১৯ শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন বন্ধ

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের

শিক্ষাবার্তা ডেস্কঃ রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মেয়াদ শেষ হওয়া অ্যাডহক কমিটির ৬৯ শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটিতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে নিয়োগ পাওয়া ১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন বন্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে অবৈধ সুবিধা নিয়ে অ্যাডহক কমিটির একাধিক শাখা প্রধান নিয়োগ নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক।

অভিযোগে জানা গেছে, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের আগের অ্যাডহক কমিটি ৬৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ করেছে। এই নিয়োগ অবৈধ উল্লেখ করে সমালোচনা করছেন অভিভাবক ফোরাম ও সংশ্লিষ্টরা। বিধিবিধান অনুযায়ী অ্যাডহক কমিটির নিয়োগ কিংবা বরখাস্ত করার ক্ষমতা নেই। অথচ রুটিন দায়িত্ব পালনের এই সময়ে ৬৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে কমিটি। শুধু তাই নয়, শাখা প্রধানও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অর্থের বিনিময়ে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরে লিখিত অভিযোগ করে তদন্ত দাবি করেছেন একজন অভিভাবক।

প্রতিষ্ঠানটিতে ৬৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের কথা স্বীকার করেছেন ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি প্রশাসন ক্যাডারের অতিরিক্ত সচিব ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার খলিলুর রহমান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অভিযোগ করলে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হবে কমিটির বৈঠকে।’ ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভালো কিছু করতেও বেগ পেতে হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন এই কর্মকর্তা।

অ্যাডহক কমিটি এভাবে গণনিয়োগ দিতে পারে কিনা জানতে চাইলে জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার  বলেন, ‘অ্যাডহক কমিটি কোনও নিয়োগই দিতে পাবে না, বরখাস্তও করতে পারে না।’

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ অভিভাবক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মজিদ সুজন বলেন, ‘পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়ে অ্যাডহক কমিটি গণহারে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে। আর ১০ লাখ করে টাকা নিয়ে শাখা প্রধান নিয়োগ দিয়েছে কমিটি। এটি নিয়ে সচেতন অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানটিতে সরকারি অধ্যক্ষ এবং সভাপতি সরকারি বড় কর্মকর্তা হওয়ার পর দুর্নীতি আরও বেড়ে গেছে। সুষ্ঠু তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

এদিকে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অভিযুক্ত শিক্ষিকা ফাতেমা জোহরা হকের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি নিষ্পত্তির পর আদালত তাকে প্রতিষ্ঠানটিতে যোগদান করানোর নির্দেশ দিলেও অ্যাডহক কমিটি তাকে যোগদান করতে দেয়নি। অ্যাডহক কমিটি ওই শিক্ষককে যোগদান করাতে পারবে না বলে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের বাইরে রেখেছে। অথচ ওই অ্যাডহক কমিটি ৬৯ জনকে অবৈধভাবে নিয়োগ দিয়েছে। শাখা প্রধান নিয়েছে কোনও প্রকার নিয়ম না মেনেই।

অ্যাডহক কমিটির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন

২০২১ সালে প্রথম অ্যাডহক কমিটি নিয়োগ দেওয়া হয় ৫ ডিসেম্বর। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার খলিলুর রহমানকে সভাপতি, অধ্যক্ষ কামরুননাহারকে সদস্য সচিব, নন-এমপিও শিক্ষক ড. ফারহানা খানম এবং অভিভাবক প্রতিনিধি ও আবু সালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খানকে সদস্য করে চার সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়। ছয় মাস মেয়াদের এই কমিটি অনুমোদন করে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। এই মেয়াদে গভর্নিং বডির নির্বাচন করতে ব্যর্থ হলে একই সদস্য মনোনয়ন দিয়ে নতুন কমিটির অনুমোদন চাওয়া হয় প্রতিষ্ঠান থেকে। দ্বিতীয় অ্যাডহক কমিটিও নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়। এই অ্যাডহক কমিটির মেয়াদের মধ্যে নিয়োগ দেওয়া হয় শাখা প্রধান এবং ৫০ জন শিক্ষক-কর্মচারী। নতুন কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর না করে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি অতিরিক্ত সময়ে ডিসেম্বর মাসে ১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেয়। অতিরিক্ত সময়ে অ্যাডহক কমিটি নিয়মের তোয়াক্কা না করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি নির্বাচিত করে। নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরুর আগে নিয়োগ দেওয়া ১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন বন্ধ করে কর্তৃপক্ষ।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দ্বিতীয় মেয়াদে একই সদস্য দিয়ে অ্যাডহক কমিটি অনুমোদনের আবেদন উদ্দেশ্যমূলক ছিল। তাছাড়া সরকারি কর্মকর্তা সভাপতি এবং সরকারি কলেজের শিক্ষক অধ্যাপক থাকার পরও নতুন কমিটি নির্বাচিত হওয়ার পর অবৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রাখা হয়েছে। এসব অভিযোগের পরও অভিযুক্ত বিভাগীয় কমিশনার আবার পূর্ণাঙ্গ কমিটির সভাপতি রয়েছেন। অ্যাডহক কমিটির আগের সব কাজ বৈধতা দিতে আগামী ১৩ জানুয়ারি নতুন কমিটির সাধারণ সভা আহ্বান করা হয়েছে।

গভর্নিং বডি ও অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

নিয়োগ ও বরখাস্ত করার ক্ষমতা না থাকলেও ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৫০ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে অ্যাডহক কমিটি। পূর্ণাঙ্গ কমিটি নির্বাচিত হওয়ার পরও ক্ষমতা হস্তান্তর না করা অবস্থায় আরও ১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। ইংরেজি ভার্সনে শাখা প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলা বিষয়ের শিক্ষককে। এই শিক্ষক আজিমপুর শাখায় ভারপ্রাপ্ত শাখা প্রধানের দায়িত্বে থাকাকালে শাখা প্রধানের নিয়োগ পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

ভর্তি পরীক্ষা, নিয়োগ পরীক্ষা, বেসরকারি সংস্থার ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে আদায় করা ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। বিদ্যুতের ক্রাইসিসের সময় এসি চালিয়ে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রায় তিন লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। টেন্ডার ছাড়া ছয়টি দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ক্যারাতে ক্লাব করে অবৈধভাবে প্রশিক্ষক নিয়োগ, ভিএনএসসি শিল্পাঙ্গণ নামে প্রতিষ্ঠান খুলে অবৈধভাবে পাঁচ জন প্রশিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে প্রতিষ্ঠানের ফান্ডে জমা না দেওয়া, অন্যান্য খাতের আয় ব্যাংকে জমা না দিয়ে ভাগ করে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা।

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরে জমা দেওয়া লিখিত অভিযোগে বিভিন্ন দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ কামরুন নাহার বলেন, ক্লাস করানোর মতো শিক্ষক নেই। পার্টটাইম টিচার হিসেবে তারা নিয়োগ পেয়েছেন, যখন স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হবে তখন তারা বাদ যাবে।’

অধ্যক্ষ আরও বলেন, অনেক বছর আগে থেকে কিছু শিক্ষক পার্টটাইম হিসেবে নিয়োগে আছেন। আরও শিক্ষক দরকার।

আগে থেকে যারা পার্টটাইম হিসেবে রয়েছেন তাদের স্থায়ী করা হয়নি কেন জানতে চাইলে বলেন, ‘কেউ আগে দায়িত্ব নিয়ে স্থায়ী করেননি।’

শিক্ষাবার্তা ডট কম/এএইচএম/০১/১৫/২৩