website page counter বাংলা বাহিত হয়ে ধারিত হোক হৃদমন্দিরে – শিক্ষাবার্তা

22 March 2019,

বাংলা বাহিত হয়ে ধারিত হোক হৃদমন্দিরে

বহন করা সহজ কিন্তু ধারণ করা কঠিন । কায়িক পরিশ্রমে বহন করা যায় অনেক কিছুই কিন্তু সবকিছু ধারণ করা যায় না । ১৯৪৮ সালে যখন পশ্চিম পাকিস্তানীরা বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দু চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল তখন বাঙালিরা বাংলাকে শুধু বহন নয় বুকে ধারণ করে জীবন দিয়ে বাংলার স্বীকৃতি আদায় করেছেন। অবশ্য বাংলাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছিল মধ্যযুগেরও পূর্ব থেকে। কখনও ওলন্দাজরা চেয়েছে ধর্মের দোহাই দিয়ে বাংলাকে নিশ্চিহ্ন করতে আবার কখনও ইংরেজরা চেষ্টা করেছে ইংরেজী হরফে বাংলা চর্চায় বাধ্য করতে । কিন্তু কারো কোন চেষ্টাই সফল হয়নি কারণ তৎকালীন সময়ের বাংলা মায়ের বীর সন্তানরা অর্থাৎ আমাদের পূর্বপুরুষরা বাংলাকে শুধু বহন নয় ধারণও করেছিল তাদের রক্তশিরায় ।

আমাদের পূর্বপুরুষদের আবেগ ভালবাসায় বাংলা ভাষা তার নিজস্ব গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বনন্দিত ভাষায় পরিণত হলেও আমরা বর্তমান প্রজন্ম অনেকটাই উদাসীন আমাদের গর্বের মাতৃভাষা নিয়ে । বর্তমানে বাংলাকে বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকার কর্তৃক বিভিন্ন আইনও পাশ হচ্ছে কিন্তু যেহেতু বাংলাকে হৃদয়ঙ্গম করতে আমরা উদাসীন তাই কিছু ক্ষেত্রে বাংলা বাহিত হলেও ধারিত হচ্ছে না । প্রতিনিয়ত বাংলা তার জৌলস হারাচ্ছে শুধু আমাদের উদাসীনতা আর অনাগ্রহের কারণে । আমার স্বল্প জ্ঞানে আজ কিছু ক্ষেত্র চিহ্নিত করার চেষ্টা করব যেগুলোর মাধ্যমে বাংলা ধারণ করা সম্ভব ।

১) # জন্মদিন পালনঃ ইংরেজদের কাছ থেকে যেসকল সংস্কৃতি আমাদের বাঙালি জীবনে স্থান করে নিয়েছে তার মধ্যে জন্মদিন পালন বোধকরি ১ম সারির একটি । জন্মদিন পালনে বাহারি কেক বানানো হয়, কেকের উপর যার জন্মদিন তার নাম আর সাথে জন্মদিন বার্তা লেখা হয় । কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখবেন প্রায় ৯৯ভাগ কেকের উপর ইংরেজী হরফে হ্যাপি বার্থডে, নাম, জন্মতারিখ লেখা থাকে । কিন্তু কেন হ্যাপি বার্থডে লিখতে হবে ? শুভ জন্মদিন শব্দটি কি ইংরেজী হ্যাপি বার্থডের থেকে অধিকতর সুন্দর নয় ? ঠিক তেমনি জন্মদিন পালনের সময় আমরা মুখে হ্যাপি বার্থডে বলেই শুভ কামনা জানাই । কিন্তু কেন ? জন্মদিনের সকল শুভেচ্ছা বাংলায় হতে পারে না ?

২)# প্রতিষ্ঠানের নামফলকঃ নামফলকে যত্রতত্র ভিনদেশী শব্দ ভিনদেশী হরফে লিখে টাঙিয়ে দেয়া হচ্ছে । এমনকি বড় বড় বিজ্ঞাপনচিত্রেও শোভা পাচ্ছে ভিনদেশী হরফে লেখা নামফলক । বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম , দোকানের নামসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম ইংরেজিতে তো রাখা হচ্ছেই সাথে নামফলকে ইংরেজি হরফই ব্যবহার করা হচ্ছে । অথচ বাংলাদেশের আইন আছে , প্রতিষ্ঠানের নাম অবশ্যই বাংলা হরফে লিখতে হবে । ভিনদেশী নাম থাকতে পারে কিন্তু প্রথমে বাংলা হরফে লিখে প্রয়োজনে ছোট হরফে অন্য ভাষা লেখা যেতে পারে । কিন্তু এই আইন অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় খোদ আইনরক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানও মানে না ।
৩)টিভি চ্যানেলের নামঃ বাংলাদেশের ৪৪টি অনুমোদিত টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে । সরকারী চ্যানেল রয়েছে ৩টি বাকিগুলো বেসরকারী । সরকারী টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতীকটি বাংলায় থাকলেও অনেকগুলো বেসরকারী চ্যানেলের প্রতীকে ব্যবহৃত হচ্ছে ইংরেজী হরফ । বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে অবিরাম বাংলার মুখ , হৃদয়ে বাংলাদেশ , দৃষ্টি জুড়ে দেশ সহ বাংলাকে আশ্রয় করে মূলমন্ত্র তৈরি করলেও তাদের চ্যানেলের প্রতীকে রয়েছে ইংরেজি হরফ । তবে বেশ কিছু টিভি চ্যানেল বাংলা হরফে তাদের চ্যানেল প্রতীক নির্ধারন করেছে ।

৪) #স্টেশনের তথ্যবোর্ডঃ ভিনদেশে যাত্রায় অভিজ্ঞতা আমার খুব বেশি না তবে ইন্টারনেট আর নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখেছি ভিনদেশি ট্রেন স্টেশন বা বিমানবন্দরে তাদের রাষ্ট্রীয় ভাষায় বেশি তথ্য দেয়া থাকে। এমনকি স্টেশনের নামও তাদের নিজস্ব ভাষায় থাকে খুব কম ক্ষেত্রেই নিজস্ব ভাষায় নামের সাথে ইংরেজি দেয়া থাকে । কিন্তু আমাদের দেশের বড় বড় রেল স্টেশন বা সবগুলো বিমানবন্দরে পাওয়া যায় উল্টো চিত্র । আমাদের দেশে ইংরেজি হরফে বেশি কিন্ত বাংলা হরফ কম ব্যবহার করেই নোটিশ বোর্ড করা হয় ।

৫)# বাংলিশ আসক্তিঃ আমরা বর্তমান প্রজন্ম বাংলিশে আসক্ত । বিভিন্ন অনুষ্ঠান সঞ্চালনার ক্ষেত্রে দেখা যায় উপস্থাপনকারী শুরু করে , ‘ হাই ভিউয়ারস’ বলে শুরু করে কিন্তু কেন ? সুপ্রিয় দর্শকশ্রোতা কি হাই ভিউয়ার্সের থেকে শ্রুতিমধুর নয় ? আবার থ্যাঙ্ক ইউ, সরি , ইক্সিউজ মি এসবের থেকে ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞ, কৃতার্থ, ক্ষমাপ্রার্থী শব্দগুলো অনেক বেশি আবেগ বহন করে । কিন্তু আমরা এই শব্দ গুলো বাদ দিয়ে রক্তের সাথে ধারণ করে নিচ্ছি ভিনদেশী শব্দ । চলিত ভাষার সাথে সাধু ভাষা মিশ্রণ গুরুচন্ডালী দোষে দুষ্ট হয় কিন্তু এক ভাষার সাথে অন্য ভাষা মিশ্রণ সম্পূর্ণটাই অশুদ্ধ । তাও আমরা অশুদ্ধটাকেই নিয়ে নিচ্ছি নিজেদের জ্ঞানের পরিমাপক হিসেবে ।
যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী
সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি ।।

মধ্যযুগে কবি আবদুল হাকিম এভাবেই বিষেদাগার করে গিয়েছিলেন তৎকালীন সময়ে যারা বাংলা ভাষার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে । কিন্তু আর ৪০০ বছর পর আমরা কি পেরেছি কবির মত বাংলাকে শিরায় উপশিরায় ধারণ করতে। এখনই সময় বাংলাকে শুদ্ধভাবে বহন করে নিজ অন্তরে ধারণ করার । জাতিসংঘ বাংলাকে বিশ্বের সব থেকে শ্রুতিমধুর ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভাষা ব্যবহারকারীদের সংখ্যা বিচারে বাংলা ভাষার অবস্থান বিশ্বে ষষ্ঠ । তাই আসুন কবি অতুলপ্রসাদ সেনের সাথে কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে উচ্চারণ করি “ মোদের গরব মোদের আশা , আমারই বাংলা ভাষা ।। “

বিধান চন্দ্র সাহা,
প্রভাষক, কৃষিশিক্ষা বিভাগ ।

এই বিভাগের আরও খবর