অধিকার ও সত্যের পক্ষে

হাওরের চিঠিঃ তারুণ্যের নির্বাচনী ভাবনা

 মিনহাজুল ইসলাম অন্তর ॥

১. আমি মফস্বলের ছেলে। নির্মলেন্দু গুণের ‘চাষাভুষার কাব্য’ থেকে উঠে এসেছি, আমি উঠে এসেছি মোস্তফা জব্বারের ‘বিজয় বাংলা ফন্ট’ থেকে। নেত্রকোণা জেলার শেষকোণায় খালিয়াজুরীর এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমার বেড়ে ওঠা- যেখানে শিক্ষাব্যবস্থা নামক উন্নয়নের যে প্রধান পিদিম, তা এখনো পরিপূর্ণরূপে জ্বলে উঠতে পারে নি। উদাহরণস্বরূপ, আমি যেবছর এসএসসি পাস করি সেবছর পুরো উপজেলায় একটা মাত্র জিপিএ-৫ এসেছিল এবং সৌভাগ্যবশত কিংবা দূর্ভাগ্যবশত সেটাও ছিলাম আমি। এর ঠিক ২ বছর আগে থেকে জিপিএ সিস্টেম আসার পর পর্যন্ত এই উপজেলায় কোনো জিপিএ- ৫ ছিল না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুরো উপজেলা মিলিয়ে ৩/৪ টা জিপিএ- ৫ আসলেও, ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ৩০% এর নিচে না। এ তো গেলো শিক্ষাব্যবস্থার কথা। এবার যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে কিছু বলা যাক। সুরমা নদীর একটি শাখা বয়ে চলা এই হাওর এলাকা বছরে ৬ মাস থাকে ভারত থেকে সিলেট হয়ে আসা পানির নিচে। তখন যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌকা বা ট্রলার। বাকি ৬ মাস শুকনো থাকলেও রাস্তাঘাটের অবস্থা খুব বেশি ভাল না হওয়ায় মোটর সাইকেল ছাড়া গাড়ি- ঘোড়া তেমন চলে না। এখান থেকে জেলা সদর নেত্রকোনার দূরত্ব মাত্র ১৩১ কিলোমিটার হলেও যেতে সময় লাগে কমপক্ষে ৬/৭ ঘন্টা। এর একমাত্র কারণ এখানকার অনুন্নত রাস্তাঘাট ও বাজে যাতায়াতব্যবস্থা। চিকিৎসাব্যবস্থার নাজুক অবস্থার কথা ইতিমধ্যে আন্দাজ করা খুব কঠিন কিছু হবে না আশা করি। হঠাৎ কোন গুরুতর অসুস্থতা কিংবা শারীরিক দুর্ঘটনায় প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য যেতে হয় ১৬ কিলোমিটার দূরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, যা দেড় ঘন্টার পথ। অথবা নিজ জেলার সীমানা ভেঙ্গে পার্শ্ববর্তী জেলা সুনামগঞ্জের শাল্লা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, সেখানে যেতেও সময় লাগে এক ঘন্টার নিচে না।

উন্নয়নশীল বাংলাদেশের উন্নয়নের স্পর্শবঞ্চিত এই হাওর এলাকার মানুষদের শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা যাতায়াতব্যবস্থার মতো মৌলিক চাহিদার উপরোক্ত চিত্রগুলো থেকে নিশ্চয় বেশ খানিকটা ধারণা পাওয়া গেছে এখানকার মানুষের যাপিত জীবনব্যবস্থার ব্যাপারে। এবার মূল আলোচনার দিকে যাওয়া যাক।

২. ভাটি বাংলার আলো বাতাসে বেড়ে উঠার কারণে এখানকার মাটি ও মানুষকে খুব কাছে থেকে দেখার ও জানার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। হাওর- নদী, বিল- ঝিলের মমতায় লালিত হওয়া সহজ সাধারণ এই মানুষগুলোর অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল৷ বছরে ৬ মাস পানি থাকায় মাত্র একবারই ফসল ফলানোর সুযোগ হয় এখানে। উপার্জিত ফসলের একাংশ নিজেদের জন্য রেখে বাকি অংশ বিক্রি করে যে টাকা আয় হয়, তা দিয়ে ভরণপোষণের প্রস্তুতি নেয় এখানকার অধিকাংশ পরিবার। এক ফসল থেকে আয়ের এই টাকা সারাবছরের প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট না হওয়ায় বর্ষার মৌসুমে হাওরে মাছ ধরাকে বাড়তি আয়ের উৎস করে নিয়ে কাজ করে কিছু পরিবার। আর কিছু পরিবারের কর্মক্ষম সদস্যরা শহরে চলে যায় কাজের খোঁজে। এদের মধ্যেও একশ্রেণির স্বচ্ছল মানুষ আছে, যারা কৃষিকাজের পাশপাশি চাকরি কিংবা ব্যবসার সাথে জড়িত। কিন্তু কেউই কৃষিকাজের উর্ধ্বে নয়।

এখানে পৌষের সময় জমিতে ধানের বীজ ফেলা হয় (স্থানীয় ভাষায় ‘জালা ফালানো’) এবং চৈত্রের শেষ থেকে শুরু করে বৈশাখের মাঝামাঝি পর্যন্ত ধান কেটে ঘরে তোলে এখানকার মানুষ। গতবছর জমিতে ধান ফেলে পরিচর্যা করে যখন ধান পাঁকার অপেক্ষায় প্রহর গুণছিল কয়েক হাজার কৃষক পরিবার, তখন ভারত থেকে আসা পানিতে সমস্ত হাওর তলিয়ে যাওয়ার পাশপাশি তলিয়ে যায় এই হাজার পরিবারের মানুষগুলোর বেঁচে থাকার স্বপ্ন এবং শক্তিও। সেই ক্রান্তিকালে মানবতার মহান বার্তা নিয়ে হাজির হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি নেত্রকোনা এবং সুনামগঞ্জ জেলার হাওর এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ প্রতিটি পরিবারকে প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল এবং নগদ ৫০০ করে টাকা দিয়ে ভরণপোষণ করেন পুরো বছর জুড়ে। এই একটি দৃষ্টান্তই যথেষ্ট এখানকার মানুষদের মনের মাদুরে চিরস্থায়ী আসন করে নেবার জন্য৷ এছাড়া বিগত ১০ বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে এলাকায় কয়েক হাজার আর্সেনিকমুক্ত টিউবওয়েল এর পাশাপাশি বিনামূল্যে সৌরবিদ্যুৎ পাওয়া পরিবারের সংখ্যাও কম নয়। বয়স্ক ভাতা, দুঃস্থ ভাতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে এলাকার মানুষ যে পরিমাণ রেশন কিংবা নগদ টাকা পেয়েছে সরকারীভাবে- তা আর কোন সরকারের শাসনামলে পেয়েছে বলে কেউ দাবি করতে পারবে না। কৃষকদের জন্য কমমূল্যে সরকারিভাবে সার এসেছে, মসজিদ মাদ্রাসার জন্য বরাদ্দ এসেছে। বেশ কিছু কাঁচা পাকা রাস্তাঘাটের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে এবং এখনো চলছে। নদী খনন কাজ চলছে। সর্বোপরি, একটু দেরিতে হলেও উন্নয়নের যে জোয়ার এখানে তৈরি হয়েছে তা আওয়ামী লীগ মনোনীত নেত্রী রেবেকা মমিনের আমলেই। এর দশবছর আগে এই নেত্রকোনা-৪ আসনে লুৎফুজ্জামান খান বাবর সাহেব মন্ত্রীপরিষদে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থাকলেও এই ভাটি এলাকায় উন্নয়নের ছাপ তেমন রেখে যেতে পারেন নি।

৩. এলাকার পারিপার্শ্বিক অবস্থার কথা বলা শেষ। এবার কিছু ব্যাক্তিগত ব্যপার তুলে ধরতে চাই। এসএসসিতে মোটামুটি ভালো রেজাল্ট করে আমি যখন ময়মনসিংহে কলেজে ভর্তি হই, তখন আমার এমপিওভুক্ত বেসরকারি হাই স্কুলমাস্টার বাবার বেতন যা ছিলো তা ১৫ সদস্যের একটা যৌথ পরিবারকে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট হলেও বিরাট উদ্বেগ ছিল আমাকে শহরে রেখে পড়ানোর খরচের কথা ভেবে। তখন আমাদের সব উদ্বেগ দূর করে প্রতিটি চিন্তামাখা মুখে হাসি এনে দিলো শেখ হাসিনা সরকার। পে- স্কেল ডাবল হয়ে গেলো। আব্বার বেতনও বেড়ে গেলো বেশ অনেকটা। মোটামুটি স্বাচ্ছন্দ্যেই কাটতে লাগলো আমাদের দিন। এরপর গতবছর হাওরের ফসল তলিয়ে গেলে এলাকার অন্যসব মানুষদের মতো আমাদেরও প্রায় ১০/১২ লাখ টাকার মতো ফসলের ক্ষতি হয়ে যায়। গোলায় ধান নেই, এই ফসল ছাড়া আমরা যে না খেয়ে থাকবো এমনটা নয়, তবু সরকার থেকে বরাদ্দকৃত মাসিক ৩০ কেজি চালে কোনরকম চিন্তা ভাবনা ছাড়াই বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে কেটে যায় বছরটা৷

আওয়ামীপন্থী পরিবারে বড় হলেও আমি ব্যাক্তিগতভাবে কখনোই আওয়ামীলীগ এর সমর্থক ছিলাম না। তবে কি বিএনপি কিংবা জামায়াত শিবির নাকি লাঙ্গল পার্টি? নাহ, এর কোনটাই না। সত্যি বলতে রাজনীতি নামক বস্তুটার প্রতি কোনকালেই আমার কোনপ্রকার আগ্রহ কিংবা অনাগ্রহ এর কোনটাই ছিল না। তবে তাই বলে আমি বিবেকহীন নই। বছরের পর বছর এলাকার উন্নয়ন হতে দেখেছি, শিক্ষকদের পে- স্কেল দ্বিগুণ হওয়ার সুবিধা নিয়ে পড়াশোনা করেছি, জমির ফসল তলিয়ে গেলে সরকারি চাল খেয়ে বেঁচে ছিলাম- আওয়ামী সরকারের এতোসব অবদান অস্বীকার করার মতো শক্তি বা সাহস কোনটাই আমার নেই।

তবে এই সরকারের প্রতি খারাপ লাগা যে নেই, তাও কিন্তু না। কোটা আন্দোলন থেকে শুরু করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে সরকারের ভূমিকা আমাকে পীড়া দিয়েছে৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও, সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে আওয়ামী সরকারের অবদানকে উপেক্ষা করে অন্য কোন দলে ভোট দেওয়ার কথা চিন্তাই করতে পারি না। মদন- মোহনগঞ্জ- খালিয়াজুরী অর্থাৎ নেত্রকোনা- ৪ আসনের বেশির ভাগ মানুষ যারা কোন দলের অন্ধভক্ত না হয়ে নিজের বিবেক দিয়ে বিচার বুদ্ধি করে সিদ্ধান্ত নেন তারাও খুব সম্ভবত আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করবে না। শহর থেকে বিচ্ছিন্ন, সুবিধা বঞ্চিত অনুন্নত হাওর এলাকার সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা সবকিছুর আগে এলাকার উন্নয়ন চাইবো, সেটা যে সরকার এর মাধ্যমে সম্ভব হবে বলে আমাদের মনে হয় আমরা তাকেই ভোট দেব।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

শিক্ষা বার্তা-আ.আ.হ/মৃধা

একই ধরনের আরও সংবাদ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.