অধিকার ও সত্যের পক্ষে

শিক্ষামন্ত্রীর কাছে পুরনো প্রত্যাশা নতুন করে

 মো. শরীফ হাসান ||

রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ সম্প্রতি নতুন মন্ত্রিসভার ৪৭ জন সদস্যকে নিয়োগ দিয়েছেন, যেখানে ডা. দীপু মনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এই সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জনস্বাস্থ্য ও আইন শাখায়ও অনেক বছরের পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। এছাড়া, শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গা থেকে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। আমরা সাধারণ নাগরিকেরা গভীরভাবে প্রত্যাশা করি ডা. দীপু মনি তার ওপর আরোপিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে সক্ষম হবেন।
তিনি এমন একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন যেখানে বিগত ১০ বছরে সাফল্যের পাশাপাশি নানা বিতর্কও ছিল, এজন্য তাকে বিপুল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এবং তার প্রতি প্রত্যাশা থাকবে যেন তিনি এই সেক্টরের বর্তমান চাহিদাগুলো মাথায় রেখে কাজটি সুসম্পন্ন করতে পারেন।

ডা. দীপু মনি তার নিয়োগ পরবর্তী প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তিনি সচেষ্ট হবেন এবং সেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করাকে তার প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, বিগত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার দেশের গ্রামাঞ্চলে শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক প্রসার ঘটিয়েছে।

ডা. দীপু মনির পূর্ববর্তী শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বিনামূল্যে বই বিতরণ কর্মসূচি থেকে শুরু করে শ্রেণিকক্ষে আইসিটি ব্যবহারের সূচনা, শিক্ষাকে সরকারের প্রধান নীতি হিসেবে গ্রহণ করার জন্য ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট অব স্ট্যাটিসটিক্স-এর তথ্যানুযায়ী, যেখানে২০০৭ সালে বাংলাদেশের সাক্ষরতার হার ছিল ৪৬.৬ শতাংশ সেটি পরবর্তীতে ২১০৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে  ৭২.৭৬ শতাংশ।নিকট ভবিষ্যতে এই গ্রাফটির আরও উন্নতি হবে বলে আশা করা যায়। আওয়ামী লীগ সরকার সফলভাবে দেশে গণশিক্ষা সেবা বৃদ্ধিতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে, কিন্তু সব ক্ষেত্রে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে আরও অগ্রগামী হওয়া উচিত।

নতুন শিক্ষামন্ত্রীর জন্য প্রশ্নফাঁস একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয় এবং দেশে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে এর সমাধান করা হলো পূর্বশর্ত। তথ্য ও প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে অধিক বিনিয়োগের ফলে নিত্যনতুন প্রযুক্তি প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করার কাজে ব্যবহার করলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনলাইনে প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়।

ইতোমধ্যে, এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফয়েল পেপারে সরবরাহ করা ও একাধিক সেট প্রশ্নপত্র রাখা হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এক. ফয়েল পেপারে মোড়ানো প্রশ্নপত্র খুললে হাতের ছাপ স্পষ্ট থাকবে, যা পরবর্তীতে শনাক্ত করতে সুবিধা হবে।

দুই. পরীক্ষা শুরুর আধঘণ্টা আগে কোন সেট প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হবে সেটা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে জানানো হবে। প্রশ্নফাঁস রোধে এই দুটি পদক্ষেপ কার্যকর হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

আমার মতে, শিক্ষাকে জ্ঞানার্জন ও নিজেকে আলোকিত করার উপায় না ভেবে পণ্য ভাবায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল কারণ। শিক্ষা ব্যবস্থায় মানসম্মত শিক্ষার পরিবর্তে নম্বরকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ায় শিক্ষার্থী ও পিতামাতারা প্রাইভেট কোচিংকে স্কুলের সরাসরি বিকল্প হিসেবে ভাবতে শুরু করেছেন এবং দুর্নীতির মাধ্যমে স্কুলে ভর্তি ও ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে পরীক্ষায় তথাকথিত ভালো ফলাফল অর্জনের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। এমনকি দুর্নীতির মাধ্যমে স্কুলে ভর্তি ও ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে পরীক্ষায় তথাকথিত ভালো ফলাফল অর্জনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এ কারণে বিগত বছরগুলোতে শিক্ষাবিদরা বারবার বলে আসছেন, এই পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা পদ্ধতির কারণেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এই শোচনীয় পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে এই জন্য, শুধু শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধিতে নেতৃত্ব দেওয়াই  ডা. দীপু মনির জন্য চ্যালেঞ্জ নয়, বরং শিক্ষাগ্রহণের ফলাফল কী হওয়া উচিত এবং এটিকে কেমন মূল্য দেওয়া উচিত এ সম্পর্কিত পরিবর্তনশীল ধারণাসমূহ তাকে আমলে নিতে হবে। বাংলাদেশের অনেকের মতো আমিও কঠোরভাবে  বিশ্বাস করি অষ্টম শ্রেণির নিচের শিক্ষার্থীদের কোনও মান নির্ণায়ক পরীক্ষা থাকা উচিত নয়, যা বিগত বছরের প্রশ্নপত্র মুখস্থ করার প্রবণতা বৃদ্ধি করছে। তবে আমি জানি অন্ততপক্ষে অদূর ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রত্যাশা করা অবাস্তব।

সরকার ২০১৮ সালে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় শতভাগ প্রান্তিক যোগ্যতাভিত্তিক পরীক্ষা চালু করার মতো সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ায় প্রত্যাশা করা যায়  যে ডা. দীপু মনি তার সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এই সংস্কারকে গুরুত্ব দেবেন। উল্লেখ্য, এতদিন যে প্রশ্নপত্র হতো সেটা শিখনফলের ওপর ভিত্তি করে হতো না, বিক্ষিপ্ত হতো।

শিক্ষামন্ত্রীকে শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট অর্জনে কাজ করতে হবে। শিক্ষাবিদরা জিডিপিতে শিক্ষাখাতে ছয় শতাংশ বরাদ্দ করতে সুপারিশ করেছেন; বিগত পনেরো বছরে এই অনুপাত ২ শতাংশের কাছাকাছি ছিল,  যা অনেক এশীয় দেশের তুলনায় অনেক কম। যদিও আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের বিগত বছরগুলোতে  শিক্ষাখাতে বরাদ্দ নামমাত্র বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বৃদ্ধির হার অনুযায়ী অর্থের বরাদ্দ পুরো সেক্টরের বৃদ্ধির কারণে অথবা মুদ্রাস্ফীতিজনিত চাপের কারণে যথাযথ অনুপাতে বৃদ্ধি পায়নি। আরেকটি প্রধান ভাবনার বিষয় হলো শিক্ষাখাতে বরাদ্দের একটি বড় অংশ অনুন্নয়নমূলক    কাজে খরচ হচ্ছে। শিক্ষকদের জন্য অধিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও মানসম্মত শিক্ষাসেবা নিশ্চিত করতে হলে এই খাতে বরাদ্দের অনুপাত আরও বাড়াতে হবে। তাই আমরা প্রত্যাশা করি যে শিক্ষামন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ের সহকর্মীদের সম্মত করে প্রধানমন্ত্রীকে এই সমস্যাটি অধিক গুরুত্বসহকারে পর্যবেক্ষণ ও শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করতে অধিক পরিমাণে সরাসরি তহবিল বৃদ্ধি করার জন্য গুরুত্ব আরোপ করবেন।

ডা. দীপু মনির সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ আছে যেগুলো মোকাবিলা করা তার একার পক্ষে সম্ভব না। তবে তার একাডেমিক ক্রেডেনশিয়ালসের কারণে আমি অকপটে বিশ্বাস করি, তিনি দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সামান্য হলেও পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবেন। সাধারণ রাজনীতিবিদদের চেয়ে তার প্রতি প্রত্যাশা অধিক।

আমার মতে, তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন এবং আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখিত সব পর্যায়ে শিক্ষার মান বৃদ্ধি করতে চাইলে শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার আনা হবে তার প্রধান দায়িত্ব। মানসম্মত শিক্ষার জন্য বিনিয়োগ ও সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন হলেই কেবল টেকসই, ন্যায়সঙ্গত ও মানবসম্পদভিত্তিক উন্নয়ন সম্ভব।

লেখক: শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

সূত্র : বাংলা ট্রিব্রিউন ।

একই ধরনের আরও সংবাদ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.