website page counter সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন করতে পারলেই; শহীদদের প্রতি সঠিক সম্মান প্রদর্শন করা হবে – শিক্ষাবার্তা

22 March 2019,

সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন করতে পারলেই; শহীদদের প্রতি সঠিক সম্মান প্রদর্শন করা হবে

ভাষা কী? ভাষা জাতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ? পৃথিবীর আলো দেখার পর থেকেই মা এবং আশপাশের মানুষের মুখের ভাষা শুনে শিশু ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হয়। সেটাই তার মাতৃভাষা। সেই ভাষা চর্চার মধ্যে দিয়েই শিশু বড় হয়ে উঠতে থাকে। পৃথিবী থেকে বহু ভাষা আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। হারিয়ে যাওয়ার পথে অনেক ভাষা। আমাদের বাংলা ভাষাও কেড়ে নিতে চেয়েছিল পাকিস্তানী শাসকেরা। জীবনের বিনিময়ে সে ভাষার অধিকার রক্ষা করেছি।

তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, রক্ষা করেও যেন মাতৃভাষা আমাদের কাছে বড় অবহেলার। বেশ আয়োজন করেই যেন আমরা বিদেশি ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছি। দিনের পর দিন অবহেলার ফলে ভাষাচর্চার অভাবে ভাষার বিকৃতি ঘটছে। মাতৃভাষার এ পরিণতি বেদনাদায়ক। বাংলার স্থলে ইংরেজি অনেক বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। মানছি ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা। ভাষার স্বাধীনতাও আবশ্যক। আমরা সৌভাগ্যবান যে, আমাদের সেই স্বাধীনতা রয়েছে। ইংরেজি ভাষার আধিপত্যে মাতৃভাষা আজ কোণঠাসা। স্কুল কলেজ থেকে শুরু করে অফিস আদালত পর্যন্ত ইংরেজি ভাষার প্রাধান্য। প্রাধান্যের পরিমাণ এতটাই বেশি যে, ইংরেজি ভাষা জানলে আর অন্য ভাষা জানার প্রয়োজন হয় না। নামফলক লেখার ব্যাপারে আদালতের যে আদেশ রয়েছে তাও উপেক্ষিত হচ্ছে। অথচ এই ভাষায় কথা বলার অধিকার আমাদের আন্দোলন করে অর্জন করতে হয়েছে। এটি ছিল আমাদের গর্ব। তবে গর্ব হওয়া পর্যন্তই যেন আমাদের দায়িত্ব।

প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে শহীদ মিনারে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গান গাওয়াটাই যেন শেষ কথা। আমরা সেদিন শহীদদের অবদান ভুলে না যাওয়ার শপথ করলেও আমরা সেকথা পরদিনই ভুলে যাই! প্রথম ভাষা, দ্বিতীয় ভাষার যে বিষয় রয়েছে তার মধ্যে আজ ইংরেজি ভাষাই যেন প্রথম ভাষা। ইংরেজির গুরুত্ব বেশি, স্কুল কলেজে ইংরেজি শিক্ষকের গুরুত্ব বেশি, ইংরেজিতে কথা বলার গুরুত্ব বেশি, ইংরেজি জানা ব্যক্তির গুরুত্ব বেশি। তাহলে বাংলার অবস্থান কোথায়? কেবল গর্ব করলেই কি সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? ইংরেজি ভাষা আজও অভিজাত শ্রেণির ভাষা। বাংলা ভাষার অবস্থা তাই ক্রমেই দৈন্য। একদম প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ইংরেজি বিস্তারে যে পদক্ষেপ বা আগ্রহ ততটা আগ্রহ বাংলা ভাষার শুদ্ধতার বিস্তারে নেই। ইংরেজি শিখলেই সব হয়ে যাবে এমন ভাবটাই প্রাধান্য পাচ্ছে। তাছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে মিশ্রিত ভাষা বাংলাকে আরও দুর্বোধ্য করে তুলছে। অথচ সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রভাষা বাংলার সুষ্ঠু ব্যবহার ও মর্যাদা রক্ষার কর্তব্য রয়েছে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার পাশাপাশি বিদ্যমান আইন ও হাইকোর্টের আলাদা দুটি আদেশ থাকার পরও সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত করা যায়নি। এমনকি সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড বাংলায় লেখার প্রজ্ঞাপন থাকলেও তার কোনো তদারকি বা মেনে চলার আগ্রহ নেই। ফলে আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চর্চার গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে আইন করা হয় ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ। তবে সেই স্বপ্ন অধরাই থেকেছে বরাবর। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি এলে বাংলা ভাষা চর্চা এবং সর্বস্তরে প্রয়োগের বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। তারপর সারাবছর আবার সেই এক অবস্থা। দেশের শহরে বড় হওয়া প্রজন্মের কাছে বাংলা প্রাধান্য না পেয়ে ইংরেজি গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। কারণ ইংরেজি সর্বস্তরে তার থাবা বিস্তার করেছে।

ভারতীয় উপমহাদেশ বহু বছর ব্রিটিশদের অধীনে ছিল। তাদের অধীনে থাকার কারণে ইংরেজি আমাদের অস্থি মজ্জায় গেঁথে গেছে। ব্রিটিশরা চেয়েছিল তাদের শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের ওপর প্রয়োগ করতে। বহু বছরের শাসনের ফলে তাদের সেই অভিপ্রায় আজ অনেকটা সফল। এতটাই সফল যে, ইংরেজি না জানলে এখন সম্মান পাওয়াটাও দায়। স্কুলের শিক্ষার্থীদের এ কারণে বছরজুড়ে ইংরেজি প্রাইভেট পড়ানো হয়। তারা যে বিষয়গুলোতে অকৃতার্য হয় তার অন্যতম ইংরেজি। অর্থাৎ শিক্ষাজীবনের একটি অংশ তারা ইংরেজি শিখতেই কাটিয়ে দেয়। তারপরও সেই ভাষায় তারা কতটা দক্ষতা অর্জন করতে পারে ভর্তি পরীক্ষায় বা চাকরির ভাইভাতে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। অথচ বাংলাও সমান মনোযোগ দিয়ে পড়া উচিত এরকম কথা পরিবারে বা স্কুলে খুব কমই বলা হয়।

বাংলা ভাষার প্রতি বর্তমান প্রজন্মের আগ্রহ কতখানি তা পরিমাপের একটা চেষ্টা করা যেতে পারে। সারা বছর বাংলা নিয়ে চর্চা হবে। সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর করার চেষ্টা করা হবে। আমাদের ছেলেমেয়েরা মোটা মোটা বিদেশী সাহিত্যের বই নিয়ে দিন রাত ব্যস্ত থাকবে  না। তারা বাংলা বই নিয়েও সময় কাটাবে। মোট কথা শুধু কাগজে-কলমে নয় অন্তরে মাতৃভাষাকে স্থান দিতে হবে। তাহলেই অন্তর হবে শুদ্ধ। আর শুদ্ধ অন্তর দিয়ে যে ভাষাই আয়ত্ব করতে চাও না কেন তা সম্ভব । এবার একটু বাংলা বানানের কথায় আসি। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন দেখেছি বানান ভুল হলে মার্কস কেটে নেয়া হতো। আমরা অতি সতর্কতার সাথে ইংরেজি বানান মুখস্থ করার মত বাংলা বানান মুখস্থ করতাম। যাতে পরীক্ষার খাতায় বানানের জন্য কোন মার্কস কাটা না যায়। বানান ভুল হলে শিক্ষকরা তার নিচে লাল কালি দিয়ে দাগ দিত। বাড়িতে যখন সে খাতা দেখাতাম খুব লজ্জা হতো। ফলে এমন হতো যে, যেখানে ভুল বানান চোখে পড়তো মনে হতো সৌন্দর্যের একটা অভাব রয়েছে। এটাও আজকাল উঠে গেছে বলেই মনে হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে শহীদদের আত্মত্যাগ, বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি- বাংলাভাষা নিয়ে এগুলো গর্ব করার মতো বিষয়। এছাড়াও এ ভাষা নিয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে বলার অনেক কিছু আছে। দেশে অনেক ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল রয়েছে। সেখানে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলার সঠিক ব্যবহারের উপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে গর্ব করলেই শুধু হবে না। বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে হৃদয় দিয়ে, সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন করতে হবে। তাহলেই শহীদদের প্রতি সঠিক সম্মান প্রদর্শন করা হবে।

এই বিভাগের আরও খবর