অধিকার ও সত্যের পক্ষে

বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাভাবনা ও প্রত্যাশা

 নিউজ ডেস্ক।।

পৃথিবীতে বাঙালি জাতির মুক্তির সংগ্রাম এবং বিজয়ের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান কিংবদন্তি নাম।ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখমুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ মুক্তির সংগ্রামের একটি সুপরিকল্পিত দিক নির্দেশনা এবং যা ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

মূলত এই ভাষণই আমাদের বিজয়ের পথ সুগম করে। উপস্থিত জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।” ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং স্বাধীনতাকামী মহান বাঙালি ব্যক্তিদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বাংলাদেশটির জন্ম দেয়।

অথচ স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পূর্বমুহূর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী কাপুরুষেরা ১৪ ডিসেম্বর বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করতে সর্বোচ্চ উদ্দ্যোগ গ্রহণ করে। বাংলার বুদ্ধিজীবী হত্যার নেশা তাদের পেয়ে বসে। এরপর ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিলাভ এবং স্বাধীনতার এই স্বাদগ্রহণ না করতেই দেশটির কিছু কুলাঙ্গার বিশ্বাসঘাতক ষড়যন্ত্র করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে।

বাঙালি জাতি হিসেবে এটি আমাদের নিকট অত্যন্ত লজ্জাকর! বঙ্গবন্ধুর নিকট আমরা বাঙালি জাতি হিসেবে চিরঋণী।
আমরা স্বস্তি পাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে যখন ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের ইউনেস্কোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্ট্রারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।  আমরা আরো স্বস্তি পাই একইসাথে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক এই ভাষণ যখন ‘বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্যের’ স্বীকৃতি লাভ করে।

বাংলাদেশের অসামান্য এই অর্জন শত্রুপক্ষের সবকিছুকেই নস্যাৎ করে এবং বাঙালি জাতিকে আরো একবার পৃথিবীর বুকে অহংকার ও গর্বে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। এই স্বীকৃতি বাঙালি জাতির ন্যায্য পাওনা। বাঙালি জাতি হিসেবে বিজয়ের ইতিহাসে বা স্বাধীনতালাভের ৪৬ বছরে পড়েছি আমরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজয়ী বাঙালি জাতিকে সাথে নিয়ে কেমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা প্রকৃত অর্থেই তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন শিক্ষা বা শিক্ষাগ্রহণ যদি একটি জাতির মেরুদণ্ড হয়, দেশ উন্নয়নের পূর্ব শর্ত হয়, তবে তার ধরন কীরূপ হবে তা ভাবনা জরুরি বৈকি।

এদিক থেকে বাঙালি জাতি সামগ্রিকভাবেই বঙ্গবন্ধুর নিকট ঋণী। অপরিশোধ্য এই ঋণ থেকে কখনোই পরিপূর্ণ মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।  যে বাংলাদেশের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন তার পিছনে যেসব পরিকল্পনা ছিলো তার মধ্যে শিক্ষাভাবনা অন্যতম।  আমরা যদি নিজেদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক তথা রাষ্ট্রিক জীবনে শিক্ষায় বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনা প্রকৃতপক্ষে অনুসরণ করতে পারি, তবেই হয়তো বঙ্গবন্ধুর সেই আদর্শে আদর্শায়িত হয়ে জাতীয় জীবনে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্যবিজয়ী এই দেশটির সকল প্রকার দীর্ঘস্থায়ী বিজয় আনতে শিক্ষা বিষয়ক যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তার কয়েকটি নমুনা উল্লেখ করা যেতে পারে।

প্রত্যেক স্বাধীন দেশের শিক্ষাশর্ত হলো প্রথমত সেই দেশের যুদ্ধাপরাধীর বিচার করা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সরকার একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা ও সকল পর্যায়ের বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ সাধারণ নারী-পুরুষের হত্যা ও নির্যাতনকারীর বিচার সম্পন্ন করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন এবং যুদ্ধাপরাধীর বিচার ছিলো বাঙালি জাতির নিকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

সদ্য জন্ম লাভ করা বাংলাদেশটির রাষ্ট্রভাষা চর্চা কেমন হবে তা ভেবে রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৫২ সালে মাতৃভাষার জন্য যুদ্ধ এবং ভাষায় স্বাধীনতা লাভ, পৃথিবীতে এই গৌরবময় অর্জন আর কোনো জাতির নেই।  বঙ্গবন্ধু নতুন বাংলাদেশের সংবিধানে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছিলেন। বর্তমানেও সরকারি নির্দেশ অনুসারে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রয়োগের আদেশ জারি করা আছে।  এই সরকারি আদেশ সুদৃঢ় এবং বাস্তবায়ন করা ছিলো অপরিহার্য।  এরপর বঙ্গবন্ধুর নীতিতে শিশুভাবনা ও সুনাগরিক গঠন ছিলো বিজয়ী বাংলাদেশের অন্যতম শর্ত। তাঁর দর্শনের মধ্যে অন্যতম ছিলো শিশুশ্রম বন্ধ করা।
আর শিক্ষা গ্রহণের অধিকার থেকে বাদ যাবে না একটিও শিশু।

বিজয়ী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও সুগঠিত নাগরিক পেতে সকল প্রকার মাদককে শুধু ‘না’ বলা নয়, সেখানে মাদকের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য আইন প্রণয়ন ও তা যথাযথ প্রয়োগ করা। পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে প্রত্যেক সন্তানকে সুশিক্ষা দান করা। শারীরিক, নৈতিক ও আদর্শ ধর্মীয় শিক্ষাসহ নানামুখি সহশিক্ষা অনুশীলন করাটা ছিলো বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাভাবনার অংশ। পাশাপাশি সন্তানের জীবনে যতোটুকু নিরাপত্তা প্রয়োজন তা নিশ্চিত করা।  বিজয়ী বাংলাদেশে শিশুর বিজ্ঞানভিত্তিক মানসিকতা গড়ে তোলাটাও ছিলো শিক্ষাভাবনার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়।

শিক্ষার্থীকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে বন্ধুসুলভ দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার প্রস্তুতি ছিলো দৃঢ় প্রত্যয়।  বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় ছিলো পর্যায়ক্রমে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাতে শিক্ষা আদান-প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া। দেশপ্রেমিক মেধাবীদেরকে সেসব ক্ষেত্রে নিয়োগের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। প্রতিটি অফিস-আদালত বা সকল শ্রেণীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রত্যেক স্তরের পেশাজীবীর নির্দিষ্ট সময়ান্তে তার ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া।  বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞ, সুগঠিত ও দক্ষ জনসম্পদকে জাতীয় উন্নতিতে সম্পৃক্ত করা।

উচ্চশিক্ষা তথা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা পর্যন্ত যে শিক্ষানীতি প্রচলিত আছে, নির্দিষ্ট সময়ান্তে এর ব্যবহারিক দিক পর্যালোচনা করা।  গবেষণা, শিক্ষাগবেষণা, প্রশিক্ষণ বা উচ্চ শিক্ষার্থে দেশে-বিদেশে শিক্ষাগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা। দূরদর্শী রাষ্ট্রিক ভাবনাকে বিবেচনায় এনে বর্তমান শিক্ষানীতিতে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে স্বাধীনতা পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর ‘কুদরত-ই-ক্ষুদা’ শিক্ষা কমিশন কর্তৃক প্রণয়নকৃত সুপারিশ বাস্তবায়ন করা।

ধর্মনিরপেক্ষ এই রাষ্ট্রে যে সন্তান যে ধর্মেরই হোক না কেন, স্ব স্ব ধর্ম পালন বিষয়ে সুশিক্ষা দান করা।  সর্বোপরি শিশুর নিকট আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতির গৌরবের ইতিহাস উপস্থাপনে সকল পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আন্তরিক ভাবে এগিয়ে আসা।

প্রত্যেকেই সচেতন থাকা যেন ভবিষ্যতের বাংলাদেশে উগ্র, জঙ্গি,জনবিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত, পশুবৃত্তিক জনগোষ্ঠী গড়ে না ওঠে।
বঙ্গবন্ধুর নিকট অনানুষ্ঠানিক অথচ সমান গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ভাবনাও ছিলো। যেমন সদ্য বিজয়ী বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির প্রজননসহ এদেরকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দান করা।

দেশের সকল প্রকার জাতীয় সম্পদের প্রতি প্রত্যেক নাগরিকের ভালোবাসা আরো নিবিড় করা ছিলো বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রবল ইচ্ছা। স্বাধীন দেশের স্বল্প সম্পদের সর্বোচ্চ যথাযথ ব্যবহার করাটা ছিলো প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব।

নির্দেশ ছিলো ব্যক্তি বা ক্ষুদ্র পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি পর্যন্ত রাষ্ট্রের যে কোনো সম্পদের অপচয় রোধ করতে যথেষ্ট আন্তরিক হতে হবে।

জাতীয় সম্পদ ও সম্পত্তি তা সে যে প্রকারেরই হোক না কেন, তা কোনো ব্যক্তি কর্তৃক হনন করার অর্থই হলো নিজেকে হত্যা করা। আবার পর্যটন শিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ অবস্থানে নেওয়ার উদ্দ্যোগ গ্রহণ করা ছিলো আকর্ষণীয়। বছরের বিভিন্ন সময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত যতো রকমের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে তা যথাসর্বস্ব দিয়ে মোকাবেলা করার সংকল্প ছিলো দৃঢ়। ঠিক তেমনি নির্দেশ ছিলো বাজারে ব্যবসা-বাণিজ্যে পরিমাপে বা ওজনে কম না দেওয়া, কোনো প্রকার খাবারে ভেজাল না দেওয়া।
দেশে অসৎ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট নির্মূল করার পাশাপাশি সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা।  প্রস্তুতি ছিলো পর্যায়ক্রমে গ্রাম ও শহরে যৌক্তিক নাগরিক সুবিধার ব্যবস্থা করা।

প্রতিবন্ধী, বয়স্ক ব্যক্তি, অনগ্রসর বা অসুবিধায় থাকা মানুষকে সাহায্যে এগিয়ে আসা।  দেশের কোনো ব্যক্তি যত বড়ই রাজনীতিবিদ, অর্থ-ধন- সম্পদশালী, ক্ষমতাধর হউক না কেন, অসহায় ব্যক্তির পাশে এসে তার অসহায়ত্ব দূর করতে আন্তরিক হওয়া। আমলাতান্ত্রিক কোনো জটিলতা বা কোনো রাজনৈতিক কূটচালে পড়ে এজাতীয় সহযোগিতার উদ্যোগ যেন ভেঙ্গে না যায় সে বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া।

বাঙালি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি ও বাংলাদেশের ইতিহাসে অবিসংবাদিত এক মহান নেতা এবং যিনি পৃথিবীতে অবিস্মরণীয় এক ব্যক্তিত্ব।  বাঙালি জাতিসত্তার অধিকার প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ ও সংগ্রাম অতুলনীয়। মনে রাখা দরকার, তথাকথিত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির স্বৈর এবং আমলাতান্ত্রিক শোষণ ও নিপীড়ন থেকে আমাদেরকে মুক্ত করতেই বঙ্গবন্ধু তাঁর সম্পুর্ণ জীবন ও পরিবার উৎসর্গ করে গিয়েছেন।

গুটিকয়েক ব্যক্তিবঙ্গবন্ধুকে পুুঁজি করে তথা বঙ্গবন্ধুকে বিক্রি করে পাকিস্তানি মানসিকতা ধারণ করে স্বাধীন এই দেশটিতে অসুস্থ চিন্তা-চেতনার শেকড় গেড়ে তার বিস্তার ঘটাবেুুস্বাধীনতার ৪৬ বছর পর বা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে এমনটা কখনোই হতে দেওয়া যাবে না।এজন্য দরকার সুশিক্ষা।

তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর সুশিক্ষা ব্যতীত বর্তমান বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যর্থ হয়ে যাবে।  তাই প্রত্যেকশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুশিক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি অত্যাবশ্যকীয় ভাবে ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলাটাও গুরুত্বপূর্ণ।

পিতা-মাতার পরেই শিক্ষার্থীর নিকট শিক্ষকই দ্বিতীয় অভিভাবক। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বোধগম্য সুশিক্ষা বিনিময়,সুসম্পর্ক এবং সুন্দর ভাবনাগুলো শিক্ষার্থীর জীবনকে আমূল বদলে দিতে পারে এভাবে সকল প্রকার সন্ত্রাস ও জঙ্গিমুক্ত সমাজ গড়তে শিক্ষার্থীকে রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ নাগরিকে পরিণত হতে হবে।  সুস্থ শিক্ষায় জীবনচর্চাই হতে পারে আদর্শ নাগরিক ও সুন্দর দেশ তৈরির অন্যতম শর্ত।

একই ধরনের আরও সংবাদ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.