অধিকার ও সত্যের পক্ষে

শিক্ষায় বিভাজন

 সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী॥

শিক্ষা সমাজকে আলোকিত করে। শিক্ষার উন্নয়ন কিংবা সুশিক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত না করে সমাজের উন্নতি আশা করা দূরাশারই নামান্তর। আমাদের সমাজের মধ্যে বিভক্তি লক্ষ্য করা যায়। এই বিভক্তি সম্পর্কে নানা মহল থেকে গুরুত্বসহকারে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠারও প্রকাশ ঘটে। বলা হচ্ছে, বিভক্তি দূর করো। বলা যায় যে, আমাদের সমাজ এখন তিন ভাগে বিভক্ত। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র। এটা নানাভাবে বোঝা যায়, টের পাওয়া যায় শিক্ষার দিকে তাকালেও।

শিক্ষা এখন সমাজের মতোই খাড়াখাড়ি তিন ভাগে হয়ে গেছে- ইংরেজি মাধ্যম, বাংলা মাধ্যম ও মাদরাসা। ইংরেজি মাধ্যম বিত্তবানদের জন্য, মধ্যবিত্তদের জন্য রয়েছে বাংলা মাধ্যম আর গরিব মানুষের ভরসা হচ্ছে মাদরাসা। শিক্ষার সঙ্গে সমাজে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তো থাকবেই। শিক্ষা সমাজের ওপর ভর করেই দাঁড়িয়ে থাকে এবং সমাজের যে বাস্তবতা, তাকেই প্রতিফলিত করে। কিন্তু সত্য তো এটাই যে, শিক্ষা সমাজকে বদলে দেবে- এটাই আমরা আশা করি। নইলে ‘শিক্ষা শিক্ষা’ বলে অত করে আওয়াজ তোলা কেন? আমাদের প্রত্যাশা থাকে, শিক্ষা জাতি গঠনে সাহায্য করবে।

তার অর্থ তো শিক্ষা সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করবে। কিন্তু বাস্তবে যা করছে সেটা তো দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টা ব্যাপার। ভিন্ন নয়, একেবারে উল্টা। সমাজের ভেতর যে শ্রেণিবিভাজন শিক্ষা তাকে বাড়িয়ে তুলছে। শিক্ষার ৩ ধারা সমাজের ৩ ভাগকে পরস্পর থেকে আলাদা করে দিচ্ছে। শিক্ষা যত বাড়ছে, বিভাজন তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা একাধারে করুণ ও হাস্যকর। বিভাজন জিইয়ে রেখে তো মানুষে মানুষে অধিকার ও সুযোগের সাম্য গড়ে তোলার বিষয়টি নিশ্চিত করা যাবে না। কারণ এই বিভাজনের চেয়ে বড় প্রতিবন্ধক তো আর কিছু হতে পারে না। একে শত্রুরূপেও চিহ্নিত করা যায়।

উচ্চবিত্তদের ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা আর মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যে মিল থাকার কোনো ব্যাপারই আশা করা যায় না। দুটি দুই ধরনের। ইংরেজি মাধ্যমে সবকিছুই চলে ইংরেজি ভাষায় আর মাদরাসায় ইংরেজি যা পড়ানো হয় তা খুবই সামান্য। কওমি মাদরাসায় পঞ্চম শ্রেণি থেকে ওপরের দিকে শিক্ষার মাধ্যম হচ্ছে আরবি, ফার্সি ও উর্দু। কিন্তু ওই যে মাতৃভাষার জন্য উপযুক্ত স্থান নেই, এ ব্যাপারে বড়লোকের ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা ও গরিবের মাদরাসা শিক্ষা চমৎকারভাবে কাছাকাছি চলে আসে। এর ফল যা দাঁড়াচ্ছে তা হলো- উভয় ধারার শিক্ষার্থীই উৎপাটিত হচ্ছে মাতৃভ‚মির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জ্ঞান থেকে। তাদের কৃত্রিম মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। মাতৃভাষাই হচ্ছে শিক্ষার সহজ, স্বাভাবিক ও কার্যকর মাধ্যম। অন্য ভাষায় যে শিক্ষা তা সব সময়ই কঠিন, কৃত্রিম ও অফলপ্রসূ হচ্ছে।

মাতৃভাষার মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের শিক্ষাদান ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। আর বড়লোক ও গরিবদের স্কুলে মাতৃভাষার স্থান তো খুবই সংকুচিত, অথচ কথা ছিল দেশ স্বাধীন হলে সর্বস্তরের শিক্ষাই হবে মাতৃভাষায়। তিন ধরনের শিক্ষা তো থাকবেই না, তিনে মিলে এক ও অভিন্ন হয়ে যাবে এবং মাতৃভাষাই হবে তার মাধ্যম। ঠিক এর উল্টাটাই ঘটেছে। মাতৃভাষাই পারত তিন ধারাকে এক করতে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আগে ইংরেজি মাধ্যমে স্কুল ছিল একেবারেই নগণ্য সংখ্যক। কিন্তু তারপরও হৈচৈ করে একেবারে চক্রবৃদ্ধি হারে ইংরেজি স্কুলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এখন রাজধানী বা প্রধান শহরগুলোতেই শুধু নয়, মফস্বলেও তারা ছড়িয়ে গেছে। তাদের চাহিদা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে মাদরাসা শিক্ষার চলও আগের সব রেকর্ড ইতিমধ্যে ভেঙে ফেলেছে। রাষ্ট্র ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। সেখানে রাষ্ট্র পরিচালিত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকার কোনো কথাই ছিল না। কিন্তু সংবিধান থেকে যে দ্রুততায় ধর্মনিরপেক্ষতাকে মুছে ফেলা হয়েছে, ততোধিক ত্বরিতগতিতে মাদরাসা শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। কাজটা সরকার করেছে, কাজটা বেসরকারিভাবেও করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি মাদরাসার মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। আমাদের এই ‘সোনার বাংলা’য় এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে বৈষম্যের কোনো প্রকার অভাব দেখা যাবে।

মাদরাসা শিক্ষা, বিশেষ করে কওমি মাদরাসার ব্যাপারে বদান্যতার কোনো অভাব দেখা যায় না, অথচ প্রাথমিক বা মাধ্যমিক স্কুল খোলার জন্য টাকা চাইলে পাওয়া যায় না। এ রকম দৃষ্টান্ত যথেষ্ট আছে। কারণ এই যে, মাদরাসা শিক্ষাকে উৎসাহিত করলে একদিকে যেমন পুণ্য সঞ্চয় হবে ও সামগ্রিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে তেমনি গরিব মানুষের শান্ত, সন্তুষ্ট এবং প্রতিযোগিতার বলয়ে প্রবেশ থেকে বিরত রাখা সম্ভব হবে। তা ছাড়া মাদরাসা শিক্ষার ভেতরে বাণিজ্যিক সুবিধাও রয়েছে। বই ও গাইড বই থেকে শুরু করে চাঁদা সংগ্রহ, সরকারি অনুদানের অপব্যবহার সবকিছুই চলে। শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্যের আরেকটি ক্ষেত্র রয়েছে প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই যে আসল বিশ্ববিদ্যালয় তা নিয়ে কোনো তর্কই নেই। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় চলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণেই। প্রথম কথা, প্রয়োজনের তুলনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অল্প। এর সংখ্যা বৃদ্ধি করা অত্যাবশ্যক। সেখানে ভর্তি হতে ব্যর্থ হয়েই ছেলেমেয়েরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ছোটে। দ্বিতীয় সত্য এই যে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আগমন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই, তা তারা খণ্ডকালীন, পূর্ণকালীন, ছুটি নিয়ে আসা যে ধরনের নিয়োগই পান না কেন। যখনই যে সরকার ক্ষমতায় আসে তারাই যুগোপযোগী শিক্ষার বিষয়ে কথা বলে। কিন্তু যুগোপযোগী শিক্ষার বিষয়টি নিয়ে যথাযথ অর্থে কাজের কাজ কি আশানুরূপ হয়েছে? দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে এখনো ব্যাপক বিভাজন স্পষ্ট। এই বিভাজন দূর করতে না পারলে অগ্রগতির পথ মসৃণ করা যাবে না।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিকই বটে। হাতে গোনা কয়েকটি বাদ দিলে অধিকাংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদান, পাঠ্যসূচি ও পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয় বলতে যে ধরনের পরিপূর্ণ ব্যবস্থা থাকা চাই, সে ধরনের গ্রন্থাগার, ল্যাবরেটরি, যাতায়াত সুবিধা, স্থানের প্রশস্ততা কোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষেই তার আয়োজন করা সম্ভব নয়। দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা গত দু’দশকে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। এক্ষেত্রে বাণিজ্যিক চিন্তাটাই মূলত প্রাধান্য পেয়েছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় মানেই খারাপ, আর প্রাইভেট মানেই ভালো- এ ধারণা এ ক্ষেত্রে চলে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীদের তুলনায় অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করছে- এটাও কিন্তু বৈষম্যেরই ফল। ঢাকায় যাদের থাকার মতো বাসা আছে, অর্থনৈতিকভাবে তারা আবাসিক ছাত্রদের তুলনায় সচ্ছল। আবাসিক ছাত্ররা নানা রকম অসুবিধায় থাকে। খাদ্যের মান নিম্ন, বসবাসের জায়গায় ঠাসাঠাসি, নিরুপদ্রবে পড়াশোনার সুযোগ অপেক্ষাকৃত সীমিত- এসব তো আছেই, খরচ চালানোর জন্য কাউকে কাউকে গৃহশিক্ষকতাও করতে হয়। আবার টাকাও খরচ করতে হয় হিসাব করে। দৃষ্টান্ত আরও দেওয়া যাবে, তালিকা দীর্ঘ হবে। দায়িত্বশীলদের এসবই জানা। তারপরও সমস্যার সমধান হয় না। এসব অসুবিধা থেকে অনাবাসিকরা তুলনামূলকভাবে মুক্ত।

শিক্ষার ক্ষেত্রে যে অনগ্রসরতা, এর কারণ সমাজের ভেতরেই রয়েছে। সেখানে যে বৈষম্য ও বিভাজন বিদ্যমান, শিক্ষার ব্যাপারেও তারই প্রতিফলন ও প্রতিক্রিয়া দেখতে পাই। আরও আছে রাজনীতি। কোনো কিছুই রাজনীতির বাইরে নয়। আমরা তুমুল রাজনৈতিক আন্দোলন করেছি, দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু সমাজ বদলায়নি এবং সমাজের পাহারাদার যে রাষ্ট্র সেও আগের মতোই মানুষের পশ্চাৎপদতাকে উৎসাহিত করে এবং চায় সমাজের শ্রেণিবিভাজন আরও গভীর হোক, যাতে শাসকশ্রেণির পক্ষে রাষ্ট্রক্ষমতাকে নিজেদের পক্ষে রাখা সহজ হয়। শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার চাই, কিন্তু তার জন্য জরুরি হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রে মৌলিক পরিবর্তন আনা, যাতে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়। যে গণতন্ত্রের ভিত্তিই হচ্ছে মানুষে মানুষে অধিকার ও সুযোগের সাম্য গড়ে তোলা। এই অধিকার ও সাম্য প্রতিষ্ঠার কথা হয়েছে অনেক। রাজনীতিক, রাষ্ট্র পরিচালক অর্থাৎ দায়িত্বশীল সবাই এ ব্যাপারে এ যাবৎ এসব নিয়ে কথা কম বলেননি। কিন্তু তাদের পক্ষে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে কাজ করা সম্ভব হয়নি কিংবা হচ্ছে না বিধায়ই অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। – লেখক : শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক

শিক্ষা বার্তা-আ.আ.হ/মৃধা

একই ধরনের আরও সংবাদ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.