অধিকার ও সত্যের পক্ষে

অনলাইন স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষার্থী

 তাওহীদুল ইসলাম ইমন:

আমার অনলাইন স্কুলের জন্য যখন প্রথম ক্লাস ভিডিও করা শুরু করি তখন আমার ক্লাস নিতে হত হলের ৬ তালার ছাদে। বোর্ড,বোর্ডের স্ট্যান্ড,ক্যামেরা,ত্রিপদ স্ট্যান্ড,বই সবগুলি একবারে ৬ তালার ছাদে উঠানো যেত না, দুইবারে উঠাতে হত। নামার ক্ষেত্রেও একই। উঠতে নামতে গিয়ে পুরাই হাঁপিয়ে উঠতাম। তার উপর ছাদে ফ্যান তো নেই, বরং তীব্র রোদের মধ্যে আমার ক্লাস নিতে হত। বেশি ঘেমে গেলেও সেটা কিচ্ছু করার থাকে না কারণ ঐদিক দিয়ে ভিডিও চলে। একটা বোতলে করে ছাদে নিয়ে যাওয়া পানির বোতলটাও গরম হয়ে উঠত। তারপরেও ক্লাস নিতাম। কারণ মেডিকেলে পড়ে যেটা বুঝলাম সেটা হল এখানে সময় হল সর্পমণির থেকেও দুর্লভ। সময় খুব সীমিত,তাই অন্য কোন কাজে,বিশ্রাম নেওয়ায় সময় নষ্ট করাটা হবে বোকামি। টাকা ধার করে কিনে আনা ক্যামেরাটাকে একটি গামছা দিয়ে ঢেকে নিতাম শুধুমাত্র লেন্স টাকে সামনে খোলা রেখে, এই ভয়ে যে এই তীব্র রোদে ক্যামেরাটাই আবার নষ্ট হয়ে বসে কিনা। ঝড়,বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে বোর্ড,স্ট্যান্ড সব নিয়ে দৌড়ে ৫ তলায় এসে অপেক্ষা করতাম। যাই হোক ক্যামেরার টাকাটা ধার নিয়েছিলাম আমার এক ম্যাডামের কাছ থেকে। আর কম্পিউটার টা হচ্ছে আমার ভাইয়ের, যার কাছ থেকে কম্পিউটার টা কয়েকদিনের জন্য চেয়ে নিয়েছি। প্রধান সমস্যা হচ্ছে আমি কম্পিউটার চালাতে জানি না এত বেশি। শুধু অন অফটা শিখেছিলাম ছোটবেলায় তারপর আর কোনদিন শেখার প্রয়োজন পড়ে নি। কিন্তু আমার যে শিখতে হবে। এই রোদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামে ভিজতে ভিজতে দুপুরের ঘুম বাদ দিয়ে দুই তিন ঘন্টা করে হলেও ক্লাস নিতে হবে। কয়েকদিন আগে বাড়ি থেকে ঢাকা ফেরার সময় আমার স্টুডেন্টগুলা মোটামুটি কান্নার স্বরে বলছিল, “ভাই আপনি চলে যাচ্ছেন। আর কার কাছে পড়ব? কারো কাছে পড়া বুঝি না। ভাই আর দুইটা দিন যদি থাকতেন তাহলে সুবিধে হত।”

আমি ছুটিতে ঢাকা থেকে বাড়িতে কয়েকদিনের জন্য গেলেই স্টুডেন্টরা এসে বসে থাকে,বলে “ভাই পড়তে আসছি।এইটা বুঝাইয়া দেন,ঐটা বুঝাইয়া দেন।” আমার অনিচ্ছা থাকলেও পড়াতে হয়। উপজেলা লেভেলে সায়েন্সের এত ভাল টিচার পাওয়া যায় না। এক দুইজন ভাল টিচার থাকলেও সব স্টুডেন্টরাই উনাদের কাছে ভীড় করে বলে শেষমেষে পিছিয়ে পড়াদের আর সামনে উঠে আসাটা হয় না। যখন একজন ভাল স্টুডেন্ট পেরে যায় তখন স্যার পরবর্তী ম্যাথে চলে যান। পিছিয়ে পড়ারা পিছনেই চুপ হয়ে থাকে। দিন দিন তাদের মাঝে প্রশ্ন জমতে থাকে,এগুলো দিন দিন ভারী হয়ে উঠে। কারো কাছে সমাধান না পেয়ে আবার ভেবে বসে এগুলোতে বোঝার কিছু নেই,মুখস্তই করতে হয়। পড়ার প্রতি দিন দিন আগ্রহ কমতে থাকে। শুধু তাই না কোন কোন শহরে কোচিং বাণিজ্য গড়ে উঠে। “হা হা বাবাজী,এই কোচিং এ এই পড়ানো হয়,সেই পড়ানো হয়,এইখানে পড়লে ১০০ পার্সেন্ট জিপিএ ৫ নিশ্চিত।” বাবা মারা হন্যে হয়ে ছুটে কোচিং এর পেছন পেছন। জিপিএ ৫ নিশ্চিত। আরে তাহলে তো আর কথাই নেই। মধ্যবিত্ত পরিবারের গার্ডিয়ানেরা জমিজামা বিক্রি করে হলেও ছেলেমেয়েদেরকে এই কোচিং এ ভর্তি করায়। মৃদু হাসছেন আর ভাবছেন কোচিং এ ভর্তি করানোর জন্যে জমি বিক্রি?? হা হা হা। আসলে হিসেবটা হল শহরে দুই রুমের বাসা ভাড়া ২০ হাজার,খাবার বাবদ খরচ ৫-৬ হাজার, ছেলেকে বাসায় দুইজন এসে পড়ায় তাদের প্রত্যেকে নেয় ১০ হাজার করে আর ঐ যে কোচিং টার কথা বলেছিলাম সেই কোচিং টা নেয় অগ্রিম ১০ হাজার। হিসেবটুকু আপাতত এই। অগ্রিম টাকা নেওয়ার পর এখন আর কোচিং ওয়ালারা বাবাজী ডাকে না,গার্ডিয়ানরা গেলে বসার জন্য চেয়ারটা এগিয়ে দেয় না,পরীক্ষায় কেন খারাপ করল এটা জিজ্ঞাসা করলে বলে, “আপনার ছেলে বাসায় পড়ে না, কি করব বলুন?” তারপর শহরে এক নতুন টিচারের আগমন ঘটে। আগুন্তক,খুব ভাল বোঝান। সপ্তাহে ২ দিন। মাসে ৮ দিন,টাকা ১০০০.. সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কিসের কোচিং,কিসের স্পেশাল মাস্টার। বাসায় ছেলে মেয়ে ফিরলে বাবা মা জিজ্ঞেস করে, কি রে এখন কেমন বুঝিস? ছেলে মেয়ে উত্তর দেয়, “এখন তো কিছুটা বুঝি।” কিন্তু… কিন্তু কি? কিন্তু সমস্যা হল স্যার স্লো পড়ান,ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়ান। ক্লাস নাইন টেনের দুবছরেই পড়তে হবে তার কাছে। আরে এক মাস আগেই সিলেবাসটা শেষ করে দিলে ঐ মাসের টাকা যে আর পাওয়া হবে না।

ট্রেনটা ঝক ঝক ঝক চলছেই চলছেই। কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে গান শুনছি আর চিন্তা করছি এই অবস্থাটার কি কোন পরিবর্তন করা যাবে না?? আচ্ছা মেডিকেল,ভার্সিটিতে পড়া স্টুডেন্টগুলা প্রাইভেট পড়ে না কেন? না পড়ার কারণ হল ইউটিউবে এইসব অসংখ্য টিউটোরিয়াল পাওয়া যায়। একেবারে হাতে কলমে শেখানো হয়। বোর্ডে বোঝানো থেকে শুরু করে এনিমেশন পর্যন্ত সবই পেয়ে যাবেন। হার্ভাড,স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ক্লাস খুঁজলেও আপনি পেয়ে যেতে পারেন। এই কারণে ভার্সিটি পড়ুয়া স্টুডেন্টদের প্রাইভেট পড়তে হয় না। ভাবলাম একটা ইউটিউব চ্যানেল খুলে বসলে কেমন হয় যেখানে আমি আমার ক্লাস গুলো ভিডিও করে আপলোড দিব আর আমার স্টুডেন্টরা যেকোন জায়গাতেই বসে আমার ভিডিও দেখতে পারবে। তাও সেটা ফ্রিতে,এই টিউটোরিয়ালের জন্য আমাকে তাদের কোন পেমেন্ট দিতে হবে না। সেই চিন্তা থেকেই অনলাইন স্কুল খোলার চিন্তা ভাবনা। ক্যামেরা, কম্পিউটার কোনভাবে মিলাতে পেরে ক্লাস নেওয়া শুরু করে দিলাম। শুরুর দিকে ক্লাস গুলো নিতে খুব কষ্ট হত। কারণ ছাদে আসা যাওয়া করতে হত। শুক্রবারে এমনও হত ৪-৫ ঘন্টা টানা দাঁড়িয়ে ক্লাস নিতাম। এক দেড় মাস ক্লাস নেওয়ার পর রুমমেট দের কোনভাবে মেনেজ করে রুমে ক্লাস নেওয়া শুরু করলাম। সেইজন্য রুমমেটদের (ফাহিম,রাশিদ) কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। ওরা যখন ঘুমাত তখন আমি ক্লাস নিতাম। ওদের ঘুমের সমস্যা হলেও ওরা কিছু বলত না। এক ফ্রেন্ড পিকনের সহায়তায় কম্পিউটারে ভিডিও ইডিটিং শিখলাম,পাওয়ার পয়েন্টের কাজ শিখলাম দুই তিন দিনের ভেতরেই। আর এই দুই তিন মাসের মধ্যে মোটামুটি ২০০ ভিডিও নিয়ে দাঁড় করিয়ে ফেললাম আমার অনলাইন স্কুলটুকু। (Quick Online School) আমি সায়েন্সের সাব্জেক্টগুলোর ভিডিও বানাই। ক্লাস ৮ এর বিজ্ঞান,ক্লাস ৯-১০ এর ফিজিক্স,কেমেস্ট্রি,বায়োলজির উপর অনেকগুলো আপ্লোড দেওয়া হয়েছে। সামনে ইন্টারের বায়োলজি নিয়ে ভিডিও বানানোর প্ল্যানিং আছে। ক্লাস গুলো এমনভাবে নেওয়া হয়েছে যেন স্টুডেন্টদের আর প্রাইভেট না পড়তে হয়। আমাকে অনেকেই জিজ্ঞাসা করে, তুই এত কষ্ট করিস,গাধার মত খেটে টিউটোরিয়াল বানাস,টাকাটুকাও তো পাস না,তাইলে তুই কি পাস?” আমি জানি না আমি কি পাই। কিন্তু দিনশেষে যখন অপরিচিত কেউ হঠাৎ ফোন দিয়ে বলে, “ভাইয়া আমি আপনার অনলাইন স্টুডেন্ট। আপনার টিউটোরিয়াল অনেক ভাল। আপনি আমায় বাঁচালেন ভাই।” এই কথাগুলোতেই আমি সব কষ্ট ভুলে যাই। দিনশেষে এই কয়েকটা স্টুডেন্টএর হাসিই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে,অনুপ্রেরণা দেয়।

আসলে মানুষের কল্পনাটাকে বাস্তবে আনতে গেলে কতটুকু কষ্ট করতে হয়,কতটুকু খাটতে হয় সেটা এই অনলাইন স্কুলের স্বপ্নটাকে বাস্তবে আনতে গিয়ে আরেকবার বুঝলাম। স্বপ্নকে বাস্তবে আনতে গেলে বলব শুধু লেগে থাক,হাল ছাড়া চলবে না। আর নিজের মধ্যে কনফিডেন্স থাকলে কাজ শুরু করে দাও,মানুষের উপহাসকে বুড়ো আঙুল দেখাতে শিখ। স্কুল খোলার প্রথম দিকে অনেকেই বলেছিল,” এসব ভিডিও কে দেখবে?” যাই হোক এই কথাটাকে বুড়ো আঙুল দেখাতে পেরেছিলাম বলেই আজ অনেকেই আমার ভিডিও দেখে। নাহলে দেখত না। আমার অনলাইন স্কুলের ভিডিও দেখার জন্য youtube এ সার্চ দিন” Quick Online School” প্রথমেই আমার স্কুল পাবেন। তারপর channel টিকে Subscribe করে পাশের Bell icon a click করে দিন যাতে পরবর্তীতে কোন ভিডিও আপলোড দিলেই নোটিফিকেশন পেয়ে যাবেন। চাপ্টারওয়াইজ ভিডিও দেখার জন্য playlist এ চলে যান। চাপ্টার খুঁজে বের করে সিরিয়াল অনুযায়ী সাজানো টপিকের ভিডিও দেখতে থাকেন। ধার করা কম্পিউটার কিংবা ক্যামেরা এগুলো কিছুতেই আমায় অভাববোধ দেয় না। আমি মনে করি তীব্র ইচ্ছা থাকলে পৃথিবীতে বস্তুগত অভাবের দরুণ কোন কাজ আটকে থাকে না। বরং এই অভাবটাই আমার অহংকারের কারণ। আশেপাশে খুঁজলেই অনেকেই আছে, ঢাকায় ফ্ল্যাটের অভাব নেই,গাড়িতে আসা যাওয়া করে। কই তাদের তো দেখি না এইরকম স্টুডেন্টদের নিয়ে চিন্তা করতে,মানুষের জন্য কিছু করতে। সময় শেষের দিকে, কম্পিউটারটা ফেরত দিতে হবে, যেই ভিডিওগুলো স্টোর ছিল সেগুলো আপলোড দিয়ে দিচ্ছি তাড়াতাড়ি। কম্পিউটারের ব্যাপারটা পরে ভেবে দেখা যাবে। অনেক রাত হয়েছে, নিজের পড়া কমপ্লিট করে, আগামীকালের জন্য লেকচার রেডি করছি। এক স্টুডেন্ট রিকোয়েস্ট করেছিল “জীবাশ্ম জ্বালানি ” চাপ্টারের উপর ক্লাস আপলোড দিতে। ডাক্তার হয়ে গেলে বুঝি রোগীদের নিয়েও এভাবেই ভাবতে হবে।

তাওহীদুল ইসলাম ইমন, এমবিবিএস(২য় বর্ষ), স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, ঢাকা ।

 প্রতিষ্ঠাতা-কুইক অনলাইন স্কুল ।

 

 

একই ধরনের আরও সংবাদ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.