৬ বছরে একটি বিদ্যালয়েও শ্রেণিকক্ষ মাল্টিমিডিয়া হয়নি

ছয় বছরে একটি বিদ্যালয়েও শ্রেণিকক্ষ মাল্টিমিডিয়া হয়নি।বড় কলেজে ভবন অর্ধনির্মিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। বিদ্যালয় হয়নি একটিও।

শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ  বিদ্যালয়ে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ করতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ২০১৬ সালে একটি প্রকল্প নেয়। ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা। ছয় বছর পরে এসে দেখা যাচ্ছে, একটি শ্রেণিকক্ষও মাল্টিমিডিয়া হয়নি। প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৮ শতাংশের মতো। যদিও দুর্নীতির অভিযোগে এক দফা প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা হয়েছে।

অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে প্রকল্পটি জীবিত না মৃত তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সংশয়ে পড়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে  বলেন, এভাবে একটি প্রকল্প চলতে পারে না।

মাউশির নেওয়া এ রকম ১০টি প্রকল্পের মোটামুটি সব কটিই বাস্তবায়িত হচ্ছে ধীরগতিতে। প্রকল্পগুলোর মেয়াদ বারবার বাড়ানো হচ্ছে। নতুন করে যে মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতেও কাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। আবার সরঞ্জাম ও নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর চাপও তৈরি হয়েছে।

জানতে চাইলে মাউশির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক এ কিউ এম শফিউল আজম বলেন, কিছু কাজ আছে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। আবার কিছু কাজ আছে যেখানে মাউশির অনেক সময়ই কিছু করার থাকে না। যেমন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনে জমি অধিগ্রহণের কাজটি করে স্থানীয় প্রশাসন।

এ ধরনের কিছু সমস্যার কারণেও কিছু কাজ ধীরগতিতে হয়। অবশ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির ক্ষেত্রে অদক্ষতা, গাফিলতি ও দুর্নীতিকে দায়ী করছেন। যেমন গত ২৩ নভেম্বর প্রকল্প পর্যালোচনার এক সভায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবু বকর ছিদ্দিক মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ তৈরির প্রকল্পের কাজ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। সূত্রমতে, এ সময় তিনি প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের কাজের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ করার প্রকল্পটির নাম ‘আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার প্রচলন (পর্যায়-২)। এর আওতায় সারা দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের ৩১ হাজার ৩৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ করা এবং পৌনে ছয় লাখ শিক্ষক-কর্মকর্তাকে প্রযুক্তিনির্ভর ক্লাস পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ছিল।

শুরুতে এ প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল চার বছর, অর্থাৎ ২০২০ সাল পর্যন্ত। কিন্তু কাজ না এগোনোয় প্রথমে মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়। এরপর তা আরও বাড়িয়ে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

প্রকল্প কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, শ্রেণিকক্ষ মাল্টিমিডিয়া করার ক্ষেত্রে কোনো কাজ না হলেও তারা প্রায় দেড় লাখ শিক্ষক ও কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে গত বছর বেরিয়ে আসে যে প্রশিক্ষণ কাজে পদে পদে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে।

যেমন এ প্রকল্পের সাবেক পরিচালক মো. আবদুস সবুর খান ২০ জায়গায় হওয়া প্রশিক্ষণস্থলে উপস্থিত না হয়েও ‘প্রোগ্রাম পরিচালক’ হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন স্বাক্ষরে প্রায় ১৭ লাখ টাকা সম্মানী নেন। প্রশিক্ষণ-সংশ্লিষ্ট আরও অনেকে এভাবে সম্মানীর নামে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করেন। এরপর প্রকল্পে নতুন পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। যদিও কাজ এগোচ্ছে না। প্রকল্পের ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতার পেছনে বছরের পর বছর ধরে সরকারের টাকা খরচ হচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশি সূত্রে জানা যায়, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ করার জন্য চার ধরনের সরঞ্জাম কেনার কথা—ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর (স্ক্রিনসহ), মডেম ও স্পিকার। এ চারটি সরঞ্জাম মিলিয়ে একটি সেট। এমন মোট ৪৬ হাজার ৪৪৫ সেট সরঞ্জাম কেনার কথা। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) বলা হয়েছিল, কেন্দ্রীয়ভাবে সরাসরি এসব সরঞ্জাম কেনা হবে। কিন্তু দুর্নীতির আশঙ্কাসহ ‘কিছু কারণে’ শিক্ষা মন্ত্রণালয় চাইছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে টাকা দিয়ে দেওয়া হবে। পাশাপাশি সরঞ্জামের নমুনা ও নীতিমালা ঠিক করে দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মতো করে এসব সরঞ্জাম কিনবে। এমন একটি প্রস্তাব যুক্ত করে সংশোধিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছিল। যদিও কমিশন তাতে সায় দেয়নি। সর্বশেষ ২৩ নভেম্বরের এক সভায় আবারও এ বিষয়ে প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ভবন অর্ধনির্মিত, কাজও বন্ধ

শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে জেলা সদরে অবস্থিত ৭০টি সরকারি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে। মেয়াদ ছিল তিন বছর। দফায় দফায় সংশোধন করে প্রকল্পটির মেয়াদ আগামী জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। এই প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। গত আগস্ট পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৭৪ শতাংশের মতো।

যদিও কয়েকটি কলেজে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে ভবন অর্ধনির্মিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। যেমন রাজশাহী সরকারি কলেজের ১০ তলা ভবনের দ্বিতীয় তলার ছাদ পর্যন্ত করে ঠিকাদার আর নির্মাণকাজ করছেন না। একই অবস্থা ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজেরও।

আনন্দ মোহন কলেজে গত শনিবার গিয়ে দেখা যায়, ১০তলা ভবনের তৃতীয় তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে। যদিও গত জুনেই কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার কথা। কলেজের অধ্যক্ষ মো. আমানউল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মৌখিকভাবে একাধিকবার কাজ শেষ করার জন্য তাগিদ হওয়া হয়েছে। তবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

রড, সিমেন্ট ও পাথরের দাম বেড়ে যাওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এখন কাজ করতে আগ্রহী নয়। তারা দর সমন্বয়ের জন্য প্রকল্প পরিচালককে চিঠি দিয়েছে। আনন্দ মোহন ও রাজশাহী কলেজে ভবন নির্মাণের ঠিকাদার এসএএফডি ট্রেডার্সের মালিক আহসান-উজ জামান বলেন, তাদের কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০১৯ সালে। সময় দেওয়া হয় ১৮ মাস। কিন্তু ভবন নির্মাণের জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া হয় আট মাস পর। এর মধ্যে ২০২০ সালে করোনার কারণে ৬ মাস কাজ করা যায়নি। সব মিলিয়ে ১৪ মাস তিনি কাজ করতে পারেননি। তিনি আরও বলেন, এর পরে নির্মাণসামগ্রীর দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বর্তমান দরে কাজ করলে বিপুল টাকা লোকসান হবে।

ভোলা সরকারি কলেজে পাঁচতলা ভবনের তৃতীয় তলা পর্যন্ত কাজ হয়েছে। তবে নিম্নমানের নির্মাণকাজের জন্য চতুর্থ ও পঞ্চম তলার ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। গত শনিবার গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণাধীন ভবনটির পলেস্তারা খসে পড়ছে। ফাটল দেখা দিয়েছে।

কলেজটির অধ্যক্ষ গোলাম জাকারিয়া  বলেন, ২০১৮ সালে তিনতলা পর্যন্ত কাজ শেষ হয়। কিন্তু চলতি বছর ভবনের চতুর্থ তলার কাজ করতে গিয়ে প্রকৌশলীরা দেখেন, কাজের মান খুবই নিম্ন। এরপর কয়েক দফায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে তদন্ত দল এসে ভবনটি পরিদর্শন করেছে। যদিও ভবনটি এখনো পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়নি।

৭০টি কলেজের অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পটি নিয়ে গত আগস্টে মাউশির সভায় আলোচনা হয়। সভার কার্যবিবরণী বলছে, মাউশির মহাপরিচালক নেহাল আহমেদ এতে উল্লেখ করেন, ঢাকা কলেজসহ বেশ কিছু কলেজের ১০ তলা ভবন নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে কয়েক বছর আগে। কিন্তু শুধু লিফট ও জেনারেটর স্থাপন না করায় ভবনগুলো ব্যবহার উপযোগী করা সম্ভব হয়নি। এ জন্য তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।