীরের ইতিবৃত্ত-১ - শিক্ষাবার্তা ডট কম

শনিবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৬ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

কাশ্মীরের ইতিবৃত্ত-১

মোঃ আঃ বাতেন ফারুকী।।

পরিচিতি :
স্থানাঙ্ক (শ্রীনগর):
৩৩°২৭′ উত্তর ৭৬°১৪′ পূর্ব / ৩৩.৪৫° উত্তর
দেশ : ভারত
স্থাপিত : ২৬ অক্টোবর, ১৯৪৭
রাজধানী : জম্মু (শীতকালীন)
: শ্রীনগর (গ্রীষ্মকালীন)
বৃহত্তম শহর : শ্রীনগর
জেলার সংখ্যা : ২২
‌‌‌সরকার : উপ রাজ্যপাল – সত্যপাল মালিক
মুখ্যমন্ত্রী – বর্তমানে শূন্য
বিধানসভা : দ্বিকক্ষীয় (৮৯ + ৩৬ আসন)
আয়তন : মোট ২২২২৩৬ বর্গ কিমি (৮৫৮০৬ বর্গমাইল)
এলাকার ক্রম : ৬ষ্ঠ
উচ্চতা : ৩২৭ মিটার (১০৭৩ ফুট)
জনসংখ্যা : (২০১১) মোট ১,২৫,৪৮,৯২৬
ক্রম : ১৮তম
সময় অঞ্চল : ভারতীয় সময় ( ইউটিসি+০৫:৩০ )
আইএসও ৩১৬৬ কোড : IN-JK
মানব উন্নয়ন সূচক : ০.৬০১ ( মধ্যম )
মানব উন্নয়ন সূচক : ক্রম ১৭তম (২০০৫)
সাক্ষরতা : ৬৬.৭% (২১তম)
সরকারি ভাষা : উর্দু

জম্মু ও কাশ্মীর হল ভারতের কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল যা এতদিন সতন্ত্র রাজ্য ছিলো। কিন্তু এই অঞ্চলটি প্রধানত হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত। ভারতের এই কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলটির দক্ষিণে ভারতের হিমাচল প্রদেশ ও পাঞ্জাব রাজ্য দুটি অবস্থিত। জম্মু ও কাশ্মীরের উত্তরে পাক-অধিকৃত গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চল ও পূর্বে ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাদাখ অবস্থিত। এই অঞ্চলের পশ্চিমে ও উত্তর-পশ্চিমে লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোলের ওপারে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর গিলগিত-বালতিস্তান অবস্থিত।

সম্প্রতি ৫ আগস্ট ২০১৯ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী চালিত ভারতের সরকার সংসদের উভয় কক্ষে ব্যাপক সমর্থন নিয়ে ভারতীয় সংবিধানের জম্মু ও কাশ্মীর এর বিশেষ মর্যাদা ধারা ৩৭০ ও ধারা ৩৫ক রদ করে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল তৈরী করে। জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ।

কাশ্মীর ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। কাশ্মীরের ইতিহাস বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশ ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গা-অঙ্গিভাবে জড়িত। ঐতিহাসিকভাবে কাশ্মীরকে ‘কাশ্মীর উপত্যকা’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। কাশ্মীর বলতে মূলত তিনটি দেশের একটি বৃহৎ অঞ্চলকে বোঝায়। সে হিসেবে কাশ্মীরকে আমরা তিনটি ভাগে উল্লেখ করতে পারি।
১) জম্মু,কাশ্মীর উপত্যকা ও লাদাখের সমন্বয়ে গঠিত অঞ্চল যা ভারত-নিয়ন্ত্রিত
জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য।
২) গিলগিত-বালতিস্তান সমন্বয়ে গঠিত অঞ্চল যা পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীর এবং
৩) আকসাই চিন ও ট্রান্স-কারাকোরাম ট্র্যাক্ট সমন্বয়ে গঠিত অঞ্চল যা চীন-নিয়ন্ত্রিত। এই তিনটি অঞ্চলই বৃহত্তর কাশ্মীরের অন্তর্ভুক্ত।
[ তথ্যসূত্র : প্রয়োজন ]

ইতিহাস : পঞ্চম শতাব্দীর পূর্ববর্তী সময়ে কাশ্মীর প্রথমে হিন্দুধর্ম এবং পরে
বৌদ্ধধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। পরবর্তীতে নবম শতাব্দীতে কাশ্মীরে শৈব মতবাদের উত্থান ঘটে। ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরে ইসলাম ধর্মের বিস্তার ঘটে এবং শৈব মতবাদের প্রভাব হ্রাস পায়। কিন্তু তাতে পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলোর অর্জনসমূহ হারিয়ে যায় নি, বরং নবাগত ইসলামি রাজনীতি ও সংস্কৃতি এগুলোকে বহুলাংশে অঙ্গীভূত করে নেয়, যার ফলে জন্ম হয় কাশ্মিরি সুফিবাদের।
১৩৩৯ সালে শাহ মীর কাশ্মীরের প্রথম মুসলিম শাসক হিসেবে অধিষ্ঠিত হন এবং শাহ মীর রাজবংশের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী পাঁচ শতাব্দীব্যাপী কাশ্মীরে মুসলিম শাসন বজায় ছিল। এর মধ্যে মুঘল সম্রাটরা ১৫৮৬ সাল থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত এবং আফগান দুররানী সম্রাটরা ১৭৪৭ সাল থেকে ১৮১৯ সাল পর্যন্ত কাশ্মীর শাসন করেন। ১৮১৯ সালে
রঞ্জিত সিংহের নেতৃত্বে শিখরা কাশ্মীর দখল করে। ১৮৪৬ সালে প্রথম ইঙ্গ—শিখ যুদ্ধে ইংরেজদের নিকট শিখরা পরাজিত হয়। এরপর অমৃতসর চুক্তি অনুসারে জম্মুর রাজা গুলাব সিংহ অঞ্চলটি ব্রিটিশদের কাছে থেকে ক্রয় করেন এবং কাশ্মীরের নতুন শাসক হন। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তাঁর বংশধরগণ ব্রিটিশ রাজমুকুটের অনুগত শাসক হিসেবে কাশ্মীর শাসন করেন।

রাজা গুলাব সিংহের শেষ বংশধর হরি সিংহ ১৯২৫ সালে কাশ্মীরের রাজা হন। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা লাভ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন কাশ্মীরের শাসক। ১৯৪৭ সালে ভারত-বিভাজনের অন্যতম শর্ত ছিল, ভারতের দেশীয় রাজ্যের রাজারা ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবেন, অথবা তাঁরা স্বাধীনতা বজায় রেখে শাসনকাজ চালাতে পারবেন। ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর পাকিস্তান-সমর্থিত পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলার বিদ্রোহী নাগরিক এবং পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পশতুন উপজাতিরা কাশ্মীর রাজ্য আক্রমণ করে। কাশ্মীরের রাজা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলেও গভর্নর-জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে সহায়তা চাইলেন। কাশ্মীরের রাজা ভারতভুক্তির পক্ষে স্বাক্ষর করবেন, এই শর্তে মাউন্টব্যাটেন কাশ্মীরকে সাহায্য করতে রাজি হন। ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর হরি সিং কাশ্মীরের ভারতভুক্তির চুক্তিতে সই করেন। ২৭ অক্টোবর ১৯৪৭ তা ভারতের গভর্নর-জেনারেল কর্তৃক অনুমোদিত হয়।

চুক্তি সই হওয়ার পর, ভারতীয় সেনা কাশ্মীরে প্রবেশ করে অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ভারত বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপন করে। জাতিসংঘ ভারত ও পাকিস্তানকে তাদের অধিকৃত এলাকা খালি করে দিয়ে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে গণভোটের প্রস্তাব দেয়। ভারত প্রথমে এই প্রস্তাবে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৫২ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের নির্বাচিত গণপরিষদ ভারতভুক্তির পক্ষে ভোট দিলে ভারত গণভোটের বিপক্ষে মত দেয়। ভারত ও পাকিস্তানে জাতিসংঘের সামরিক পর্যবেক্ষক গোষ্ঠী উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি তত্ত্বাবধানে আসে। এই গোষ্ঠীর কাজ ছিল, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখা ও তদন্তের রিপোর্ট প্রত্যেক পক্ষ ও জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে জমা দেওয়া। যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে কাশ্মীর থেকে উভয় পক্ষের সেনা প্রত্যাহার ও গণভোটের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু ভারত গণভোটে অসম্মত হয় এবং এজন্য পাকিস্তান সেনা প্রত্যাহারে অসম্মত হয়। ভারত গণভোট আয়োজনে অসম্মত হয় এজন্য যে, এটা নিশ্চিত ছিল যে গণভোটে মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরের বেশিরভাগ ভোটারই পাকিস্তানের পক্ষে ভোটদান করবেন ও এতে কাশ্মীরে ভারত ত্যাগের আন্দোলন আরো বেশী জোড়ালো হবে।
মুসলিম প্রধান কাশ্মীর ও অন্যান্য কারণকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হয়। এরপর ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ও ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধ হয়। (উইকিপিডিয়া)

কাশ্মীর দ্বন্দ্ব বিষয়ে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সনের ১৩ জুলাই ব্যক্তিগত ডায়েরিতে লিখেছিলেন,
‘‘ভারতের উচিত ছিল গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মেনে নিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটা স্থায়ী শান্তিচুক্তি করে নেওয়া।তখন পাকিস্তান ও ভারত সামরিক খাতে ব্যয় না করে দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ব্যয় করতে পারত।দুই দেশের জনগণও উপকৃত হত। ভারত যখন নিজদের গণতন্ত্রের পূজারী মনে করে তখন কাশ্মীরের জনগণের মতামত নিতে আপত্তি কেন করছে? এতে একদিন দুটিই দেশ এক ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হতে বাধ্য হবে।’’ (সূত্র: কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা: ১৫৯)

কী অকাট্য ভবিষ্যৎ বাণী! আজ থেকে ৫৩ বছর আগে তৎকালীন কাশ্মীর প্রেক্ষাপট নিয়ে করা মন্তব্য কী সুন্দরভাবে আমাদের সামনে দৃশ্যমান হয়েছে। তাঁর আঁচ করা ভয়াবহতার সম্মুখীন আজ উল্লেখিত দুটি দেশ তথা সমগ্র বিশ্ব।

অপর দিকে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা জওহরলাল নেহেরু আরও আগে বলেছিলেন,

‘‘কাশ্মীর ইন্ডিয়া কিংবা পকিস্তান কারোই সম্পত্তি নয়। কাশ্মীরী জনগণই এর মালিক। কাশ্মির যখন ইন্ডিয়ার সাথে যোগদান করে, তখন আমরা অঞ্চলটির নেতাদের কাছে পরিস্কার করে বলেছিলাম, আমরা তাদের জনগণের রায় শেষ পর্যন্ত মেনে চলবো। যদি তারা আমাদের বের হয়ে যেতে বলে, কাশ্মীর ত্যাগ করতে আমার কোনো দ্বিধা থাকবে না। আমার এই বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপন করেছি। সেখানে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। একটা মহান জাতি হিসেবে আমরা এই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যেতে পারি না। কাশ্মীরের জনগণের উপরই আমার চূড়ান্ত সমাধানের ভার ছেড়ে দিয়েছি। আমরা তাদের সিদ্ধান্ত মেনে চলতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ।‘’ (সূত্র: অমৃত বাজার পত্রিকা, কলকাতা, ২ জানুয়ারি ১৯৫২)।

কী অমোঘ বাণী! এঁরাই তো নেতা। সেল্যুট তোমাদের। তোমরা আজ ধরনীতে নেই কিন্তু তোমাদের রেখে যাওয়া বাণী এ বিশ্ববাসী স্মরণ করবে অনাদিকাল।

লেখক-

প্রধান শিক্ষক
সৈয়দ হাবিবুল হক উচ্চ বিদ্যালয়
বৌলাই, কিশোরগঞ্জ।

এই বিভাগের আরও খবরঃ