website page counter বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে আর্থিক সমস্যা ? - শিক্ষাবার্তা ডট কম

শনিবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৬ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে আর্থিক সমস্যা ?

মোঃ আঃ বাতেন ফারুকী।।

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ নিয়ে অনেক লেখালেখি ও আলোচনা – পর্যালোচনা চলছে। এমনকি আন্দোলন – সংগ্রামও কম হয়নি। এরপরও সরকার কোনো রকম সাড়া দিচ্ছেন না। সাড়া তো দূরের কথা কিঞ্চিৎ পরিমাণ আশ্বাসও মেলেনি। উপরন্তু সরকারের তরফ থেকে পরিস্কার জানিয়ে দেয়া হয়েছে নিকট ভবিষ্যতে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের পরিকল্পনা সরকারের নেই। অথচ বেসরকারি শিক্ষক সমাজ না বুঝে এলোমেলোভাবে, বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন করে যাচ্ছে। আসলে আন্দোলন থাকলেই আন্দোলন ডাককারীদের লাভ। তাদের পরিচিতি বাড়বে, দাপট বাড়বে আরও কত কী? হায়রে শিক্ষক সমাজ! তাদের কি প্রয়োজন তারা তা-ই জানে না। নয়নচারা গ্রামের আমুর মতো।

আন্দোলনের নেতৃত্বে যারা আছেন তাদের প্রায় সবাই অবসরে চলে গিয়েছেন। আন্দোলনের প্রতি তাদের কতটুকু আন্তরিকতা আছে সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ বটে। নইলে সবার দাবি এক ও অভিন্ন তবে কেন এত ভিন্নতা, এত দ্বিধা বিভক্তি!আসলে তাদের মধ্যে একটা চাঁপা প্রতিযোগিতা কাজ করে। আর সেটা হলো,কে কী করতে পেরেছে তা জাহির করা। অন্যদিকে শিক্ষক সমিতি বা শিক্ষক ফোরামগুলো কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করায় নিজেদের দল ক্ষমতায় থাকলে সংগত কারণেই সংশ্লিষ্ট সমিতি বা ফোরাম কঠিন আন্দোলনে যায় না। ফলশ্রুতিতে শিক্ষক আন্দোলন কখনো যুগপৎ হতে পারেনি।

তবে ইদানিং শিক্ষা বিষয়ক কয়েকটি অনলাইন পত্রিকা বিশেষ করে দৈনিক শিক্ষা, শিক্ষাবার্তার মতো অনলাইন পত্রিকাগুলোর বদৌলতে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের বিষয়টি সরকারের শীর্ষ মহল পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। দৈনিক শিক্ষা, শিক্ষাবার্তাসহ সবকয়টি পত্রিকায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ডঃ সৈয়দ মোঃ গোলাম ফারুকের একটি মন্তব্য সংবলিত সংবাদ জোরালোভাবে প্রচারিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণে অর্থ কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা হলো ব্যবস্থাপনায়। কী সাংঘাতিক কথা! আর এই বোধ যদি হয় খোদ সরকারের তথা পুরো শিক্ষা বিভাগের তবে তো রীতিমত আতংকের বিষয়। একবিংশ শতাব্দীর প্রায় এক পঞ্চমাংশ পেরিয়ে এখনও যদি অর্থ থাকা সত্ত্বেও ব্যবস্থ্পনা সমস্যার দোহাই দিয়ে শিক্ষার মতো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অবহেলার চোখে দেখা হয় তবে একে কী বলবো ভেবেই পাচ্ছি না। এ তো রীতিমতো অন্যায়। তা-ও এই ডিজিটাল যুগে! কী সর্বনাশা কান্ড!

আরেক দিকে শিক্ষা পরিবারের আরেক শীর্ষজন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইন একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের উৎসব-ভাতা সরকারের দেবার কথা নয়। এটা সরকার থেকে অনেকটা জোর-জবরদস্তি করে নিয়ে আমরা শিক্ষকদের দিই।’ অবশ্য প্রথমে নেগেটিভ সুরে বললেও পরে পজিটিভ সুরে বলেছেন, বেসরকারি শিক্ষকদের দিলে পুরো বোনাসই দেওয়া উচিত। কারণ এখন সরকারের সক্ষমতা বেড়েছে। তাই আলাপ আলোচনা করে পুরো বোনাসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

মোটকথা শিক্ষা বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের দু’জন ব্যক্তিত্বের বক্তব্যকে আমলে নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করলে সহজেই মহাপরিচালক অধ্যাপক ডঃ সৈয়দ মোঃ গোলাম ফারুকের বক্তব্যের প্রথমাংশের সাথে একমত পোষণ করে বলা যায় যে,শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণে অর্থ কোনো সমস্যা নয়। বিষয়টি পরিস্কার করার জন্য মোটামুটি একটি সম্ভাব্য হিসাব দাঁড় করানো যেতে পারে।

বাংলাদেশে প্রায় ত্রিশ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় পাঁচ লক্ষ শিক্ষক – কর্মচারি কর্মরত রয়েছেন। তাদের বেতন – ভাতা বাবদ সরকারের বছরে প্রায় তেরো হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। সরকার যদি এ মূহুর্তে জাতীয়করণের ঘোষণা দেয় তবে সরকারের খরচের হিসাব দাঁড়াতে পারে নিম্নরূপ :

গড়ে ৪০% বাড়ি ভাড়া বাবদ : বর্তমান বার্ষিক মোট ব্যয় থেকে চিকিৎসা ও বিদ্যমান বাড়ি ভাড়া বাদ দিয়ে তার উপর ৪০%। সে হিসেবে প্রতি মাসে চিকিৎসা ও বিদ্যমান বাড়ি ভাড়া হয় ৫,০০০০০*১৫০০=৭৫০০০০০০০ টাকা। সুতরাং প্রতি বছরে হবে ৭৫০০০০০০০*১২=৯০০,০০০০০০০ টাকা। অতএব,৪০% বাড়ি ভাড়া বাবদ মোট খরচ হবে (১৩০০০,০০০০০০০ – ৯০০,০০০০০০০)*৪০%=৪৮৪০,০০০০০০০ টাকা।

শিক্ষা ভাতা ও অন্যান্য : এ খাতে প্রতি বছরে খরচ হতে পারে ৫,০০০০০*১০০০=৫০,০০০০০০০ টাকা। সুতরাং, সরকার এই মূহুর্তে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ঘোষণা দিলে সরকারের অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে ৪৮৪০+৫০=৪৮৯০ কোটি টাকা। অতএব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের নিমিত্ত বিদ্যমান ব্যয়সহ সরকারের সর্বমোট খরচ লাগবে ১৩০০০+৪৮৯০=১৭৮৯০ কোটি টাকা।

অপরদিকে সম্ভাব্য আয় : বাংলাদেশে মোট এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ত্রিশ হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী রয়েছে নিম্নরূপ :
স্কুল-কলেজ : ৭৪,০০০০০ জন।
মাদ্রাসা : ১৮,৭৮৩০০ জন।
কারিগরি : ৩,৩৫৪৫৪ জন। (সূত্র: Education in Bangladesh.)

অর্থাৎ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শাখা মিলে মোট শিক্ষার্থী আছে ৯৬১৩৭৫৪ জন। বর্তমানে সিটি কর্পোরেশন,পৌরসভা ও গ্রামের স্কুলগুলোতে সেসন ফি যথাক্রমে ৫০০০ টাকা, ২০০০ টাকা ও ৫০০ টাকা হারে শিক্ষার্থীপ্রতি নির্ধারণ করা আছে। জাতীয়করণের পর যদি গড়ে এ হার জনপ্রতি ১০০০ টাকাও হয় সেক্ষেত্রে সেসন ফি বাবদ আয় হবে ৯৬১ কোটি টাকা।

টিউশন ফি : বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে সর্বনিম্ন ৮০ টাকা থেকে ৫০০/১০০০ টাকা পর্যন্ত মাসিক টিউশন ফি চালু আছে। অবশ্য কিছু মাদ্রাসার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম আছে। আবার সরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় নামমাত্র টিউশন ফি চালু আছে যা অনুল্লেখযোগ্য। যেহেতু টিউশন ফি নিতে হবে সেহেতু পরিমাণে বাড়িয়ে নেওয়াই যুক্তিসঙ্গত। কারণ মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বেড়েছে। যদি গড়ে মাসিক ৫০ টাকা হারে টিউশন ফি ধরা হয় তবে এ খাতে আয় হবে ৯৬১৩৭৫৪*৫০*১২=৫৭৬৮২৫২৪০০ টাকা। সম্পত্তির আয় : প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও সম্পত্তি থেকে আয় হতে পারে আনুমানিক ১০০ কোটি টাকা।
স্থায়ী আমানত : প্রতিটি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী আমানত হিসেবে বিভিন্ন ব্যাংকে জমা আছে ন্যূনতম ৫০০০০ টাকা। এ খাতে আয় হতে পারে আনুমানিক ৮০০০০*৩০০০০=২৪০০০০০০০০ টাকা।

অন্যান্য খাত : অন্যান্য খাতে আসতে পারে ২০০ কোটি টাকা। এভাবে মোট আয় হতে পারে ৯৬১+৫৭৬+১০০+২৪০+২০০=২০৭৭ কোটি টাকা।

অতএব, দেখা যায় যে,বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে সরকারের নিট খরচ হতে পারে বড়জোর ১৭৮৯০ – (১৩০০০+২০৭৭)=২৮১৩ কোটি টাকা। যদিও জাতীয়করণের পরে পেনশন খাতে খরচ বৃদ্ধি পাবে। তবে সেটা অবশ্য ধাপে ধাপে। যা হোক উল্লেখিত টাকা সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মোহিত এর বক্তব্য এবং উপর্যুক্ত উদ্বৃতিসমূহের প্রেক্ষিতে খুব একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণের অংক নয়। পরিশেষে বলা যায়, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে প্রকৃতপক্ষেই অর্থ কোনো সমস্যা নয়। ব্যবস্থপনা বিষয়ে পরবর্তীতে লেখার প্রয়াস রাখছি।

লেখক-প্রধান শিক্ষক

সৈয়দ হাবিবুল হক উচ্চ বিদ্যালয়
বৌলাই, কিশোরগঞ্জ।

এই বিভাগের আরও খবরঃ