অধিকার ও সত্যের পক্ষে

‘মুক্তিযুদ্ধকে আশ্রয় বানিয়ে উপন্যাস লেখা সহজ নয়’ : বাসার তাসাউফ

 শিক্ষাবার্তা ডেস্ক ||
এবারের বইমেলায় কথাসাহিত্যিক বাসার তাসাউফের নতুন দু’টি বই প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর বই দুটি নিয়ে কথা বলেছেন শিক্ষাবার্তা পত্রিকার সহকারী সম্পাদক আমিনুল ইসলাম।
শিক্ষাবার্তা: আপনার লেখালেখি কীভাবে শুরু হয়েছিল?
বাসার তাসাউফ: সেই শৈশবে, যখন আমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম তখনই লেখালেখির সূচনা হয়েছিল। আমি তখন ডানপিটে আর দুরন্তপনায় মেতে থাকতাম। পাড়ার ছেলেরা মিলে মাছধরা, নদীর জলে ডুবসাঁতার, লাই খেলা আর গাছের ফল চুরি করতাম। একবার গাবচুরি করতে গাছ থেকে পড়ে গিয়ে আমার ডান পা ভেঙে যায়, একবছর বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়েছে। তখন আমি সম্ভব ত তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। আমাদের ঘরে কে যেন এনেছিল ড. আশরাফ সিদ্দিকীর গল্পের একটি বই। বইটির নাম ঠিক মনে নেই। তবে সেই বই থেকে পড়া একটি গল্পের কথা মনে আছে, ‘গলির ধারের ছেলেটি’ নামের গল্পটি পড়ে আমার মাঝে একধরনের সাহিত্যবোধ তৈরি হয়েছিল হয়তো। পরবর্তীতে গল্প পড়ার প্রতি নেশা তৈরি হয়েছিল। এভাবে পড়তে পড়তেই আমি লেখতে শুরু করি।
শিক্ষাবার্তা: প্রথম কোন লেখাটি আপনার প্রকাশিত হয়েছিল? বাসার তাসাউফ: নাম মনে নেই। ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। শিক্ষাবার্তা: এবার বইমেলাতে আপনার কী কী বই বের হচ্ছে? বই সম্পর্কে পাঠকদের বলুন।
বাসার তাসাউফ: বেহুলাবাংলা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে আমার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘স্বর্গগ্রামের মানুষ’ এটি মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস। মূল চরিত্র রেহানা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কত লেখককই তো লিখেছেন। কেউ বাস্ততব অভিজ্ঞতা লিখেছেন, কেউ ইতিহাস পড়ে লিখেছেন। সবার লেখায়ই মুক্তিযুদ্ধের একটা অংশজুড়ে উপস্থাপিত হয়েছে। আমার এ উপন্যাসেও তার ব্যত্যয় হয় নি। আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখি নি। বই পড়ে ও মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে শোনে এবং গল্পের প্রয়োজনে সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে লেখার চেষ্টা করেছি। এ উপন্যাসের নায়িকা রেহেনা আমার কাছে বীরাঙ্গনাদের প্রতীকী মানুষ। ১৯৯৮-এর শেষ দিকে তাকে আমি দেখেছিলাম। তখন আমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম। মফস্বলের ছোট একটি গ্রামে (স্বর্গগ্রাম) সে তখনও বেঁচে ছিল। আমার ধারণা সে এখনও বেঁচে আছে সেখানে। এ রকম এক নারীকে নিয়ে লেখা খ্যাতিমান এক লেখককের একটা বই পড়েছিলাম। খুবই ছলে আর কলে লেখা। পড়ে আমি তৃপ্তি পাইনি। কিন্তু তিনি কী বলতে চেয়েছেন, সেটা বুঝেছিলাম। আমি মনে করি, সবচেয়ে ভালো গল্প হচ্ছে সেই সমস্ত গল্প, যা লিখেও লেখক সে-সম্পর্কে কিছুই জানে না। এ যেন একধরনের সৃষ্টি। কারণ আমাদের চারপাশে যা ঘটেছে বা ঘটছে তাতে নিজেকে আটকে না রেখে কল্পনায় কিছু লেখারও গুরুত্ব আছে। যদি কেউ এমন কিছু কল্পনা করতে পারে, যা তার অভিজ্ঞতায় নেই, তাহলে প্রায়ই দেখা যাবে যে অন্য কেউ হয়তো সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে আর তার সঙ্গে একাত্মতা বোধ করছে। বিশ্বসাহিত্যে এমন অনেক উদাহরণ আছে। অ্যালান পো’র ‘দ্য টেল-টল’ অথবা ‘দ্য পিট অ্যান্ড দ্য পেন্ডুলাম’ গল্পগুলো এমনই। তার জীবনে এসব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ আর কি ছিল? তিনি শ্রেফ চিলেকোঠার ঘরে বসে গল্পগুলো লিখেছেন আর লোকে মনে করেছে কত সুন্দর ও সত্য এসব লেখা! আবার হেরমান মেলভিল- এর মতো লেখকেরা আছেন, যারা অভিজ্ঞতা থেকে লেখেন। ‘মবি ডিক’ ও ‘কনফিডেন্স ম্যা’ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তবে এসব গল্পে যে কল্পনার মিশেল নেই তা কিন্তু নয়। গত বছরের আগের বছর এপ্রিল মাসে স্বর্গগ্রামের সেই বীরাঙ্গনা রেহেনাকে (রেহেনা তার আসল নাম নয়) নিয়ে এই উপন্যাসটি লেখা শুরু করি। কিন্তু এ বিষয়ে আমার যথেষ্ট প্রস্তুতি ছিল না বলে লেখা থামিয়ে পড়া শুরু করি। এক বছর বেশ কিছু বইপত্র পড়ে ২০১৮ তে এসে আবার লেখা শুরু করি। তবু আমার মনে হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধকে আশ্রয় বানিয়ে উপন্যাস লেখা সহজ নয়। এজন্যে তো আগে আমি নিজেকে তৈরি করিনি। দুয়েকটা গল্প বা নিবন্ধ হয়তো লিখেছি, তবু আমি চেষ্টা করেছি।
শিক্ষাবার্তা: বইটি কোন প্রকাশনী হতে বের হচ্ছে? কোথা থেকে কেনা যাবে?
বাসার তাসাউফ: বইটি প্রকাশ করেছে বেহুলাবাংলা প্রকাশন। পাওয়া যাবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ১২৩-১২৪ নম্বর স্টলে।
শিক্ষাবার্তা: আপনার তো একটি গল্পের বইও বের হয়েছে, সে সম্পর্কে বলুন।
বাসার তাসসাউফ: হ্যা, ‘পিতৃশোক ও দীর্ঘশ্বাসের গল্প’ নামে আমার একটি গল্পের বই বের হয়েছে। এটি একটি গুরুত্ববাহী বই আমার। অনেক আবেগাপ্লুত হয়ে এটি লিখেছি।
শিক্ষাবার্তা: অতি সম্প্রতি আপনার পিতা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিল, সেই শোক থেকেই তো এ বইটি লেখা। সেই সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই।
বাসার তাসাউফ: আমার পিতা মাজু উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ সেপ্টেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ২৯ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু আমি সহজে মেনে নিতে পারিনি। বিশাল শূন্যতায় আমার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠেছে! আমি ভীষণ মর্মাহত হয়েছি, ভেঙ্গে পড়েছি, ছোট্ট শিশুর মতো চিৎকার করে কেঁদেছি; তবু আমার বুকের ভেতরের হাহাকার থামেনি। সেখানে দীর্ঘ একটা শ্বাস বাঁইকুড়ালি বাতাসের মতো ঘুরপাক খেয়েছে। সেই শূন্যতা আর হাহাকারের দীর্ঘশ্বাসটি বুকের ভেতর থেকে বের করে বাতাসে উড়িয়ে দিতেই ‘পিতৃশোক ও দীর্ঘশ্বাসের গল্প’ বইটির জন্ম। আমার পিতা ছিলেন একজন কৃষক, একজন শ্রমিক, একজন জেলে এবং আরও বিচিত্র ধরনের কাজ তিনি করেছেন। গল্প-কবিতা বুঝতেন না; কিন্তু আমি চর্চা করি বলে ভালোবাসতেন। প্রতিবছর বইমেলায় প্রকাশিত আমার নতুন বইটি তাঁর হাতে তুলে দিতাম, তিনি নেড়েচেড়ে দেখতেন, খুশি হতেন। এই কারণে লেখালেখির প্রতি আমার ঝোঁক আরও বেড়ে গিয়েছিল। পিতৃহারা সন্তানদের পড়া উচিৎ আমার এই বইটি।আমার বাবার মৃত্যুুর পর আবেগাপ্লুত হয়ে আমি লিখেছি গল্পটি। মেলার প্রথম দিন থেকেই বইটি পাওয়া যাচ্ছে ৩৯৮ নংশুদ্ধ প্রকাশ এর স্টলে।
শিক্ষাবার্তা: আপনাকে ধন্যবাদ

 

একই ধরনের আরও সংবাদ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.