অধিকার ও সত্যের পক্ষে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব, বাংলাদেশ তৈরী তো?

 কাজী কাউছার হামিদ ॥

ধরুন আপনি সকাল ৬টায় ঘুম থেকে উঠবেন বলে ঠিক করলেন এবং সঠিক সময়ে কোন যন্ত্র আপনাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে দিলো। ফ্রেশ হয়ে দেখলেন আপনার জন্য চা রেডি, যে পত্রিকা পড়বেন তাও টেবিলে হাজির। সকালের নাস্তা তৈরী করার কোন ঝামেলা নেই। সময় মত এবং কোন ধরণের ত্রুটি ব্যতিত প্রস্তুত করে দিলো কেউ। তখন আপনার কেমন লাগবে?

বলছিলাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্পন্ন রোবটের কথা। নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে কাজ করে দিতে পারে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন যন্ত্রটি। আপনি যা করতে চান, সারাদিনে তা কোনরুপ বিরতি ছাড়াই করে দিতে পারবে রোবট। আপনাকে শুধুমাত্র কমান্ডটা ঠিকমত দিতে হবে। বিশ্বের বড় অনলাইন বিকিকিনির সাইট আমাজানের বড় শোরুমগুলোতে কিনতে গেলে কোনরুপ বিক্রেতার সাথে কথা বলতে হবেনা। কারণ, সেই দোকানের কর্মচারী হতে শুরু করে সবাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন রোবট। এইরকম শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ। যার ফলে গতানুগতিক দক্ষতা সম্পন্ন কর্মীরা চাকরি হারাচ্ছে এবং পোগ্রামারদের চাহিদা তৈরী হচ্ছে।

গ্লোবাল বিশ্লেষক ম্যাককিনসে বিশ্বের ৪৬টি দেশের ৮শ’ পেশা বিশ্লেষণ করে জানান ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০ কোটি কাজ চলে যাবে রোবটের হাতে। অর্থাৎ সরাসরি ৮০ কোটি লোক চাকরি হারাতে পারে। আবার একজন রোবট যে কাজ করতে পারবে তা স্বাভাবিক ভাবেই ৩ জন মানুষের দ্বারাও হয়তো সম্ভব নয়। ১টি উদারণের মাধ্যমে বলা যায়, বাংলাদেশের ১টি গার্মেন্টস ফ্যক্টরিতে ৩০০০ মানুষের বদলে ১০০০টি রোবট দিয়ে কাজ করানো যাবে। মাস শেষে রোবটদের কোন বেতন, ভাতা কিংবা ছুটি দেওয়ার ঝামেলা নেই।

ম্যাককিনসের এই প্রতিবেদন অনুসারে, যেসব কাজ মানবিক সেগুলো টিকে থাকবে। যেমন- স্বাস্থ্যকর্মী, উকিল, শিক্ষক, মালি, কেয়ারটেকার। আবার এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগমনের কারণে প্রযুক্তি খাতে তৈরী হবে পোগ্রামারের চাহিদা। ২ বছর পর শুধু আমেরিকা ও ইউরোপে প্রতিবছর ২০ লক্ষ পোগ্রামারের প্রয়োজন পড়বে এবং ৬০ লক্ষ কম্পিউটার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন পড়বে। অর্থাৎ একদিকে কোটি মানুষ চাকরি হারাবে আর অন্যদিকে কোটি মানুষের চাকরির ক্ষেত্র তৈরী হবে।

এবার আসা যাক বাংলাদেশের কথায়। আমাদের দেশে প্রতিবছর ২০ লক্ষেরও অধিক মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। অধিক জনসংখ্যার কারণে এই দেশের চাকরি পাওয়াটা সোনার হরিণের সাথে তুলনা করা হয়। একদিকে আমাদের তরুণেরা চাকরি পাচ্ছে না আবার অন্য দিকে আমাদের দেশে বিদেশী শ্রমিকের সংখ্যা ১২ লক্ষ। এর প্রধান কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে চাকরির বাজেরের কোন মিল নেই। যার কারণে আমাদের প্রকৃত বেকার সংখ্যা ৪ কোটিরও অধিক। এত বড় বিরাট বেকারত্বের মধ্যে, সারা পৃথিবীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগমনের ফলে স্বাভাবিক ভাবে আমাদের দেশের জন্য আর একটি বড় অশুভ সংবাদ।

প্রথমত বলা যায়, আমাদের দেশের মানুষের প্রযুক্তির সাথে অনেকটা নতুন করেই পরিচিত হচ্ছে। ২০১০ এর পর থেকে খুবই স্বল্প আকারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি নামের বিষয় দিয়ে এর পাঠ্য চর্চা শুরু হয়। প্রথমত এই বিষয়টি এখন শিক্ষার্থীরা মুখস্থ বিদ্যার মতো করেই গেলার চেষ্টা করছে। যার ফলে সরকার যে লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগুচ্ছে তা কতখানি পুরণ হবে, তা সংশয়ে রয়েছে। আবার উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এসে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর এই বিষয়টির সাথে সম্পৃক্ততা নেই। কারণ বাংলাদেশের সবগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই বিষয়টি পড়ানো হয়না। আবার সরকারি চাকরি পাওয়ার খায়েশে কম্পিউটার প্রযুক্তিতে পড়া শিক্ষার্থী এখন বাংলা, ইংরেজি এবং সাধারণ জ্ঞান আয়ত্ত করে সোনার হরিণের স্বপ্ন দেখছে।

অথচ আগামী দিনের প্রযুক্তি বিদ্যা কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমস্যাকে সরকারের কৌশলি ভূমাকায় বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বিশ্বে প্রযুক্তির বাজারে নেতৃত্ব দেওয়া এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নেতৃত্বের অবস্থানে পৌছাতে পারে। প্রথমত বলা যায়, আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার শুরুতেই প্রযুক্তির ব্যবহারিক প্রয়োগের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় পাঠ্যপুস্তুকের মুখস্থ বিদ্যা থেকে বের করে শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক ব্যবহারিক শিক্ষা ব্যবস্থাসহ প্রযুক্তি বিষয়ক বিভিন্ন প্রতিযোগিতার অংশ নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বাদ দিয়ে আইসিটিকে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।

উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে এই শিক্ষা হতে হবে, বিশ্ব প্রতিযোগিতার সামিল হওয়ার মতো। প্রতিটি বিষয়ের স্নাতক শিক্ষার পাশাপাশি এই শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। বাংলাদেশের চাকরির বাজারের পড়াশুনায় এই বিষয়টি অনেকটাই অবহেলিত। সেইক্ষেত্রে মূল পরীক্ষার সাথে এই বিষয়টির ব্যবহারিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হলে একজন শিক্ষার্থী তার প্রয়োজনে কিংবা বাধ্য হয়ে প্রযুক্তির জ্ঞান অর্জনে বাধ্য থাকবে। যা আমাদেরকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দেশের বাজারে পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দিবে।

লেখক :শিক্ষার্থী,কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষা বার্তা-আ.আ.হ/মৃধা

একই ধরনের আরও সংবাদ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.