প্রাথমিকে এক শিফট, শিক্ষক-অভিভাবকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

 নিউজ ডেস্ক।। 

দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক সংখ্যা এবং দূরত্ব বিবেচনায় ডাবল শিফটের পরিবর্তে এক শিফট চালুর নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। কিন্তু এক শিফট চালু নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

অভিভাবকরা বলছেন, সন্তানকে পছন্দের বিদ্যালয়ে ভর্তি করার পর শ্রেণি সংকট কিংবা শিক্ষক সংকটের কারণে কেন এক কিলোমিটার দূরত্বে অন্য বিদ্যালয়ে পাঠাতে হবে। পাশাপাশি নতুন বিদ্যালয়ের নতুন শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্র-ছাত্রীদের সম্পর্ক গড়তেই তো বছর পার হয়ে যাবে।

শিক্ষকরা বলছেন, অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ সংকট না থাকায় তারা নিজেরাই এক শিফট চালু করে নিয়েছেন। আবার এক কিলোমিটারের মধ্যে বিদ্যালয় না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক ও শ্রেণি সংকটের কারণে এক শিফট চালু করা যাচ্ছে না।

কাছাকাছি থাকা প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো একীভূত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ নির্দেশ দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু যেসব স্কুল এক কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে সেসব স্কুল সম্পর্কে এখনও কোন নির্দেশনা না দেওয়ায় বিপাকে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

দুই বিদ্যালয়ের সমন্বয়

পাশাপাশি দুটি বিদ্যালয়ে কেউ ৯টা থেকে ১টা পর্যন্ত পাঠদান করবে আবার কেউ ৯টা থেকে ৩টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত। এতে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হওয়ার শঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পছন্দের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি

অনেক অভিভাবক পছন্দের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করান। এক শিফট চালু হলে তাদের সন্তানকে অন্য বিদ্যালয়ে পাঠাতে হবে। এতে সন্তানের যাতায়াত, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও শিক্ষকদের সঙ্গে নতুনভাবে শিক্ষার্থীদের খাপ খাওয়াতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন রয়েছে। এক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অন্য বিদ্যালয়ে গেলে নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করার সম্ভাবনা থাকবে।

বিদ্যালয়ের ইউনিফর্ম

একেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় ইউনিফর্ম একেক রকম। শ্রেণি সংকট ও শিক্ষক সংকট দূর করার জন্য দুইটি বিদ্যালয় একীভূত করতে হলে শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্মও ভিন্ন রকম হবে। এছাড়াও এক অভিভাবকের দুই সন্তানের জন্য দুই বিদ্যালয়ে হলে সময়ের মারপ্যাঁচে অভিভাবককে নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে।

পাঠদানে হবে হ য ব র ল অবস্থা

কোনও বিদ্যালয়ে শুধু প্রাক-প্রাথমিক থেকে ২য় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হবে, কোনও বিদ্যালয়ে পড়ানো হবে ৩য় থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত। সময় আগেভাগে হওয়ায় বেশিরভাগ শিক্ষক চাইবেন নিচের শ্রেণির ক্লাসগুলো নিতে। এছাড়া পছন্দকৃত বিদ্যালয়ে সন্তানকে ভর্তি করিয়ে অন্য বিদ্যালয়ে পাঠাতে হলে অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হতে পারে।

নগরের চন্দনপুরা এমদাদ আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিদ্দিক আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় যে নির্দেশনাগুলো দিয়েছে তার সবগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এক শিফটে একটি বিদ্যালয় পরিচালনা করতে গেলে কমপক্ষে ৮ জন শিক্ষকের প্রয়োজন। এক শিফট চালুর জন্য আমাদের আশপাশে এমন স্কুল নেই।

তিনি আরও বলেন, আমার পাশে কুসুমকুমারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে কিন্তু তারা মর্নিং শিফটে পাঠদান করে। তাদের সঙ্গে আমরা এক শিফটে যেতে চাইলে আমাদেরও মর্নিং শিফটে চলে যেতে হবে। এছাড়া গুলজার বেগম স্কুল ও কাতালগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক এবং শ্রেণিকক্ষ উভয়ই পর্যাপ্ত থাকার কারণে তারা নিজেরাই এক শিফট চালু করে নিয়েছে। আমাদের শিক্ষক স্বল্পতার কারণে আমরা কারও সঙ্গে এক শিফট করতে পারছি না। আমার বিদ্যালয়ে ৬ জন শিক্ষক। প্রধান শিক্ষক অফিসিয়াল কাজে থাকলে তিনি ক্লাস নিতে পারবেন না। এছাড়াও যদি একজন শিক্ষক ছুটিতে থাকে, তাহলে ৪ জনকে দিয়ে পাঠদান চালিয়ে নেওয়া কষ্টসাধ্য হবে।

লোহাগাড়ার পদুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রূপন কান্তি নাথ বাংলানিউজকে বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় যে নির্দেশনাগুলো দিয়েছে সেগুলো শতভাগ বাস্তবায়ন করা কঠিন। গ্রামে অনেক স্কুল আছে যেগুলোর একটি থেকে আরেকটির দূরত্ব অনেক বেশি। আবার তাদের স্কুল এবং শ্রেণিকক্ষ সংকট রয়েছে। সেসব বিদ্যালয় কাদের সঙ্গে শিফট করবে সে নির্দেশনা এখনও আসেনি। তবে, এ রকম বিদ্যালয়ের তালিকা চেয়েছে মন্ত্রণালয়।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, যেখানে এক শিফট চালু করা যাবে সেখানেই এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হবে। আর যেখানে শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ সংকট কিংবা এক কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব রয়েছে, সেসব বিদ্যালয়ের বিষয়ে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে আমরা সেসব স্কুলের তালিকা চেয়ে চিঠি দিয়েছি।

জানা গেছে, ছাত্র ও শিক্ষক সংখ্যায় ভারসাম্যহীনতা, দূরত্ব, শিফট ইত্যাদি বিবেচনায় কিছু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একীভূত করার জন্য সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এটি করার জন্য মন্ত্রণালয়ের যুক্তি ছিল, ছাত্র কম-শিক্ষক বেশি, শিক্ষক কম ও ছাত্র বেশি- এমন ভারসাম্যহীনতা কোথাও কোথাও আছে। কাছাকাছি থাকা স্কুলগুলো যদি একীভূত করা যায়, তাহলে ছাত্রদের শিখন ঘণ্টাও বেশি হবে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নতুন নির্দেশনায় বলা হয়, যেসব বিদ্যালয়ে বর্তমানে পর্যাপ্ত সংখ্যক ব্যবহারযোগ্য শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক আছে, সেসব বিদ্যালয়ে অবিলম্বে সিঙ্গেল শিফটে পাঠদান পরিচালনার ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক নেই অথবা উভয় ক্ষেত্রেই ঘাটতি আছে; এমন কাছাকাছি অবস্থিত (সর্বোচ্চ ১ কিলোমিটার দূরত্বের) দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে পাঠদানের ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত কার্যক্রম চালু করতে হবে।

এক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য দূরত্বের বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সংখ্যা এবং বিদ্যালয়ের ব্যবহারযোগ্য শ্রেণিকক্ষের তথ্য বিশ্লেষণ করে পাশাপাশি দুটি বিদ্যালয়ে দুই ভাগ করে এক শিফট পরিচালনা করতে হবে। দুটি বিদ্যালয়ের মাঝে শ্রেণি বিভাজনের ক্ষেত্রে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত একটি বিদ্যালয়ে এবং অন্যটিতে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা নিতে হবে।