অধিকার ও সত্যের পক্ষে

ডাকসু নির্বাচন: হবে কি সহাবস্থান!

 কায়সার সুমন ॥

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের আর বেশি দিন বাকি নেই। ইতোমধ্যেই নির্বাচনের ক্ষণ গোনা শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সচেতন মহল— সবারই এখন আড্ডা কিংবা টংয়ের দোকানে চায়ের কাপের ঝড়; যেন সবকিছুই এই নির্বাচনকে ঘিরে। শুধু তাই নয়, দেশ, রাজনীতি কিংবা দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে যাদের ভাবনা আছে— তারাও রীতিমতো সকালের খবরের কাগজ পড়ার সময় কিংবা অনলাইনে সার্চের ক্ষেত্রে ডাকসু নির্বাচনকে বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করছেন।

আজকের লেখাটা পাঠকদের একটা সুসংবাদ দিয়ে শুরু করতে চাই। সুংবাদটি হলো, ‘চলতি সপ্তাহেই ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে এবং নির্বাচন হবে নির্ধারিত তারিখেই।’ অপরদিকে, ‘বেশির ভাগ সংগঠনের পক্ষ থেকে ভোটকেন্দ্র একাডেমিক ভবনে করার দাবি থাকলেও ডাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র হচ্ছে হলেই।’ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমনটাই বলা হচ্ছে।

প্রথমে সুসংবাদটির ব্যাখ্যায় আসি। প্রায় ২৮ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন হচ্ছে। যেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে সহায়ক হবে। ইতিহাস, ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কিত ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে বেশ কয়েক বছর ধরেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং করেছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন তেমন গুরুত্বের সাথে বিষয়টি নজরে নিয়ে আসেননি। নানান জটিলতায় দীর্ঘ বছর ধরে দ্বিতীয় পার্লামেন্টখ্যাত নির্বাচনটি হবে হবে আর হয়নি! শেষমেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন সকল ছাত্রসংঠনের প্রাণের দাবির সাথে একমত পোষণ করে নির্বাচনের জন্য সকল ছাত্রসংগঠনকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বলেন। আর এ সিদ্ধান্তকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় ১৪টি ছাত্রসংগঠন স্বাগত জানিয়েছে।

কিন্তু…. কিন্তু’র ব্যাখ্যাটা টানবো লেখার শেষদিকে। তার আগে সুষ্ঠু নির্বাচন ও ভোটকেন্দ্র নিয়ে কিছু লিখতে চাই। নির্বাচন সংক্রান্ত যেসব জটিলতা রয়েছে; বিশেষ করে সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্যে সব ছাত্র সংগঠনের সহাবস্থান নিয়ে মতের ভিন্নতা চোখে পড়ার মতো। নির্বাচন নিয়ে যেসব শিক্ষকরা কাজ করছেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে তাদের যে মতামত প্রকাশ করা হয়েছে; তা হলো— নির্বাচনের উপযোগী পরিবেশের কথা। নির্বাচন অবাধ ও সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা তারা জানিয়েছেন। অন্যদিকে কোনো কোনো শিক্ষকের অভিমত হলো, যেখানে সবার সহাবস্থানই নেই; সেখানে সুষ্ঠু পরিবেশ থাকে কেমন করে? আর এমন পরিবেশে নির্বাচন আদৌ সম্ভব কি-না— সে বিষয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছেন।

 ইতোপূর্বে ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে এককভাবে অনশন করেছেন এক শিক্ষার্থী

কিন্তু বাস্তবতা কী বলে! সত্যি কি সহাবস্থান নিশ্চিত হয়েছে? সবাই কি নির্বাচনী প্রচারণা করার ক্ষেত্রে সমানভাবে সুযোগ পাচ্ছে? ১. যদি ধরি যে সবাই সমানভাবে সুযোগ পাচ্ছে; তবে ক্যাম্পাসে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন ছাড়া অন্যদের তেমন উপস্থিতি আমাদের চোখে পড়ছে না কেন? ২. বেশিরভাগ ছাত্রসংগঠনের ভোটকেন্দ্র হলের বাইরে একাডেমিক ভবনে করার দাবি অগ্রাহ্য করার কারণ কি? ৩. কোটা সংস্কার আন্দোলনে গড়ে ওঠা সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতা হাসান আল মামুনকে কেন কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে অতর্কিত হামলা করা হলো? ৪. এসব ন্যাক্যাড়জনক ঘটনায় প্রশাসনের মুখ বন্ধ কেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন কেনই বা এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে তাদের চিরাচরিত বানীগুলো শোনাচ্ছে? তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন যে সহাবস্থানের কথা বলছে সেটা আসলে কোথায়? প্রচারণার ক্ষেত্রে তো তেমন কিছুই আমাদের চোখে পড়ছে না। তাহলে কি ধরেই নিব সহাবস্থান নিয়ে প্রশাসনের সকল বক্তব্য শুধুই কথার কথা! বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আসলে কি চাচ্ছেন? তারা কি সকল ছাত্রসংগঠনের মনের পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিবেন? না, এখন পর্যন্ত আমরা তো তেমন কিছুই দেখছি না। তাহলে কি ধরে নিব তার উল্টোটা হবে! আমরা কি ধরেই নিব একটি নির্দিষ্ট ছাত্রসংগঠনকে জেতাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উঠে পড়ে লেগেছেন! কিংবা নির্দিষ্ট ছাত্রসংগঠনের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন! তা যদি হয়; সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য লজ্জার হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ক্ষুন্ন করবে।

এবার আসি ‘কিন্তু’র উত্তরে। পত্র-পত্রিকার খবরে দেখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে ছাত্রলীগ তাদের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছ। যেটা অন্য সংগঠনগুলোর ক্ষেত্রে সে হারে দেখা যায়নি। কিন্তু কেন দেখা যাচ্ছে না অন্য সংগঠনগুলোকে? সেটা কি শুধুই সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠনের জনপ্রিয়তা নাকি ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে অন্যদের নিরুৎসাহিত করার বিষয়টিও রয়েছে! যদি ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে অন্যদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়; তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে মত প্রকাশ, অবাধে চলাফেরা আর স্বাধীনতার কথা তুলে বিগত দিনে যে গৌরব ঢাবি প্রশাসন করত; সেগুলো চিরতরে ধূলিসাৎ হওয়ার সম্ভাবনা জোরদার হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ কোনো সুনাগরিক এই ধরনের পরিস্থিতি দেখতে চায় না। প্রত্যেকের প্রত্যাশা— একটি নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। সেখান থেকেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের ছাত্র প্রতিনিধি বেছে নিক। হোক সে যে দলের কিংবা মতের। প্রত্যাশা— জনপ্রিয় ছাত্রপ্রতিনিধিই শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করুক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন চাইলেই সকল চাপ উপেক্ষা করে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে পারে। সে সক্ষমতা ঢাবি প্রশাসনের আছে বলে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি। কারণ, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সাথে মিশে আছে আমাদের গৌরবের ৫২-এর ভাষা সংগ্রাম কিংবা ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ! বিশ্ববিদ্যালয়টি পারবে কি তাদের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে! সেটা হয়তো সময়-ই বলে দেবে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

শিক্ষা বার্তা-আ.আ.হ/মৃধা

একই ধরনের আরও সংবাদ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.