অধিকার ও সত্যের পক্ষে

এক বছরে শিক্ষা উপকরণের দাম বেড়েছে ২৫%

 আয়নাল হোসেন ও সাইফ সুজন ||

শিক্ষা ব্যয় কমিয়ে আনতে অবৈতনিক শিক্ষা, বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক ও উপবৃত্তি প্রদানসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তার পরও কমছে না শিক্ষা ব্যয়। লাগামহীনভাবে শিক্ষা উপকরণের দাম বৃদ্ধিকে এক্ষেত্রে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকেই। গত এক বছরে সব ধরনের শিক্ষা উপকরণের দাম বেড়েছে গড়ে ২৫ শতাংশ।

একজন শিক্ষার্থীর পেছনে ব্যক্তি খাতে ব্যয়িত অর্থের বড় একটি অংশই খরচ হয় খাতা-কলম ও স্কুল ড্রেস, সহায়ক বইসহ আনুষঙ্গিক শিক্ষা উপকরণ ক্রয়ে। কয়েক বছর ধরে দেশে এসব উপকরণের দাম বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে কাগজের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। গত নয় মাসে ধরনভেদে কাগজের দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশ। কলমের দাম বেড়েছে ১৫ শতাংশ। আর শিক্ষার্থীদের পোশাকের কাপড় ২০ ও পোশাক তৈরির খরচ বেড়েছে ২০ শতাংশ। সব মিলিয়ে শিক্ষা উপকরণের দাম বেড়েছে গড়ে ২৫ শতাংশ।

শিক্ষা উপকরণের অস্বাভাবিক দাম বাড়ায় আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছেন না নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ। ফলে পড়ালেখার খরচের চাপে একসময় ঝরে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধূরী বণিক বার্তাকে বলেন, মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে কাগজ, খাতা-কলম ও স্কুল ড্রেসের ক্রয়মূল্যসহ শিক্ষা উপকরণ বাবদ অভিভাবকের ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে অভিভাবকের পক্ষ থেকে পড়ালেখার খরচ বহনে অসমর্থতা। শিক্ষা ব্যয় নির্বাহ করতে না পারায় প্রতি বছরই কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। এর ফলে আমরা ঝরে পড়া রোধের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছি না।

রাজধানীর বাবুবাজার-জিন্দাবাজার এলাকার পাইকারি কাগজ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক মাস আগে বসুন্ধরা পেপার মিলে তৈরি প্রতি টন কাগজের দাম ছিল ৬৮ থেকে ৭০ হাজার টাকা, যা বর্তমানে ৯৭-৯৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সে হিসাবে এক বছরেরও কম সময়ে বসুন্ধরা কাগজের দাম বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। একইভাবে মেঘনা গ্রুপের তৈরি ফ্রেশ কাগজের দাম আগে প্রতি টন ৬৮-৭০ হাজার টাকা থাকলেও এখন তা ৯৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে, দাম বেড়েছে ৩৪ শতাংশ। আর পারটেক্স কোম্পানির তৈরি প্রতি টন কাগজ ৮২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ দাম বেড়েছে ২২ শতাংশ। এর বাইরে ৩৪-৩৫ হাজার টাকার কাটিং পেপার ৫১-৫২ হাজার টাকা, ৩৪-৩৫ হাজার টাকার নিউজপ্রিন্ট কাগজ এখন ৪৭-৪৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে বাজারে। আমদানি করা ৭১-৭২ হাজার টাকার কাগজের টন এখন ৮৮ হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছে।

কাগজ আমদানিকারকরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে কাগজ ও পাল্পের দাম অনেকটা বেড়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় কাগজের দামও দফায় দফায় বেড়েছে। আগে প্রতি টন পাল্প আমদানির বুকিং দর ছিল ৪৫০ মার্কিন ডলার। বর্তমানে এটি ৭০০ ডলারে পৌঁছেছে।

এ বিষয়ে পুরান ঢাকার বাবুবাজারের কাগজ ব্যবসায়ী ও মেসার্স জেনারেল স্টেশনারির স্বত্বাধিকারী লোকমান হোসেন বলেন, আট-নয় মাস আগে যে কাগজের রিম ছিল ৭০০-৮০০ টাকা, বর্তমানে তা ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর যে কাগজের রিম ১ হাজার টাকা ছিল, সেটি এখন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। অস্বাভাবিক দাম বাড়ার পেছনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সিন্ডিকেটকে দায়ী করেন তিনি।

পাইকারি বাজারে কাগজের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারেও। নীলক্ষেত, পল্টন, ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার এলাকার বিভিন্ন স্টেশনারি দোকান ঘুরে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কাগজ, খাতা ও গাইড বই। কাগজ-কলমের পাশাপাশি অঙ্কনের কাজে ব্যবহূত আর্ট পেপার ও কালার পেনসিলের দামও ঊর্ধ্বমুখী। খুচরা বাজারে ১২০ পৃষ্ঠার আর্ট পেপারের দাম কিছুদিন আগেও ছিল ৯০-১০০ টাকা। বর্তমানে তা ১৩০-১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ২৬০ টাকার কালার পেনসিল ৩২০ টাকা এবং ১২০ টাকার কালার পেনসিল ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

নীলক্ষেত মার্কেটের এক খুচরা ব্যবসায়ী আবুল কালাম জানান, গত নভেম্বরে হঠাৎ করেই কাগজের দাম বেড়ে যায়। এছাড়া কলমের ক্রয়মূল্যও বেড়েছে, যদিও এখনো আগের দামেই কলম বিক্রি করছেন তারা। তবে পাইকারি দাম আরো বাড়লে খুচরায় দাম বাড়াতে বাধ্য হবেন তারা। আর কাগজের দাম বাড়ার কারণে প্রকাশনাগুলো গাইড বইয়ের দামও ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে বলে জানান তিনি।

স্কুল ড্রেস তৈরির খরচও বেড়েছে ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ হারে। গত বছরও সাদা রঙের কাপড় কিনতে গজপ্রতি খরচ হতো ৬০-৬৫  টাকা। এ বছরের শুরুতে কাপড়ের দাম বেড়ে ৮০ থেকে ৮৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। সে হিসাবে দাম বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। সাদা রঙের উন্নত মানের কাপড়ের গজপ্রতি সর্বোচ্চ মূল্য ছিল ১২০ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০ টাকায়, দাম বৃদ্ধির হার ২৫ শতাংশ।

একইভাবে বেড়েছে পোশাক তৈরির খরচও। গত বছর কামিজ বানানোর খরচ পড়ত ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এ বছর তা বেড়ে হয়েছে ৩০০-৪০০ টাকা। সে হিসাবে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। আর প্যান্ট-শার্ট বানানোর সর্বোচ্চ খরচ পড়ত গড়ে ৬০০ টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা, সে হিসাবে খরচ বেড়েছে ১৭ শতাংশ।

কারওয়ান বাজারের প্রেয়সী টেইলার্সের সুমন মিয়া জানান, পাইকারি বাজারে দাম বাড়ায় আমাদেরও বেশি দামে কাপড় বিক্রি করতে হচ্ছে। আর কারিগর সংকটের কারণে মজুরি খরচও বেড়ে গেছে।

শিক্ষার্থীদের দেয়া বৃত্তির টাকার ব্যবহার কীভাবে হচ্ছে, তা জানতে দুই বছর আগে একটি জরিপ চালায় বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)। আট জেলার ৪৩টি বিদ্যালয়ের ওপর স্টুডেন্ট ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনস (এফজিডি) শীর্ষক জরিপটি চালানো হয়। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ প্রাইমারি এডুকেশন স্টাইপেন্ডস: এ কোয়ালিটেটিভ অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক ব্যানবেইসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণে একজন শিক্ষার্থীর জন্য বছরে ব্যয় হয় গড়ে ৪ হাজার ৭৮৮ টাকা। এর মধ্যে স্টেশনারি (খাতা, কলম, পেনসিল ইত্যাদি) বাবদ ব্যয় করতে হয় ১ হাজার ২৭৩ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ। এছাড়া ৪১৩ টাকা বা ৮ দশমিক ৬ শতাংশ খরচ হয় গাইড বই এবং ৫১৫ টাকা বা ১০ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যয় হয় পোশাক ক্রয় বাবদ।

একই ধরনের আরও সংবাদ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.