অধিকার ও সত্যের পক্ষে

আমাদের তারুণ্য: প্রশ্নবিদ্ধ বিবেক

 নিজস্ব প্রতিবেদক ॥

আমাদের ইতিহাস শুরু হয়েছে বহুবছর আগে থেকে আর সুনির্দিষ্টভাবে ৭১ থেকে। আমরা এখনও ইতিহাসের মধ্যে দিয়েই যাচ্ছি। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা ইতিহাস, যেমনিভাবে একাত্তরের বীর বীরাঙ্গনারা আমাদের ইতিহাস। আজ আমরা যেমন আমাদের বীরদেরকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। কারণ তারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল আমাদের মা বোনদের ইজ্জত রক্ষার জন্য। রক্ত দিয়েছিল, আর শত শত মা বোন নিজেদের ইজ্জতের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন করেছিল এই আশায়, যে যদি দেশ স্বাধীন হয় তাহলে আর কোন মা বোনকে তাদের মত ইজ্জত হারাতে হবে না। এই আশায় যে, তাদের মা বোনদের দিকে কেউ নোংরা চোখে তাকানোর থাকবে না। তখনকার সময়ে তো এত উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না, ছিল না ফেসবুক, ছিল না ইন্টারনেট, সামান্য রেডিওর ভাষণ শুনে যার যা ছিল তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল কারণ তারা বুঝেছিল তারা বের না হলে মা বোনদের ইজ্জত বাঁচানো যাবে না। তারা হচ্ছে আমাদের ইতিহাস।

আর আজ আমরাও ইতিহাসের মধ্যে দিয়েই যাচ্ছি। আমাদের যুগে আছে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, একটি বিষয় একে অন্যকে জানানোর দ্রুততম মাধ্যম। সমাজের নানা অসংগতি তুলে ধরার আকর্ষণীয় সব মাধ্যম আমাদের হাতের নাগালে। কিন্তু আমাদের আসল জিনিসটাই আমরা হারিয়ে ফেলেছি সেটা হল বিবেক। আমি ঘুমন্ত বলব না কারণ ঘুমেরও একটা সীমা থাকে। সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া বেশকিছু ঘটনা আর আমাদের জনগণ তথা তরুণদের সেটার প্রতিক্রিয়া দেখে এটাই বলতে হয়। আর এসব ঘটনার মধ্যে একটি হল ধর্ষণ।

আজ অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে আমরা যে স্বাধীন, সভ্য, শিক্ষিত, এসব ভাবতেও লজ্জা লাগে। আজ আমাদের মা বোনরা যত্রতত্র ধর্ষিত, নির্যাতিত, অপমানিত হচ্ছে আর আমরা সেটার প্রতিবাদ তো দূরে থাক বরং আচরণে বৈষম্য করছি। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই ধর্ষণের সংবাদ পড়তে হয়।রুপা, তনু, আয়েশা, হালিমা, শিশু, বৃদ্ধা, প্রতিবন্ধী, ভবঘুরে পাগল, বিধবা, বিবাহিতা, প্রবাসীর স্ত্রী, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী, স্কুল-কলেজ পড়ুয়া মেয়ে, চার সন্তানের জননী এমন কোন শ্রেণী নাই যে ধর্ষিত হচ্ছে না প্রতিনিয়ত আমার সোনার স্বাধীন দেশে। স্বাধীনতার ৪৭বছর পার করে এসেও এসব শুধু দেখতে হচ্ছে বললে ভুল হবে বরং বলা ভাল আমরা এসব স্বাভাবিকভাবেই নিচ্ছি আর নিচ্ছি বলেই ভয়ানকভাবে তা বেড়েছে। পরিসংখ্যান দেখলেই তা বুঝা যায়। আর বিচার হওয়া তো আকাশকুসুম চিন্তা,পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার জন্য একটা শ্রেণী সবসময় সমাজটাকে নাচাচ্ছে। আর বাকি সবাই শাস্তি ভোগ করছে।

আর এমতাবস্থায় আমরা তরুণ সমাজ আমাদের বিবেক হারিয়ে ফেলছি। আমাদের প্রতিবাদ করার যে টগবগে ইতিহাস আছে সেটা আমরা ভুলতে বসেছি। আমাদের সহ্যক্ষমতা অত্যধিক বেড়েছে কিন্তু খারাপ ভাবে। আমরা নিজেরাই হয়ে পড়ছি অপরাধপ্রবণ। আর হয়ে যাচ্ছি অনলাইন, ফেসবুক কেন্দ্রিক। কিছু ঘটলেই অনলাইনে প্রচার করেই দায়পাড়ি দিচ্ছি, বাস্তবে এর বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করার হিম্মতটুকুও মনে হয় আমাদের আর অবশিষ্ট নেই, যা আমাদের জন্য আত্মঘাতী। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা চরমভাবে দায়ী থাকব।

সরকার বা বিচারবিভাগকে জাগাতে হলে আমাদের তারুণ্যের শক্তি দিয়েই জাগাতে হবে। ধর্ষণের বিচারের ইতিহাস বাংলাদেশে দুঃখজনকভাবে খুবই করুণ। বেশিরভাগ ধর্ষক সমাজে কোন না কোনভাবে প্রভাবশালী তাই ধর্ষণের বিচারও দুষ্প্রাপ্য। সামগ্রিকভাবে বিশেষকরে সরকারের চেতনার, বিবেকের উদয় হওয়া দরকার। কঠোর আইন প্রণয়ন করে তার সফল বাস্তবায়ন করা দরকার। বর্তমান আইনে ধর্ষণের যে শাস্তির বিধান আছে যেমন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (২০০০)এর ধারা ৯ এ বর্ণিত শাস্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন হওয়া জরুরী। সেই সাথে এই আইনে বর্ণিত মৃত্যুদণ্ড প্রকাশ্যে বাস্তবায়ন এবং আইনে বর্ণিত বিচারের সময় সীমা ৬ মাস থেকে কমিয়ে ১ মাস করা এখন সময়ের দাবী।
আইনপ্রয়োগকারী, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা সর্বস্তরের দায়িত্বশীল যদি আইনের সত্যিকার রক্ষক হোন তাহলে সমাজ থেকে ধর্ষণ, খুনের মত এই অপরাধ গুলো দূর হবে। কিন্তু আফসোস এখন আইনের রক্ষক নিজেই ধর্ষক বনে গিয়েছে। এর দায় সরকারকে নিতে হবে।কারণ এমন আইন রক্ষাকারীকে নিয়োগ দেয়া উচিত নয় যার কাছে রাষ্ট্রের জনগণ নিরাপদ নয় কিন্তু যদি এমনটাই ঘটে তাহলে সে দায়ভার নিয়োগকর্তাদের।

সর্বোপরি আমরা যারা তরুণ তারাই পারি এসব কলঙ্ক থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে। শুধু অনলাইনে স্লোগান দিয়েই নিজের দায়পাড়ি না দিয়ে একটি বাস্তবিক আন্দোলন যা সাধারণ মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দেবে এমন কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা জাতির সেবা করতে পারি। আর এভাবেই হয়ত আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ বিবেকের অধিকারী হওয়া থেকে কিছুটা হলেও পরিত্রাণ পাব।

লেখক: শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল Shihab.coubd@gmail.com

শিক্ষা বার্তা-আ.আ.হ/মৃধা

একই ধরনের আরও সংবাদ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.