নজরুল ইসলাম।।
শিক্ষক হওয়ার পর থেকে শিক্ষা বিষয়ক ভাবনা একেবারেই ভাবব না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। কিন্তু অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী স্যারের বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি সংক্রান্ত লেখাটা পড়ে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারলাম না। লেখায় একটা প্রেরণা পেলাম। একটা দায় অনুভব করলাম। কিছু কথা সবাইকে জানানো প্রয়োজন মনে করলাম। তাই, লিখছি।
কিছুদিন আগে বেসরকারি কলেজের এক সহকারী অধ্যাপকের সাথে সুখ দুঃখের কথা বিনিময় করতে করতে তার কাছ থেকে শুনলাম, আমরা অনেক পেয়েছি। আগে তো শতভাগ বেসিকও পেতাম না। সেটা পাচ্ছি। আগে তো বেতনের পরিমাণ ছিল খুব কম, সেটা এখন কত বেড়েছে! এখন আবার ৫% ইনক্রিমেন্ট পাচ্ছি, বৈশাখী ভাতা পাচ্ছি। অনেক পাচ্ছি। এতো পাওয়ার পরও শিক্ষকরা সন্তুষ্ট না। আবার আন্দোলন করে। আসলে অতৃপ্ত আত্মার কোনোদিনই তৃপ্ত হয় না।
তার কথার মধ্যে যে তথ্যগুলো দিয়েছেন তার মধ্যে বেশ কয়েকটা সত্য কথা। কিন্তু আন্দোলনের বিরোধিতা এবং সন্তুষ্টি নিয়ে যা বললেন, সেই কথায় আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না। তাকে স্যার সম্বোধন করে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কত বছর প্রভাষক পদে চাকরি করেছেন?
উনি উত্তরে বললেন, ১৮ বছর।
আমি তার কাছে জানতে চাইলাম, এতোদিন পর যে আপনি প্রমোশন পেলেন, এই নিয়ে আপনার মনে কি কোনো ক্ষোভ জাগে?
উনি বললেন, তাতো জাগেই।
আমি বললাম, আপনি কবে সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপক হবেন?
উনি এর কোনো উত্তর দিলেন না।
আর উত্তর জানার দরকার আছে কি?
আসলে, যেকোনো ব্যবস্থায় বৈষম্য থাকলে, বঞ্চিতরা (যতই দলকানা হোক) মন থেকে ক্ষোভ দূর করতে পারে না। আন্দোলনরত শিক্ষকরা আসলে এই বৈষম্যই দূর করতে চাইছে। সেই বৈষম্য দূর করার জন্য নানা পরামর্শও দিচ্ছে। এখানে বেতন ভাতা সুবিধার প্রসঙ্গের কথা নাই বললেই হয়।
বৈষম্যগুলোর কিছু উপস্থাপন করছি। কিছু বলার কারণ, এতো বৈষম্য যে, সব গণনা করে বের করতে সামর্থ্য নাও হতে পারে। বাদ পড়ে যেতে পারে।
১. শিক্ষক নামের মধ্যেই বৈষম্য। সরকারি শিক্ষক আবার বেসরকারি শিক্ষক। সরকারি পুলিশ, বেসরকারি পুলিশ নাই; সরকারি ম্যাজিস্ট্রেট, বেসরকারি ম্যাজিস্ট্রেট বলে কোনো বিভাজন নাই। শিক্ষা বিভাগে এই বিভাজন কতটা যৌক্তিক ও বিবেচনা প্রসূত?
২. পদন্নোতিতে পুকুর সমান বৈষম্য। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা জীবনে একটা প্রমোশন পান। প্রভাষক থেকে সহকারি অধ্যাপক পদে। দেশে যদি এটাই একমাত্র নিয়ম হতো তাহলে কথা ছিল না। এই দেশের যে ক্লাসের ছাত্র পড়িয়ে কেউ প্রভাষক থেকে সহকারি অধ্যাপক, সহকারি অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক হচ্ছেন; সেই ক্লাসের ছাত্র পড়িয়েই কেউ সারাজীবন প্রভাষক পদে আটকে থাকছে (কপালে জুটলে শেষ জীবনে বড় জোর সহকারি অধ্যাপক হয়ে অবসরে যেতে পারে)। সমাজের বিবেকবান মানুষের এ বিষয়ে মতামত জানার আগ্রহ রয়েছে। এ বিষয়ে কেউ পাল্টা যুক্তি থাকলে সেই যুক্তি খণ্ডানোর জন্য আমি প্রস্তুত। যুক্তি থাকলে জানাবেন।
বর্তমানে যে নিয়ম করা হয়েছে, সেই নিয়ম অনুযায়ী কেউ কেউ সারাজীবন চাকরি করেও সহকারি অধ্যাপক হতে পারা যাবে না। নিয়মটা সংক্ষেপে হলো – কেউ চাকরিজীবনে দুইটার বেশি উচ্চতর বেতন স্কেল পাবেন না। সে ক্ষেত্রে একজন কলেজ শিক্ষক সপ্তম গ্রেডেও আটকে যেতে পারে। অর্থাৎ নবম গ্রেড থেকে অষ্টম গ্রেড, অষ্টম গ্রেড থেকে সপ্তম গ্রেড পর্যন্তই শেষ। ষষ্ঠ গ্রেড আর যেতে পারবে না। সহকারি অধ্যাপক পদ ষষ্ঠ গ্রেডের। যদি কেউ সপ্তম গ্রেড পাওয়ার আগে সহকারি অধ্যাপক হতে পারে তাহলেই তার চাকরিজীবনের চরমোন্নতি সাধিত হবে। তবে, রেশিও নিয়মের কারণে অধিকাংশ কলেজের শিক্ষকরা সপ্তম গ্রেড পর্যন্ত যেতে পারবে। দিন দিন বৈষম্য বেড়েই চলছে।
৩. বোনাস বিষয়েও বৈষম্যের কথা বলতে হয়। বোনাস যেহেতু বেসিকের উপর নির্ভরশীল, সেহেতু পদন্নোতির সাথে এই বৈষম্য জড়িত। একই ক্লাসের ছাত্র পড়িয়ে কেউ কেউ পায় শতভাগ বোনাস, কেউ পায় ২৫%। এক ইদে একজন সরকারি প্রভাষক পায় ২৩০০০/ টাকার উপরে আর বেসরকারি প্রভাষক পায় ৫৫০০/ টাকা বা তার চেয়ে কিছু বেশি। দুই ইদ বোনাসে একই চিত্র।
কিন্তু দেখুন, বৈশাখী ভাতাটা কিন্তু আরও কম, কিন্তু সেটা বাড়ানোর দাবী নেই আমার। কারণ সেখানে স্থুলো অর্থে বৈষম্য নেই। সরকারি বেসরকারি সবাই একই হারে পায়।
বোনাস ভাতা এরকম হলে কথা ছিল না। একই কাজ করে একজন পাবে পুরাটা আরেকজন পাবে চার ভাগের এক ভাগ, এটা মানা যায় না। বৈষম্য অন্তরে কেউ মানতে পারে না। বৈষম্যের ব্যবস্থায় অধিকাংশ মানুষ ক্ষুব্ধ।
কেউ বলবেন, বেসরকারি কলেজ শিক্ষকরা তো কলেজ থেকেও বোনাস পায়। উত্তরে বলব, কত পায়? কয়টা কলেজ দিতে পারে? সেই প্রশ্নের উত্তর জেনে এই মন্তব্য করবেন।
৪. প্রশিক্ষণেও বৈষম্য রয়েছে। একই প্রশিক্ষণে সরকারি শিক্ষকদের যে দৈনিক ভাতা দেওয়া হয়, বেসরকারি শিক্ষকদের দেওয়া হয় তার কয়েকগুণ কম। আয়োজনেও বৈষম্য রয়েছে – সেসব কথা এখানে আর বললাম না।
৫. বাজেটে বৈষম্যের কথা না বললেই নয়। সরকারি কলেজের জন্য বাজেট, বেসরকারি কলেজের জন্য বাজেট, ক্যাডেট কলেজের জন্য বাজেট একেক রকম। এখানে বৈষম্যের শিকার বেশি হয় এমপিওভুক্ত কলেজগুলো।
৬. বিভিন্ন দায়িত্ব পালনে এমপিওভুক্ত কলেজ শিক্ষকদের কোনো সুযোগ নেই।
এতো বৈষম্যের মধ্যে একজন শিক্ষক সুস্থভাবে চিন্তা করতে পারে না। বৈষম্য মেনে নেওয়ার মতো কাপুরুষতা নেই। যদি কাপুরুষতা না হয় তাহলে বৈষম্যের বঞ্চনা থেকে মুক্তি পাবার জন্য জীবন দিয়ে সংগ্রাম করে না। বঞ্চনার মধ্যে মানুষের চিন্তার বিকাশ ও দক্ষতা বৃদ্ধি হয় না। হতাশায় মানুষ নিজের ও অপরের ক্ষতিকারক হয়ে উঠতে পারে। হতাশ ও বঞ্চিত মানুষের কাছে শতভাগ সৌজন্য আশা করা যায় না। শিক্ষকতা পেশার একটা বেদনা আছে। যে বেদনার কারণেই হতাশ না হয়ে তারা জাতির বিবেকের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এটা অধিকার আদায় আর বৈষম্যের দূরীকরণের ক্ষেত্রে দুর্বলতা ভাবা উচিত হবে না।
শক্তপ্রাণ এই শিক্ষকদের শক্তি থাকতে থাকতেই বৈষম্য সরিয়ে শিক্ষকতা পেশায় একটা সমতা আননয় করা বিবেবেকের দায়। সেই দায় অনুভব করার জন্য দায়িত্বশীল মানুষ যদি দেশে দেখা দেয় তাহলে শিক্ষাব্যবস্থা কলুষতা মুক্ত হতে পারত।
লেখক: প্রভাষক, রামপুরা একরামুন্নেছা ডিগ্রি কলেজ, ঢাকা
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল