website page counter বন্ধুর স্মরণে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ফজলুল হক হল - শিক্ষাবার্তা ডট কম

শনিবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৬ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বন্ধুর স্মরণে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ফজলুল হক হল

মো: তানিউল করিম জীম।।

“তোমার সখার আসবে যেদিন এমনি কারা-বন্ধ, আমার মতন কেঁদে কেঁদে হয়ত হবে অন্ধ-সখার কারা-বন্ধ! বন্ধু তোমার হানবে হেলা ভাঙবে তোমার সুখের মেলা; দীর্ঘ বেলা কাটবেনা আর , বইতে প্রাণের শান- এ ভার মরণ- সনে বুঝে- বুঝবে!” কাজী নজরুল ইসলাম।
“আমরা বন্ধুর কাছ থেকে মমতা চাই, সমবেদনা চাই ,সাহায্য চাই ও সে জন্যই বন্ধুকে চাই।’’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

আমরা বন্ধুকে মমতা, সমবেদনা ও সাহায্য করতে পারলেও কাছে ধরে রাখতে পারিনি। মেহেদী হাসান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ব বিদ্যালয়ের পশুপালন অনুষদের ছাত্র ছিল। ফজলুল হক হলে অনেকটা সময় এক সাথে কেটেছে আমাদের। কিন্তু হঠাৎ ট্রেন দূর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে রাজশাহীর ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০ দিন আইসি ইউ তে থাকার পর সবাইকে ছেড়ে চিরদিনের জন্য না ফেরার দেশে চলে যেতে হয়। আর্থিক ও মানসিকভাবে তার পরিবারকে সাহায্য করতে পারলেও শেষ পর্যন্ত তাকে আমাদের মাঝে রাখতে পারি নাই। সে চলে গেলেও তার ফেলে যাওয়া স্মৃতি আজও আমরা ভুলতে পারিনি, ভুলতেও চাইনা। মেহেদী ছিল ক্রিকেটপ্রেমী ও একজন ভালো ক্রিকেট খেলোয়ার। বড় ভাইদের সাথে হলের হয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগীতায় অংশ নিয়ে হলের নাম উজ¦লেও ভূমিকা রাখে সে। খেলাধুলায় ভালো হওয়ার কারণে সবার সাথে তার পরিচিতিটাও খুব তাড়াতাড়ি হয়। মেহেদীকে সবার মাঝে বাঁচিয়ে রাখার জন্যেই প্রতি বছর মেহেদী স্মৃতি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট এর আয়োজন করা হয়।

ফজলুল হক হলের ২ বর্ষের সবাই মিলে খেলার আয়োজন করে এবং অংশ নেয়। নিলামের মাধ্যমে খেলোয়ার কিনে নিজেদের মধ্যে দল গঠন করে দলের মালিকরা। এবার দল কিনে শুভ্র, হেলাল, তানজিল ও তৌকির। এবারে ৪ টি দল খেলায় অংশ নেয়। মাইটি স্ট্রাইকার দলের মালিক হেলাল, রিয়েল টাইগারের তানজিল , ফ্রেন্ডস উইনাইটেডের শুভ্র, রাইজিং স্টারের তৌকির।

রাতে হলের অতিথি কক্ষে অতি উচ্ছাস ও আন্তরিকতার সাথে খেলোয়ারদের নিলামের আয়োজন করা হয়। নিলামের হোস্ট হিসেবে ছিল সুকন্ঠা কুশল।

এবারে খেলোয়ারদের সাথে পরিচয় না করালেই নয়। মাইটি স্ট্রাইকারের খেলোয়াররা হলেন “ হেলাল, সোহান, সানি, প্রান্ত, গোলাম, ওহাদা, রবিউল, রিফাত, মামুন, ইমরান ”; “রিয়েল টাইগারের তানজিল, সোহেল, অনি, রিয়াদ, রানা, আরাফাত, কাজল, তুষার, অঙ্গন, নাবিল”; “ফ্রেন্ডস ইউনাইটেডের শুভ্র, মাহিন, লিজান, সাগর, সোহাগ, শাহাদ, সাদিক, কাব্য, রোকন, বোরহান”; “রাইজিং স্টারের তৌকির, সাব্বির, ফারহান, শিপন, রোমান্স, হাবিবুর, মুন্না, আলি। ”

অনেকদিন পর সবার এক কাতারে বন্দী হওয়া নিয়ে সবার মনের মধ্যেই এক প্রকার চাঞ্চলতা ও আবেগ কাজ করছিল। সকাল ১০ টার দিকে টান-টান উত্তেজনা নিয়ে প্রথম খেলা হয় ফ্রেন্ডস ইউনাইটেড ও রাইজিং স্টারের মধ্যে। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে টসে হেরে ফিল্ডিং পায় ফ্রেন্ডস ইউনাইটেড। অসাধারণ এক ইনিংসে ৮ ওভারের খেলায় ৬ উইকেটে ৬৫ রান করে রাইজিং স্টার। বিপরীতে, ফ্রেন্ডেস ইউনাইটেড প্রথমদিকে ভালোভাবে শুরু করলেও, শেষটায় কাঙ্খিত সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। কারণ তুখর ব্যাটসম্যান মাহিনকে নাটকীয় ক্যাচ আউটের মাধ্যমে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয় মুন্না। এতে সহজেই ১৭ রানে জয় পায় রাইজিং স্টার। পরের ম্যাচ হয় ফ্রেন্ডেস ইউনাইটেডের ও রিয়েল টাইগারের মধ্যে। অসাধারণ ফিল্ডিং ও দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে এবার জয় ছিনিয়ে নেয় ফ্রেন্ডেস ইউনাইটেড। রিয়েল টাইগার ও রাইজিং স্টারের মধ্যেকার খেলায় ৫০ রানের বিপরীতে রাইজিং স্টার ব্যাট করে ৫১ রান করে ৬ উইকেটে জয় লাভ করে। এর পরের খেলা হয় রাইজিং স্টার ও মাইটি স্টাইকারের মধ্যে। মাইটি স্টাইকারের প্রথম ম্যাচে তারা জয় পায় হেলালের দুর্ধর্ষ ব্যাটিংয়ে। পরের ম্যাচটি হয় মাইটি স্ট্রাইকার ও রিয়াল টাইগারের মধ্যে যেখানে সোহেলের ব্যাটিং ঝড়ের কাছে হেরে যায় মাইটি স্ট্রাইকার। দুই ম্যাচ জিতে আগেই ফাইনাল নিশ্চিত করে তৌকিরের রাইজিং স্টার। অন্যদিকে ২ ম্যাচ হেরে ও রান রেট কম হওয়ার কারণে আগেই বাদ পরে যায় তানজিলের রিয়েল টাইগার দলটি। এদিকে ফ্রেন্ডস ইউনাইটেড ও মাইটি স্ট্রাইকারের মধ্যে যে দল জিতবে সেই দল ফাইনাল খেলবে রাইজিং স্টারের সাথে। তাই বেশ বড়সড় প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নামে দুই দল। কিন্তু শুভ্র, মাহিন আর রিয়াদের ব্যাটিংয়ে পাহাড় সমান রানের টার্গেট পায় মাইটি স্ট্রাইকার। একের পর এক বোলিং ঝড়ে চাপে পড়ে হেলালের দল এবং শেষ পর্যন্ত শ^াসরুদ্ধকর জয় পেয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করে ফ্রেন্ডস ইউনাইটেড।

ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয় শনিবার বিকাল ৫ টায়। ফাইনাল খেলায় রেফারির দায়িত্বে থাকে হেলাল। টস জিতে ব্যাটিং নেয় ফ্রেন্ডস ইউনাইটেড। ওপেনিং জুটি হিসেবে নামে সাদিক আর মাহিন। মাঠে নেমেই মাহিন তার কেরামতি শুরু করে একের পর এক চার হাকিয়ে। মনে হচ্ছিল বোলার যেন বশ করে নিয়েছে। কারণ বল দেখে দেখে সজরে পাঠাচ্ছিল বাউন্ডারির বাইরে। এদিকে সাদিক ও বাইন্ডারি পার করতে চাইলে কিছুটা ব্যর্থ হয় এবং ৬ রানের ইনিংস খেলে মাঠ থেকে বিদায় নেয়। ব্যাটিং এ নামে বোরহান (কুড়িগ্রাম এক্্রপ্রেস)। বোরহান মাঠে নেমে বেশ দূরদর্শিতার সাথে ব্যাটিং শুরু করে। কিন্তু আলির বোলিং জাদুর কাছে হার মানতে হয় বোরহানকে এবং মাঠের বাইওে চলে যেতে হয়। মাঠে নামে সাগর (রংপুর এক্্রপ্রেস)। এর পর মাহিনের ব্যাটে বল লেগে ছয়! ইা ক্যাচআউট। রানের কারিগরের ক্যাচটি ধরে আব্দুল আজিজ। সুতরাং গ্যালারিতে শুধু আজিজ আজিজ ধ্বনিত হতে লাগলো। মাহিন ৪২ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলে মাঠ ত্যাগ করে। কিন্তু এদিকে শুভ্র (দলেরমালিক) চোখে মুখে হতাশার ছায়া নিয়ে মাঠে নামলো। শেষ পর্যন্ত শুভ্র ও সাগর ৮ ওভার শেষে ৬৫ রানের টার্গেট দেয় প্রতিপক্ষ দল রাইজিং স্টারকে।

ব্যাটিংয়ের জন্য মাঠে নামে রাইজিং স্টারের দুই ওপেনার তৌকির (দলেরমালিক) ও ফারহান। ওপেনিং জুটি ভালো ছিল কিন্তু তাতে ভাঙ্গন লাগায় রিয়াদ। তৌকিরকে রান নেওয়ার সময় দূর থেকে সজোওে বল ছুড়ে আউট করে রিয়াদ। ব্যাটিংয়ে আসে রোমান্স। সেও টিকেনি মাহিনের বোলিং প্যাচের কাছে। এর পর মাঠে নামে ভুরিওয়ালা শিপন। কিছু রান করে বিদায় নেয় সেও। শেষ পর্যন্ত দলের হাল ধরে হাবিবুর ও আলি। হাবিবুর ও আলি ১২ রানের জুটি শেষে ৮ ওভারে দলের সংগ্রহ ৪২ রান। অতিসহজে ২৩ রানের ব্যবধানে ম্যাচ জিতে চ্যাম্পিয়ন হয় ফ্রেন্ডস ইউনাইটেড। চ্যাম্পিয়নদলের খেলোয়াদেও পা যেন আর মাঠিতে পরে না, সবাই একজন আরেক জনের সাথে মাশরাফি ও তাসকিনের সেই ফ্লাইং উদযাপনের মতো উড়তে লাগলো।

শেষ পর্যায়ে কুশলের সঞ্চালনায় পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে অতিথিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন হল শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ন- সাধারণ সম্পাদক সজীব সাহা ও সাংগাঠনিক সম্পাদক রোহান ইসলাম। তারা বলেন, এরপর থেকে বড় পরিসরে এই ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হবে। মেহেদী আমাদের মধ্যে ছিল , থাকবে। বক্তব্য শেষে রানার-আপ ও চ্যাম্পিয়নদের হাতে ট্রফি তুলে দেন সম্মানিত অতিথিরা। আবেগ এবার ক্যামেরায়, চ্যাম্পিয়ন ট্রফি নিয়ে বিভিন্ন পোজে ফটোসেশন শুরু করে বিজয়ী দলের খেলোয়াররা।

সাহায্য, সহযোগীতা, সহমর্মিতা মনো ভাব নিয়েই হলে একসাথে থাকে সবাই। বন্ধুত্বের সম্পর্ক বড়ই আজব। আজকে মেহেদী আমাদের মাঝে নেই কিন্তু আমরা তাকে আমাদের মাঝে রাখতে চেষ্টা করছি। এই খেলায় যে শুধু মেহেদীকে স্মরণ করা হয় তা নয়, আমাদের নিজেদের মধ্যেও বন্ধন শক্ত হয়। বিভিন্ন ব্যস্ততায় দেখা যায় সবার সাথে সব সময় আড্ডা দেওয়া হয়ে উঠে না। আর আড্ডা ছাড়া তো বন্ধুত্ব জমে না। টুর্নামেন্টে যে শুধু খেলা চলে তানা , হাসি- ঠাট্টা , আড্ডাও চলে, সাথে চলে বন্ধুত্বের নবায়ন।

এই বিভাগের আরও খবরঃ