website page counter শিক্ষকরা কি আধুনিক যুগের ক্রীতদাস? - শিক্ষাবার্তা ডট কম

শনিবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৬ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

শিক্ষকরা কি আধুনিক যুগের ক্রীতদাস?

আবুল কালাম আজাদ।।

আদিম সমাজে মানুষ ছিলো যাযাবর, কোন স্থায়ী বাস ছিলো না, তাদের বসবাসের জায়গা ছিলো বন জঙ্গল বা নদী তীরের অঞ্চল, খাদ্যের জন্য মানুষ বন জঙ্গলে বসবাস করতো, তাদের বসবাস ছিলো গুষ্টিবদ্ধ ভাবে, পাথরের যুগ যখন শুরু হলো মানুষ পাথর দিয়ে হাতিয়ার তৈরি করতে শিখলো, তখন থেকে খাদ্যের তালিকায় বন্য প্রাণি শিকার করে খাওয়া শুরু করলো, কিন্তু একা খেতো না গোষ্ঠীর সবাই খেতো, এ জন্য একে বলে আদিম সাম্যবাদী সমাজ।

অন্য গোষ্ঠী কে দেখতে পেত না, তারা হিংসুটে ছিলো বনের খাদ্যের জন্য। এক গোষ্ঠী আরেক গোষ্ঠী কে মেরে ফেলতো। যত দিন পর্যন্ত খাদ্যের উৎপাদন বা পশু পালন না করতো ততোদিন, মৃত্যুই ছিলো পরাধীনদের জন্য অবধারিত। যখন মানুষ পশু পালন করতে লাগলো কৃষি কাজ করতে লাগলো তখন থেকে দাসপ্রথা চালু হলো। এক গোষ্ঠীর মানুষ অন্য গোষ্ঠীর সাথে মারামারিতে লিপ্ত হলে। যারা পরাজিত হতো, তার হতো দাস, তাদের কে আর মেরে ফেলা হতো না। দাস হিসেবে কাজে লাগাতো। দেখা যায় আদিম সমাজের চাইতে দাস সমাজ কিছুটা উন্নত ছিলো। কিন্তু দাস সমাজ ব্যবস্থায় দাসদের কষ্ট ব্যাপক ছিলো। তাদের মনিবই ছিলো সব। মনিবের বাহিরে কোন কিছু করতে পারতো না। জীবনের কোন স্বাদ ইচ্ছা তাদের ছিলো না।

এরমধ্যেই দাসরা ধীরে ধীরে নিজের অধিকার সম্পর্কে জানতে শুরু করলো, বিদ্রোহ শুরু করলো, আন্দোলন হলো, লড়াই হলো নবম শতকে এসে রোম সাম্রাজ্যের পতনের মধ্য দিয়ে দাস সমাজের বিদায় ঘটলো। আদিম সমাজ এবং দাস সমাজেই সকল ধর্মের আর্বিভাব হয়, এবং ধর্ম ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গোড়াপত্তন হয়, আমাদের দেশ তথা ভারত বর্ষে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচলন ব্যাপক প্রসার ঘটে, বৌদ্ধ বিহার কেন্দ্রিক ধর্মীয় শিক্ষা গড়ে ওঠে। পাল বংশের শ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন ধর্মপাল, তিনি এসময় ভারত বর্ষে বিভিন্ন স্থানে বৌদ্ধ বিহার গড়ে তোলেন, এই বিহারগুলোতেই শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে তোলেন এবং ধর্মীয় শিক্ষায় মূলত স্থান পায়, শিক্ষকদের বেতন ছিলো দান দক্ষিণার মতো। ১১ শতকের দিকে সেনবংশের শাসন শুরু হয়, এ সময় হিন্দুদের প্রভাব বেড়ে যায়। সেনরা ছিলেন ব্রহ্ম ক্ষত্রিয়। সেন রাজাদের সময় সবাই শিক্ষা গ্রহণ করতে পারতো না। বর্ণপ্রথার কঠোরতার ওপর ভিত্তি করে চলতো। এসময় নিম্ন বর্ণ হিন্দুদের শিক্ষার কোন স্থান ছিলো না।

বাংলায় মুসলমান শাসন শুরু হলে শিক্ষার প্রসার ঘটে, মক্তব। মাদ্রাসা ভিত্তিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, এ সময়েও শিক্ষকদের বেতন মুষ্ঠির চাল, দান দক্ষিণার উপর নির্ভরশীল ছিলো।

ব্রিটিশদের সময় দেশীয় শিক্ষা কাঠামোর উপর ১৮৮৩ সালে শিক্ষা কমিশনার রিপোর্ট প্রকাশের পর সর্ব প্রথম একটি চিত্র দেখা যায়। হিন্দুদের শিক্ষার জন্য টোল ছিলো, ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য কারো প্রবেশ নিষেধ ছিলো। প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাঠশালায় বর্ণ নির্বিশেয়ে সকলে পড়তে পারতো। মক্তব এবং পাঠশালায় সকলে পড়তে পারলেও পন্ডিত মশাইদের বেতন যত সামান্য রাষ্ট্র বহন করতো। ১৮৫৪ সালে উডের শিক্ষা ডেসপ্যাচ বাংলার আধুনিক গণশিক্ষার আইনি ভিত্তি রচনা করে। ১৯৩০ সালে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা প্রচলনের পদক্ষেপ গৃহিত হয়। শিক্ষাকে আমলা নিয়ন্ত্রিত করা হয়।

সার্জেন্ট কমিটি রিপোর্ট ১৯৪৪ যা পুরোপুরি সরকারি ব্যাবস্থার সুপারিশ করে ছিলো । কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর পাকিস্তান তা গ্রহণ করে না। ভারত গ্রহণ করে শিক্ষায় এগিয়ে যায়, পক্ষান্তরে পাকিস্তান পূর্ব বাংলার শিক্ষা ব্যাবস্থাকে অবহেলার চোখে দেখে। মোনায়েম খার সময়ে শিক্ষকরা আন্দোলন করে ১০ টাকা বেতন বৃদ্ধি করে দেয়। বাংলার শিক্ষার টুটি চেপে ধরে পাকিস্তান। ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন করে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু এক সাথে প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করেন, ১৯৭৪ সালে শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট পেশ করেন নতুন আলোর দেখা পায় জাতি।

বিধিবাম ৭৫ বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর সাথে সকল আলো নিভে যায়। শিক্ষকরা অধিকার আদায়ে ১৯৮১ সালে আন্দোলন শুরু করেন। সে আন্দোলন শিক্ষকদের বিভক্তির জন্য সফলতা পায় কম। ১৯৯০ সালে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন পাশ করা হয়। কিন্তু শিক্ষকদের ভাগ্যের উন্নতি হয় না। সেই তিমিরেই থেকে যায় শিক্ষকদের জীবন জীবীকা, আজো সেই তিমিরেই আছে। সরকার যায় সরকার আসে আমার পন্ডিত মশাই অবহেলায় থেকে যায়। দেখার যেন কেউ নাই, শোনার যেন কেউ নাই। আছে শুধু অবজ্ঞা,আর আবহেলায়, সেই ক্রীতদাসের মতো।

এই বিভাগের আরও খবরঃ