অধিকার ও সত্যের পক্ষে

শিশুর শেখা

একটি পুরনো এবং পরিচিত গল্প – এক গ্রামে একটি ছেলে ছিল। ছেলেটি ভীষণ ভদ্র এবং বিনয়ী। বড়দের মুখোমুখি হলেই সুন্দর করে সালাম-আদাব দেয়। এক মুরুব্বী তার এই আদব-কায়দা দেখে অত্যন্ত মুগ্ধ। কিন্তু, তাকে তিনি চিনতেন না। একদিন পথিমধ্যে থামিয়ে তার পরিচয় জানতে চাইলেন। পরিচয় পেয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, – তুমি এত আদব-কায়দা কোথায় শিখলে? ছেলেটি সংক্ষেপে উত্তর দিল, – বেয়াদবের কাছ থেকে। মুরুব্বী অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞাসু নেত্রে ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতেই সে ব্যাখ্যা দিয়ে বললো, – বেয়াদব কী করে আমি তা ভালভাবে লক্ষ্য করি এবং নিজে করার সময় উল্টোটাই করি।

গল্পটি বলার পেছনে উদ্দেশ্য হলো এই যে, আমাদের সন্তানরা প্রতি মুহূর্তে নিত্যনতুন ঘটনা এবং বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। সেগুলোর কোনটি ভাল এবং শিক্ষণীয়, আবার, কোনটি মন্দ এবং বর্জনীয়। কিন্তু শিশু তার সরল মনে সবকিছুকেই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার চেষ্টা করে; ভালমন্দ ভেদ-বিশ্লেষণ না করেই। বিশেষ করে জন্মের পর পাঁচ বৎসর বয়স পর্যন্ত শিশুরা সবকিছু অসম্পাদিত (আন এডিটেড) অবস্থায় গ্রহণ করে থাকে যা খুবই উদ্বেগজনক। এক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্ব হলো শিশুকে ভালমন্দের বিষয়টি বুঝিয়ে বলা। কোনটি ভাল এবং কোনটি ভাল নয় এবং কেন ভাল বা ভাল নয় তা উদাহরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা। এখানে একটি কথা মনে রাখা ভাল এই যে, শিশুরা অনেক ক্ষেত্রেই আবেগীয় আবেদনের চেয়ে যুক্তিতে সাড়া দেয় বেশি। একটি উদাহরণ দেয়া যাক, – আপনি দেখতে পেলেন আপনার সন্তান লাঠি দিয়ে একটি কুকুরকে সজোরে আঘাত করেছে। কুকুরটি আর্ত চিৎকার করে ছুটে পালিয়ে গেল। আপনি আপনার সন্তানকে বলতে পারেন, – কুকুরটি ভীষণ ব্যথা পেয়েছে, তাই কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। তোমাকে যদি এভাবে আঘাত করা হয় তাহলে তুমি ব্যথা পাবে না? কাউকে এভাবে মারতে নেই। শিশুটি তখন বিষয়টি নিয়ে ভাববে। এ রকম উদাহরণের মাধ্যমে শিশুর মধ্যে নৈতিকতাবোধ জাগিয়ে তোলা যায় এবং তা থেকে শিশু ভালমন্দ বিচার-বিশ্লেষণ করতে শিখবে।

এর আরেকটি দিক বা প্রেক্ষিত হলো এই যে, পরিবারে, বিদ্যালয়ে, হাটে-বাজারে তথা সমাজের সর্বক্ষেত্রে শিশুরা প্রতিনিয়ত নানা ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছে যেগুলো থেকে তাদেরকে ফিরিয়ে রাখা যাবে না। কেননা, ঐসব ঘটনাবলীর উপর আমাদের কোন হাত নেই বা নিয়ন্ত্রণ নেই। বাতাসে শতকরা ৮০ ভাগ দূষিত পদার্থ আছে বলে আমরা শ্বাস নেব না এমনটি হতে পারে না। কেননা, বাতাসে ২০% অক্সিজেনও আছে যা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য একান্ত জরুরি। কাজেই, আমরা যা করতে পারি তা হলো শিশুকে কোন বিষয়ের ভালমন্দ দিকগুলো বুঝিয়ে বলা, ভাল কাজের প্রতি তাকে উৎসাহিত করা এবং মন্দ কাজকে ঘৃণা করতে শেখানো। অর্থাৎ, শিশুর মধ্যে নৈতিকতাবোধ জাগিয়ে তোলা। এক্ষেত্রে শিশুর মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা পাপ-পূণ্যের বোধ তৈরি করাও খুবই অর্থবহ এবং কার্যকর। শিশুর মধ্যে যদি একবার এই নৈতিকতাবোধ বা মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলা যায় এবং দৃঢ় ভিত্তিতে তা প্রতিষ্ঠিত করা যায় তাহলে ঐ বোধই জীবনচলার প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকে গাইড করবে। শিশুকে আর পাহারা দেয়ার প্রয়োজন হবে না। এ প্রসঙ্গে এ কথাটিও জরুরি যে, কোন যুক্তি বা ধারণা না দিয়েই যদি সন্তানকে শাসন করা বা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয় তাতে হিতে বিপরীত ঘটতে পারে। নিচের ঘটনাটি থেকে বিষয়টি স্পষ্ট করা যাবে বলে আশা করি।

আমার এক বড় ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে গেছি। দেখলাম বিটিভি চলছে। ভাইকে বললাম এটিএননিউজ ধরুন, খবর শুনবো। ভাই জানালেন, – আমাদের বাসায় ডিস টিভি নেই। কেন নেই জানতে চাইলাম। ভাই জানালেন, – শিশির বড় হচ্ছে, তাই ডিস টিভি রাখি না। ঐসব চ্যানেলগুলোতে আজেবাজে জিনিস দেখায়। ওগুলো দেখলে শিশির নষ্ট হয়ে যাবে। আমি বিস্মিত হয়ে বলতে চেষ্টা করলাম, – খারাপ জিনিসকে খারাপ হিসেবে দেখা এবং ভাল জিনিসকে ভাল হিসেবে দেখা প্রয়োজন আছে। আর, খারাপ জিনিস দেখলেই সন্তান নষ্ট হয়ে যাবে এমন ধারণা করা ঠিক নয়। আমাদের বয়সকালে আমরাও অনেক খারাপ জিনিস দেখেছি এবং পড়েছি। কিন্তু কই, আমরাতো নষ্ট হয়ে যাইনি? আমি ভাইকে এটাও বললাম যে, আপনি যদি অতিরিক্ত কড়াকড়ি করতে চান তাহলে শিশির বাইরে অন্য কোথাও গিয়ে ডিস টিভি বা আজেবাজে জিনিস দেখবে। ভাই আমার কোন যুক্তিই মানতে চাইলেন না। প্রায় বছরখানেক পরে ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। ভাই ভীষণ আক্ষেপের সঙ্গে জানালেন, – তোমার কথাইতো সত্যি হলো; শিশির এখন ওর বন্ধুদের বাসায় গিয়ে ডিস টিভি দেখে, আর, রাত করে বাড়ী ফেরে। ছেলে বড় হয়েছে, কিছু বলতেও পারি না।

অন্য আরেকটি সমস্যা হলো এই যে, আমরা অনেক সময় শিশুদের মানসিকতা এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে বুঝতে ভুল করে থাকি। অর্থাৎ, কোন বিষয়কে আমরা শিশুর চোখ দিয়ে না দেখে বড়দের চোখ দিয়েই দেখে থাকি। ফলশ্রুতিতে আমরা অনেক সময় শিশুর সঙ্গে অন্যায় আচরণ করে ফেলি। এখানেও একটি ঘটনা বলছি, – অফিসের কাজে ঢাকায় এসে এক আত্মীয়ের বাড়ীতে উঠেছি। তখন স্যাটেলাইট চ্যানেল ছিল না; শুধু বিটিভি। বাড়ীর ছোট্ট ছেলেটি যার বয়স হবে ৫ থেকে ৬ বৎসর, সে আমার সঙ্গে বসে টিভি দেখছিল। টিভিতে চলছিল ‘ওয়াণ্ডার উওম্যান’। ছেলেটির মা অনেকক্ষণ যাবত তাকে খুঁজে না পেয়ে ড্রয়িং রুমে এসে দেখেন ছেলেটি টিভি দেখছে। আর সঙ্গে সঙ্গে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে ছেলেটির কান ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলে গেলেন আর গজরাতে লাগলেন – বসে বসে ন্যাংটা মেয়েমানুষ দেখা হচ্ছে? ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। আমি ছেলেটির মাকে বলতে পারলাম না যে, ঐ বয়সে শিশুদের মধ্যে যৌনতাবোধ কাজ করে না। ছেলেটি ন্যাংটা মেয়েমানুষ দেখছিল না; ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতায় রোমাঞ্চকর অনুভূতিগুলো উপভোগ করছিল। সমস্যাটি হয়েছিল এখানেই যে, ভদ্রমহিলা বিষয়টিকে দেখেছেন প্রাপ্তবয়স্কের চোখ দিয়ে, আর, শিশুটি দেখছিল শিশুসুলভ সরলতায়।

আমরা অনেক সময় শিশুদেরকে কোন বিষয় সম্পর্কে ভুল ধারণা বা ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে থাকি যা শিশুর সরল মন সঠিক এবং সত্য বলে বিশ্বাস করে নেয় এবং সারাজীবন তা অনুসরণ করে। এখানেও একটি ঘটনা বলছি, – আমার এক ফুফাতো বোন আমার বাসায় বেড়াতে এসেছে। নামাজের সময় হতেই সে জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়িয়ে গেল, সামনে ছিল টেলিভিশন। মুহূর্তের মধ্যে সে জায়নামাজ উঠিয়ে নিয়ে অন্য ঘরে চলে গেল। আমি জানতে চাইলাম, কোন সমস্যা? ও বললো, – ঐ ঘরে সামনে টেলিভিশন আছে, ওখানে নামাজ হবে না। আমি ওকে যেভাবে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম তা অনেকটা এই রকম, – একটি বন্দুক মূলত প্রাণহীন জড় পদার্থ। তার নিজের কোন ক্ষমতা নেই। ওটা যখন কোন ডাকাতের হাতে পড়বে তখন তা ডাকাতির কাজে ব্যবহার হবে। আর, যখন তা একজন সৈনিকের হাতে পড়বে তখন তা দেশরক্ষার কাজে ব্যবহার হবে। কাজেই, একটি টেলিভিশনের কোন দোষ নেই। তুমি ওটাকে যেভাবে ব্যবহার করবে সেটা সেভাবেই ব্যবহার হবে। তুমি টেলিভিশনে অপছন্দনীয় অনুষ্ঠানগুলো বাদ দিয়ে ভাল অনুষ্ঠানগুলোই দেখতে পার। কাজেই, টেলিভিশনের সামনে নামাজ হবে না কথাটি ঠিক নয়।

এভাবে আমরা শিশুদেরকে শুরু থেকেই নানা রকম ইতিবাচক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারি। তাহলে তাদের মধ্যে ভুল বা অপরাধের মাত্রা অনেক কমে যাবে। তবে এখানেও ঐ কথাটি মনে রাখা জরুরি যে, শিশুরা বড়দেরকে অনুকরণ করেই সবকিছু শিখে থাকে। কাজেই, শিশুদের সামনে আমাদেরকে সবসময় একজন অনুকরণীয় আদর্শ (রোল মডেল) হিসেবে প্রতিভাত হতে হবে।

সরকার জাবেদ ইকবাল
ফ্রিল্যান্স কনসালটেন্ট, sjiqbal.1957@gmail.com

একই ধরনের আরও সংবাদ

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.