অধিকার ও সত্যের পক্ষে

শিক্ষকরা নামছেন জোটবদ্ধ হয়ে

বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র কয়েকমাস বাকি। চলছে সংসদের শেষ অধিবেশন। তারিখ নির্ধারিত না হলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এ বছরের শেষে হবে বলে আভাস পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ স্থান থেকে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে নানাবিধ কাজ করে যাচ্ছে।

ক্ষমতার স্বাদ নিতে জোটবদ্ধ হচ্ছে বিভিন্ন ছোট বড় রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশে জোটবদ্ধ হয়ে রাজনীতির সংস্কৃতি বেশ পুরনো। তবে এবার জোট গঠনে চমক সৃষ্টি করেছেন দেশের শিক্ষাঙ্গনের কর্ণধাররা। বিভিন্ন দাবি আদায় এবং সকল স্তরের শিক্ষকদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষার জন্য এবার জোট বেঁধেছেন শিক্ষকরাও। জানা যায়, চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক ধরনের অস্থিরতা লক্ষ্য করা যায়। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ, এমপিওভুক্তির দাবি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ, জাতীয়করণ হওয়া কলেজ শিক্ষকদের ক্যাডারে আত্তীকরণ ও সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারদের আপত্তিসহ বেশকিছু বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতার মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকরা।

এসব অসঙ্গতির মধ্যে ইতোমধ্যে বেশকিছু বিষয়ের সুরাহা করেছে সরকার। এরপরও কিছু বিষয় নিয়ে অসন্তোষ রয়ে গেছে শিক্ষকদের মধ্যে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে এই অসন্তোষ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যেও বিদ্যমান। তাই বিভিন্ন দাবি আদায়ের জন্য নতুন জোট করেছে শিক্ষকরা। স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকদের মোট ১৫টি শিক্ষক সংগঠন নিয়ে নতুন এ জোট গঠিত হয়েছে। জোটটির নাম বাংলাদেশ শিক্ষক সমন্বয় পরিষদ। চলতি মাসের ১২ তারিখে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে জোটটি আত্মপ্রকাশ করে। সংগঠনটির প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।জোট গঠনের ব্যাপারে শিক্ষক নেতারা বলছেন, শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা নিরসন না হলে সমাজের অবকাঠামোর গলদ ও অসঙ্গতি দূর করা সম্ভব না।

তাই শিক্ষকদের মৌলিক দাবি আদায়ে মুক্তিযুদ্ধের ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মৌলিক নীতি আদর্শের আলোকে দেশের সব স্তরের শিক্ষকদের নিয়ে এ সংগঠন গঠিত হয়েছে। এ সংগঠন শিক্ষকদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও ন্যায্য অধিকার আদায়ের দাবিতে কাজ করবে।জানা যায়, ২০ দফা দাবি সামনে রেখে এই জোট আত্মপ্রকাশ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করণ, ইউনেস্কো এবং আইএলওর সুপারিশমালা বাস্তবায়ন, ২০১০ শিক্ষানীতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। সব ধরনের শিক্ষক নিয়োগে স্বতন্ত্র সার্ভিস কমিশন গঠন ও বেতন স্কেল প্রদান, সব স্তরের অবসরের বয়স ৬৫ বছর করা, বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, সরকার প্রতিশ্রুত ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট ও বৈশাখী ভাতা চলতি বছরের জুলাই থেকে কার্যকর করা ও বছরের একটি দিন ‘শিক্ষক দিবস’ ঘোষণা করা।সংগঠনটির প্রধান উপদেষ্টা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক আমার সংবাদকে বলেন, এ সংগঠনটি শুধু দাবি আদায়ের জন্য গঠিত হয়েছে এমন নয়।

প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল স্তরের শিক্ষকদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে সংগঠনটি। একই সঙ্গে শিক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন দাবিতেও কাজ করা হবে। সংগঠনটির চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন তেজগাঁও কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবদুর রশীদ। আর সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম।সংগঠনটির চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো. আবদুর রশীদ বলেন, আমাদের দাবিগুলো সরকারকে স্পষ্ট করে জানাতে চাই। কিন্তু এটি নির্বাচনের বছর। তাই এখন বড় কোনো আন্দোলনে যাওয়ার পরিকল্পনা আমাদের নেই। তবে জানুয়ারিতে নতুন সরকার গঠন হলে আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে শিক্ষকদের ২০ দফা দাবি আদায়ে বৃহৎ আন্দোলনের ঘোষণা দেয়া হবে।

শিক্ষকদের নতুন জোটে যেসব সংগঠন রয়েছে সেগুলো হলো বাংলাদেশ শিক্ষক ইউনিয়ন, বাংলাদেশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন, সরকারি কলেজ শিক্ষক সমিতি, বাংলাদেশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ টিচার্স ফেডারেশন, বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি, বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতি, জাতীয় প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজ, বাংলদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতি, বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এবং বাংলদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন। এদিকে দেশের মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের নেতা ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, শিক্ষকদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া রয়েছে। আমরা সেসব দাবির ব্যাপারে আন্তরিক।

এবার নতুন প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা হবে। ইতোমধ্যে ‘নন-এমপিও’ প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে অনলাইনে আবেদন আহ্বান করা হয়েছে এবং স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা-কারিগরি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ৯ হাজার ৪৯৮টি আবেদন অনলাইনে জমা পড়েছে। তিনি বলেন, সরকারের বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় যাচাই-বাছাই চলছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মাঠপর্যায়ে সরেজমিন যাচাই-বাছাই চলবে। যাচাই-বাছাই করে এমপিওভুক্ত করা হবে। শিক্ষকদের ৫ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ও বৈশাখি ভাতা দেয়ার কার্যক্রমও হাতে রয়েছে। ইতোমধ্যে সে সংক্রান্ত ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে জমা রয়েছে। এছাড়াও শিক্ষকদের অন্য দাবিগুলোও পর্যালোচনা করা হবে।

একই ধরনের আরও সংবাদ