website page counter আসুন মনের পশুত্বকে কোরবানি করি - শিক্ষাবার্তা ডট কম

সোমবার, ৯ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং, ২৪শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

আসুন মনের পশুত্বকে কোরবানি করি

এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোরবানির দিন পশুর রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে অন্য কোনো আমল আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় নেই। এই কোরবানির জন্তু কেয়ামত দিবসে পশম, শিং ও খুরসহ উপস্থিত হবে। আর পশুর রক্ত মাটি স্পর্শ করার আগেই আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যায়। সুতরাং তোমরা খুশি মনে কোরবানি কর।’ (বায়হাকি : ১৯৪৮৮)

কোরবানি নিছক কোনো প্রথা নয়। বরং নামাজের মতো এটিও নৈকট্যপূর্ণ ইবাদত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের জন্য নামাজ কায়েম কর এবং কোরবানি কর।’ (সুরা কাওসার : ২) বস্তুত আল্লাহর সঙ্গে বান্দার দুই ধরনের সম্পর্ক রয়েছে।

এক. বিনয় ও নম্রতার, যা প্রকাশ পায় নামাজের মধ্যে।
দুই. প্রেম ও ভালোবাসার, যার প্রকাশ ঘটে হজ ও কোরবানির মধ্যে। জন্তু কোরবানি আল্লাহ পাকের ভালোবাসারই নজরানা। জন্তু একটি সুরত বা প্রতিকৃতি। তার মূলে রয়েছে নিজেকে আল্লাহর জন্য উৎসর্গিত করার ইচ্ছা ও প্রেরণা। আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি পশুর রঙ-রূপে, আকার-আকৃতিতে এবং গোশতের কিমা-কাবাবে! এই কি কোরবানির শিক্ষা!

কোরবানি তো কেবল আনন্দের উপলক্ষ নয়, চেতনার উপলব্ধিও বটে। কোরবানি শুধু উৎসব নয়, আল্লাহর নৈকট্যপূর্ণ ইবাদতও। তাই পশু কোরবানির সঙ্গে মনের পশুত্বকে কোরবানি করতে হবে। বরং মনের কোরবানিটাই বড়। টাকা-পয়সার মায়া কোরবানির ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে মনের এই চিন্তাকে কোরবানি দিতে হবে।

কোরবানির উদ্দেশ্য অবশ্যই সৎ হতে হবে এবং তাতে ত্যাগের বহিঃপ্রকাশ থাকতে হবে। কোরবানি প্রদর্শন ইচ্ছা ও অহংকারমুক্ত হতে হবে। অনেকেই বাহ্বা পাওয়ার জন্য ও আলোচিত ব্যক্তিত্ব হওয়ার লক্ষ্যে লক্ষাধিক টাকার গরু বা উট কিনে গলায় মালা পরিয়ে, মাথায় লাল ফিতা বেঁধে পথে পথে ঘোরান।

এটা যেমন ঠিক নয়, তেমনি কোনো সচ্ছল ব্যক্তির জন্য জীর্ণশীর্ণ কম দামি পশু কোরবানিও অনুচিত। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর বাণীর দিকেই ফিরে যেতে হবে। আল্লাহ বলেন- ‘ঐসব পশুর রক্ত, গোশত আল্লাহর কাছে কিছুই পৌঁছে না, বরং তোমাদের পক্ষ থেকে তোমাদের তাকওয়া তাঁর কাছে পৌঁছে।’ (সূরা হজ-৩৭)।

এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট, উদ্দেশ্যের সততা ও খোদাভীতি কোরবানি কবুলের শর্ত। পশুটি কত বড় ও কত দামের সেটা আল্লাহর কাছে কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। ভোগ নয়, ত্যাগেই আনন্দ- এটিও কোরবানির একটি শিক্ষা। কোরবারি গোশত গরিবদের জন্য বিতরণ করে তাদের মুখে হাসি ফোটানোও কোরবানির অন্যতম লক্ষ্য।

রাসূল (সা.) কোরবানির তিন ভাগের এক ভাগ গোশত গরিবদের জন্য বিতরণ করাকে মুস্তাহাব করেছেন। ইচ্ছা হলে এর বেশি; এমনকি সবটাও দান করা বৈধ। কোরবানির গোশত খাওয়া ও সংরক্ষণ বৈধ, তবে তা করতে গিয়ে কোরবানির অন্যতম উদ্দেশ্য ‘অন্যের জন্য ত্যাগ’ যেন লঙ্ঘিত না হয়, সেদিকে আমাদের সবাইকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

শুধু পশু নয়, পশুত্ব কোরবানি করাও কোরবানির অন্যতম উদ্দেশ্য। পশুর রক্ত প্রবাহিত করার সঙ্গে আমাদের ভেতরের পশুত্বকেও কোরবানি করতে হবে।

কোরবানি সবার জন্য ওয়াজিব নয় কিন্তু জিলহজ মাসের ও কোরবানির কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল রয়েছে যা আদায় করতে সবার চেষ্টা করা উচিত। এর অন্যতম হল আরাফা দিবসে রোজা রাখা মুস্তাহাব। হজরত আবু কাতাদাহ আনসারি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আরাফার (হজের দিনে) রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আরাফার দিনের (হজের দিনের) রোজা বিগত এক বছর এবং আগামী এক বছরের গোনাহের কাফ্ফারা হবে। (তিরমিযি)।

কোরবানি সংক্রান্ত একটা বিশেষ মাসআলা হল- ৯ জিলহজ ফজর থেকে শুরু করে ১৩ জিলহজের আসর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক বলা ওয়াজিব। জামাতে নামাজ হোক বা একাকী, সর্বাবস্থায় এটা বলতে হবে। পুরুষ হোক বা নারী সবাইকে বলতে হবে। তাকবিরে তারশিক হল- (আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ)।

ঈদুল আজহার দিনে যেসব সুন্নাত রয়েছে, সেগুলোও আমরা খেয়াল করে আমল করি। ঈদুল আজহার দিনে বিশেষ ১৩টি সুন্নাত রয়েছে যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করেছেন। যেমন- ভোরে খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠা, মেসওয়াক করা, গোসল করা, যথাসাধ্য উত্তম পোশাক পরা, শরিয়ত সম্মতভাবে সাজসজ্জা করা, খোশবু লাগানো, ঈদগাহে যাওয়ার আগে কোনো কিছু না খাওয়া, আগে আগে ঈদগাহে যাওয়া, ঈদুল আজহার নামাজ সকাল সকাল পড়া, পারলে ঈদগাহে গিয়ে নামাজ পড়া উত্তম, হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া, যাওয়ার সময় এই তাকবির জোরে জোরে পড়তে পড়তে যাওয়া (আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ)।

এক রাস্তায় যাওয়া, অন্য রাস্তা দিয়ে ফেরা।
পশু কোরবানির মাধ্যমে ইমানের সাক্ষ্য প্রদান এবং পশুত্ব কোরবানির মাধ্যমে পরিপূর্ণ মানুষ হওয়াই কোরবানির দাবি। কোরবানির মাধ্যমে ক্রোধ, হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, শত্রুতা ইত্যাদি পশুত্বকে দমন করে মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর ভয় ও ত্যাগের চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে পারলে আমাদের কোরবানি সার্থক হবে এবং সমাজে শান্তির সুবাতাস ছড়িয়ে পড়বে। আল্লাহর কাছে কোরবানি কবুলের জন্য প্রার্থনা করছি।

ঈদুল আজহায় পশু কোরবানির সঙ্গে সঙ্গে কোরবানি হোক মানুষের অন্তরের কুপ্রবৃত্তিরও। সব হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সবাই এগিয়ে আসুক। আত্মত্যাগের শিক্ষা নিয়ে হাজির হওয়া ঈদুল আজহার দিনে এমন  প্রত্যাশা হোক সকলের।

লেখক-শিক্ষক ও প্রধান সম্পাদক

শিক্ষাবার্তা ডট কম।

এই বিভাগের আরও খবরঃ