৩৫০০ কোটি টাকা নয়ছয়ে ১২ ই-কমার্স

নিউজ ডেস্ক।।

পণ্য বিক্রির জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম আদায় করা হাজার হাজার কোটি টাকার যথাযথ ব্যবহার করেনি দেশের অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে শীর্ষ ১২টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা যথাযথভাবে ব্যবহার না করার তথ্য দিয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

ইউনিটের ২০২১-২২ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- এ খাতের সন্দেহজনক ৫০টি প্রতিষ্ঠানের ওপর পরিচালিত তদন্তে ১২টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের তহবিল অপব্যবহারের সন্দেহ রয়েছে। ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন ব্যক্তিদের কাছেও গেছে এসব টাকা। অভিযুক্ত ১২টি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা না হলেও ইভ্যালি ডটকমসহ দেশের নামিদামি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান এ তালিকায় রয়েছে বলে জানিয়েছে বিএফআইইউর একটি সূত্র। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সংবাদ সম্মেলনে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত অর্থবছরে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সন্দেহজনক লেনদেনের ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৬২ শতাংশ। এর মধ্যে ব্যাংক খাতেই বেড়েছে প্রায় ৭৮ শতাংশ। এ সময়ে দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সন্দেহ, চোরাচালানের কারণে এসব জেলায় নগদ লেনদেন বেশি হয়েছে।

বিএফআইইউর প্রতিবেদন বলছে, সন্দেহজনক ৫০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৩টি ই-কমার্স, ৫টি অনলাইনে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান, ৭টি অনলাইন এমএলএম কোম্পানি, ২টি অনলাইন বেটিং অ্যাপ এবং অন্যান্য ৩টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১২টি ই-কমার্সের সদস্য। তবে গ্রাহকের তহবিল অপব্যবহার করা প্রতিষ্ঠানগুলোর কতটি ই-কমার্সের সদস্য সেটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএফআইইউর এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা তহবিল ওই ১২ প্রতিষ্ঠান কীভাবে ব্যবহার করেছে সেটিই মূলত প্রতিবেদনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা দেখেছি, প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের অর্ডার অনুযায়ী দেওয়া অগ্রিম অর্থের ৬৬ শতাংশের বিপরীতে পণ্য সরবরাহ করেছে। বাকি ৩৪ শতাংশ তহবিল বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যা আমাদের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এটি খতিয়ে দেখার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, গ্রাহকদের পণ্য অর্ডারের বিপরীতে ১২টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ১০ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা পেয়েছে। এর মধ্যে ৬ হাজার ১১৬ কোটি টাকা অর্থাৎ ৬৬ শতাংশ গ্রাহকদের পণ্য সরবরাহের বিপরীতে ব্যবহার হয়েছে। বাকি ৩৪ শতাংশ অর্থাৎ ৩ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা পণ্য সরবরাহে নয়, অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক ও এমএফএস থেকে ৬১০ কোটি বা ৬ শতাংশ টাকা নগদে উত্তোলন করা হয়েছে। এ টাকা কোথায় কী কাজে ব্যবহার হয়েছে, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি বিএফআইইউ। এ ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার হয়েছে ৪৪১ কোটি টাকা। এ টাকা বিদেশ ভ্রমণের পাশাপাশি বিলাসীপণ্য ও ফ্ল্যাট ক্রয়, ব্যাংকে এফডিআর ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ হয়েছে।

এ ছাড়া প্রায় ১৪ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন করেছে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানেরই একটি অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তরের ঘটনা ঘটেছে সর্বাধিক।

এই ১২ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও লেনদেন করেছে ৫৯৩ কোটি টাকা। এ নিয়েও সন্দেহ রয়েছে বিএফআইইউর। তাদের পরিচালন ব্যয়েও জটিলতা পেয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাটি। অনেক অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ও পরিচালন ব্যয় খাতে দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪ কোটি টাকার ব্যয় নিয়ে সন্দেহ রয়েছে বিএফআইইউর।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের আগস্ট পর্যন্ত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ২৪৪টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের রিপোর্ট করেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই রয়েছে ৪৯টি লেনদেন নিয়ে সন্দেহ, আরেকটি প্রতিষ্ঠানের ২৩টি। প্রতিবেদনে সন্দেহজনক ২০টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা এবং লেনদেনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। দেখা গেছে, মাত্র ২০টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট রয়েছে ৫৫৯টি। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলোতে ডিপোজিট জমা হয়েছে ১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে উত্তোলনের পর স্থিতি ছিল মাত্র ১৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা।

আর্থিক খাতে বেড়েছে সন্দেহজনক লেনদেন

বিএফআইইউর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বিএফআইইউতে মোট ৮৫৭১টি লেনদেন ও কার্যক্রম (এসটিআর ও এসএআর) সন্দেহজনক মনে করে রিপোর্ট করা হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল ৫২৮০টি। ফলে এক বছরের ব্যবধানে সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রম বেড়েছে ৩ হাজার ২৯১টি বা ৬২ শতাংশ। এই সময়ে ব্যাংকিং খাত থেকে সবচেয়ে বেশি ৭৯৯৯টি এসটিআর ও এসএআরের রিপোর্ট বিএফআইইউতে এসেছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল মাত্র ৪৪৯৫ট। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতে এসটিআর ও এসএআর এক বছরে বেড়েছে ৩৫০৪টি বা ৭৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৫৭টি এসটিআর ও এসএআরের তথ্য পেয়েছে বিএফআইইউ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৬৭০টি।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, সন্দেহজনক লেনদেন বৃদ্ধির পাশাপাশি ২০২১-২২ অর্থবছরে নগদ লেনদেনের তথ্য প্রেরণ (সিটিআর) বেড়েছে। এ সময়কালে ৩ কোটি ৬৮ লাখ ৯০ হাজার সিটিআর লেনদেন হয়েছে। এর মাধ্যমে ২১ লাখ ১১ হাজার ১২৪ কোটি টাকা জমা ও উত্তোলন হয়েছে। সিটিআর লেনদেনের বড় অংশই ঢাকা বিভাগে, যা মোট সিটিআরের ৫৫ শতাংশ। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬ শতাংশ ও রাজশাহীতে ৭ শতাংশ লেনদেন হয়েছে। বিএফআইইউ বলছে, করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নগদ লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে।

প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ নগদ লেনদেন হয়েছে সীমান্তবর্তী কুমিল্লা জেলায় ৩৬ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা। যশোরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩২ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ময়মনসিংহে ২৭ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা, দিনাজপুরে ২৮ হাজার ৫২৯ কোটি টাকা, সিলেটে ২১ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা, নওগাঁয় ২০ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৮ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা, কক্সবাজারে ১৪ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা।

পাচারের টাকা ফেরানো কঠিন: সংবাদ সম্মেলনে বিএফআইইউ প্রধান মো. মাসুদ বিশ্বাস বলেন, দেশ থেকে অর্থপাচার হয় না, এটা বলা যাবে না। প্রতিটা উন্নয়নশীল দেশ থেকেই অর্থপাচারের ঘটনা ঘটে। যেহেতু আমরা উন্নয়নশীল দেশ, সে ক্ষেত্রে আমাদের এখান থেকেও হয়। এ ছাড়া অবৈধ অর্থ ছাড়াও বৈধভাবেও নানাভাবে দেশ থেকে টাকা চলে যাচ্ছে। তবে যে টাকা একবার পাচার হয়ে যায়, সেটা ফেরানো কঠিন। তিনি বলেন, বৈদেশিক বাণিজ্যে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে সর্বাধিক অর্থপাচার হয়। আমাদের এক তদন্তে দেখা গেছে, কোনো কোনো আমদানি পণ্যে ২০ থেকে ২০০ শতাংশ ওভার ইনভয়েসিং হয়েছে। তবে এখন ওভার ইনভয়েসিং কমে এসেছে। দেশ থেকে এখন পর্যন্ত কী পরিমাণ অর্থপাচার হয়েছে, এমন কোনো তথ্য বিএফআইইউর কাছে নেই, জানান তিনি।