অধিকার ও সত্যের পক্ষে

অবাঞ্চিত হোক কোচিং বাণিজ্য

 প্রকৌশলী সাব্বির হোসেন খোকন।।
‘কোচিং’ বর্তমান বাংলাদেশে এক অর্থে খুব ভয়ংকর শিক্ষা ব্যবস্থার নাম। যদিও ১৮৩০ সালে অক্সফোর্ড বিশ^বিদ্যালয়ে মহৎ উদ্দেশ্যে কোচিং এর যাত্রা শুরু হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে নানা ডেকোরেশন যুক্ত হয়ে কোচিং নামক ফ্যাক্টরটি জন অকল্যাণে প্রয়োগের অভিযোগে আক্রান্ত হয়েছে।

ব্যক্তিগত কিংবা দলগত উন্নয়ন করে একজন মানুষকে জীবনের নানা ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করতেই যে কোচিং শুরু হয়, কালের বিবর্তনে আজ তা বাণিজ্যিক রুপ ধারণ করে ধুসর হয়েছে এই অর্থে যে এখন আর উন্নয়ন নয় অসদোপায়ে শিক্ষার্থীদের সুবিধা পাইয়ে দেয়ার অবলম্বনই হচ্ছে কোচিং এর পরিচয়।

কার্যত একটি ক্লাসে যখন শতাধিক কিংবা কয়েকশতাধিক শিক্ষার্থী পাঠ গ্রহণের জন্য একসাথে বসে আর একজন শিক্ষক লেকচার দিয়ে থাকেন তখন বেশিরভাগ শিক্ষার্থী তা গ্রহণে ব্যর্থ হয়। এতে করে সেই শিক্ষার্থীগুলো পরীক্ষায় ফল খারাপ করে আর সেজন্য তাদের অভিভাবক চিন্তায় পরে যায় তাদের সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে। অপেক্ষাকৃত দূর্বল শিক্ষার্থীদেরকে লক্ষে পৌঁছে দিতে প্রয়োজন দেখা দেয় প্রাইভেট টিউটরের।

পক্ষান্তরে অনেক ধনী পরিবারের অভিভাবক চিন্তা করেন তার সন্তান যেনো দেশ সেরা শিক্ষার্থী হতে পারে এজন্য তিনি প্রতিটি বিষয়ের জন্য প্রাইভেট শিক্ষকের ব্যবস্থা করে দেন। প্রতিবছর ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রাইভেট পড়োয়াদের সংখ্যা। একটা সময় শিক্ষক মহোদয় অনুধাবন করেন প্রাইভেটে ১ জন শিক্ষার্থীকে পড়াতে যে সময় ব্যয় হয় সেই একই সময়ে ৪/৫ জন শিক্ষার্থীকে পড়ালে উপার্জন বেড়ে যেতে পারে।

এভাবেই শুরু হয় দল বেধে প্রাইভেট পড়ার সংস্কৃতি যা এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এতে অপক্ষোকৃত গরীব শিক্ষার্থীরাও প্রাইভেটের আওতায় চলে আসে। ঠিক এভাবেই একটা সময় দেখা যায় প্রাইভেটে যে টাকা পাওয়া যায় তার থেকে ভালো হবে যদি ২০/২৫ জনকে একসাথে পড়ানো যায়।

এক্ষেত্রে আরেকটি ফ্যাক্ট কাজ করে আর তা হলো হতদরিদ্র পরিবারগুলো প্রাইভেটের টাকা যারা বহন করতে অক্ষম তারা বেশি শিক্ষার্থী একসাথে পড়ার কারণে তাদের সন্তানদের কম টাকায় পড়ানোর সুযোগ পেয়ে যায়। আর এভাবেই শুরু হয়ে যায় কোচিং শব্দটির প্রাতিষ্ঠানিক কার্যোক্রম।

একটা সময় উপরের ক্লাসের শিক্ষার্থীরা কোচিং সেন্টারের সাথে যুক্ত হয়ে নিচের ক্লাসের শিক্ষার্থীদের পড়ানো ছিলো স্বাভাবিক ঘটনা কিংবা বিশ^বিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থী বিশ^বিদ্যালয় ভর্তিচ্ছুদের কোচিং করাতো। তবে সময়ের ব্যবধানে শিক্ষকতা পেশায় জড়িতরা ঝুকে পরে কোচিং এর দিকে।

দেশের নামকরা অনেক শিক্ষক সরকারি চাকরি ছেড়ে প্রাইভেট কোচিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে পড়ানো শুরু করেন আর তখন থেকেই আসলে সহায়ক কোচিং’ই হয়ে পরে বণিজ্যের মাধ্যম সুশিক্ষার অন্তরায় হয়ে পরে কোচিং সেন্টারগুলো। এখানে মানুষের লোভ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে যা সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসে।

এমনকি কোচিং বাণিজ্যের অন্তরালে যৌন নীপীরণও আলোচনায় চলে আসে। লেখাপড়ার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠে কোচিং সেন্টাগুলো, কেউ ক্যাডেট কোচিং, কেউ ভার্সিটি কোচিং কেউ ১ম থেকে দ্বাদশ কোচিং দিয়ে রমরমা ব্যবসা করে আসছে দীর্ঘ্য দিন থেকে।

শ্রেণীকক্ষে অমনোযোগ বাড়তে থাকলে অভিভাবক বাধ্য হয়ে জড়িয়ে পরে কোচিং বাণিজ্যের ফাদে। শুরু হয় লাগাতার প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনা যেখান থেকে বেড়িয়ে আসতে অনেক উদ্যোগ নেওয়ার পরও মিলছেনা মুক্তি। এমনও হয়েছে একজন শিক্ষার্থীকে পাশ করিয়ে দিয়ে কিংবা মেডিকেলে ভর্তি করিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জন করেছে অনেকেই।

তাহলে আমরা কি এই অপশক্তির কাছে হেরে যাবো? কিছুই কি করণিয় নেই? গ্রেফতার কিংবা দন্ডাদেশ আমাদের সমাজের এই কুলসিত কোচিংবাজদের থেকে শিক্ষাকে মুক্ত করতে খুব বেশি কার্যোকর হবেনা যতক্ষণ না কোচিং এর প্রয়োজনকে আমরা মিটাতে পারি। শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস না পরিচালনা করে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রাথমিকে বিশ এর মধ্যে, মাধ্যমিকে চল্লিশ এর মধ্যে, উচ্চ মাধ্যমিকে পঞ্চাশের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।

একজন শিক্ষক যেনো সকল শিক্ষার্থীদের কাছে তার পাঠকে পৌঁছে দিতে পারেন সেজন্য সাউন্ড সিস্টেমযুক্ত শেণীকক্ষের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষকদের ক্লাসের সংখ্যা কমিয়ে সময় বাড়ানোর বিষয়টি ভাবতে হবে। উপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের নৈতিকতার গুণগত উন্নয়নে কর্মশালা এবং সেরাদের মূল্যায়ন করে পুরস্কৃত করতে হবে যাতে তারা ভালো কাজে উৎসাহী হয়।

শিক্ষক সংকটের বিষয়টি সুরাহা করতে হবে কেননা অপর্যাপ্ত শিক্ষক যখন শ্রেনীপাঠ দিতে ব্যর্থ হয় তখনই এই সুযোগটির অপব্যবহার করে কোচিং নামের বিষফুরাটি। শেণীর পাঠ যেনো শ্রেণীতেই আদায় করা যায় সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় কোন বিষয় থাকলে সেগুলো পরিহারের উদ্যোগ নিতে হবে। বর্তমান সময়ের জীবনযাত্রার মানের সাথে সমন্বয় করে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো তৈরি করতে হবে।

অভাবের সংসারে নীতি কথায় পেট ভরেনা বলে একটি কথা প্রচলিত আছে সেখান থেকে শিক্ষক সমাজকে মুক্তি দিতে হবে। প্রতিটি মানুষ দিনে একবার হলেও সৃষ্টি কর্তার কথা ভাবে তাই ধর্মীয় নীতিবাক্যগুলো পাঠের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নৈতিক শিক্ষা এবং নীতিবান মানুষকে সম্মানিত করতে হবে।

ভালোর চর্চা বাড়াতে পারলে একটা সময় অনৈতিক পথে কেউ পা বাড়াবে না। পারিপর্শিক অনেক কিছুই রয়েছে যা মানুষকে বাধ্য করে অন্যায়কে মেনে নিতে সেখান থেকে কাজ শুরু করতে হবে। শুধু কোচিং বাণিজ্য নয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন গাইড বই কিংবা ব্যাকরণ বই পাঠ্য করে শিক্ষার্থীদের থেকে যে বাড়তি টাকা নেওয়া হয় সেগুলোও বন্ধ করতে হবে। নিয়মিত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি রুটিন ওয়ার্কেও আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের কাজের উপর নজরদারি করার জন্য অন্তত তিনস্তর বিশিষ্ট মনিটরিং সেল স্থাপন করতে হবে। মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে উপর মহল পর্যন্ত যেন কেউ শিক্ষা বিষয়ক দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ত হতে না পারে সে ব্যবস্থাটি রাখতে হবে। একজন অভিভাবক যখন দেখে তার সন্তার অন্যদের থেকে পিছিয়ে পরছে তখন তিনি যে কোন উপায়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে শ্রেণী শিক্ষকের বাইরে অন্য কারো কাছে পড়ানোর জন্য যেন উদগ্রিব না হয় তা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়ে বিশেষ যতেœর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

এতে করে সেই শিক্ষার্থীরা কোচিং এর ফাদে পা দিবেনা। তবে হ্যা টেস্ট পরীক্ষা দেওয়ার পর তিন চার মাসের যে সময় থাকে সেটিকে কমিয়ে আনতে হবে। লম্বা সময় ক্লাস না থাকায় শিক্ষার্থীরা বিপাকে পরে ফলে এই সময়ের জন্য তারা কোন না কোনভাবে যে কোন একটি কোচিং এর সাথে যুক্ত হয়ে পরে।

তাই একথা বলা যায় শিক্ষা ব্যবস্থার মূলে এই খতগুলো রেখে আইন প্রয়োগ করেও কোন ফল আসেনি আর আসবেও না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার এই সমস্যাগুলি শনাক্ত করে যেনো টেস্ট পরীক্ষার অল্প কয়েকদিনের মধ্যে চুরান্ত পরীক্ষা নেওয়া যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। বিদ্যালয় হবে প্রাণবন্ত ও শিক্ষক মন্ডলী হবে শিক্ষার্থীদের জন্য আদর্শ তবেই হয়তো মুক্তি মিলবে কোচিং নামক দানবের হাত থেকে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মহোদয় থেকে শুরু করে একেবারে একজন শিক্ষার্থী পর্যন্ত সকলেই যেন নৈতিকতাকে গুরুত্বারোপ করে তার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হবে। সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় আমরা সকলে একসাথে হয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে কোচিংকে অবাঞ্চিত করতে পারলেই কেবল বন্ধ হবে কোচিং বাণিজ্য।

একই ধরনের আরও সংবাদ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.