১৮২ কলেজের পদসৃজনে আসছে ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’

প্রকাশিত: ১১:২০ পূর্বাহ্ণ, শনি, ৬ মার্চ ২১

নিউজ ডেস্ক।।

মহামারি করোনার কারণে সদ্য সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক-কর্মচারীর চাকরি আত্তীকরণ প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা তৈরি হয়। এ জট কাটাতে ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ প্রোগ্রামের মাধ্যমে মাত্র চার সপ্তাহের মধ্যে অবশিষ্ট ১৮২টি কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগ সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষ করতে ২০টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিমের কাজ তদারকি করতে অতিরিক্ত সচিবদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ছুটির দিনেও কাজ করতে টিমের সঙ্গে জড়িতদের সম্মানি বাবদ প্রায় ২৯ লাখ টাকার বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এতথ্য জানা গেছে।

বিষয়টি স্বীকার করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো: মহবুব হোসেন গতকাল সন্ধ্যায় ভোরের ডাককে বলেন, বাংলাদেশে এই প্রথম বেরসকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একসঙ্গে সরকারিকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রায় ৬ শতাধিক স্কুল-কলেজ সরকারিকরণ ঘোষণার পর ওইসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীর চাকরি আত্তীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ প্রক্রিয়ায় অনেক ধাপ রয়েছে। এগুলো একটা একটা করে শেষ করলে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পর এ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে ১০টা কমিটি করেছিলাম। কিন্তু সেটা করোনার কারণে কাজ আটকে যায়। এ বিবেচনায় আমরা একটি ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ কর্মসূচি হাতে নিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যে আমাদের স্কুলগুলো আত্তীকরণ প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কলেজগুলোর আরও ১৮২টি বাকি রয়েছে। এগুলোর শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগ সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাইয়ের কাজ দ্রুত শেষ করতে মন্ত্রণালয় ও মাউশির নেতৃত্বে ২০টি টিম গঠন করে দিয়েছি। আগামী চার সপ্তাহে তারা এ কাজটি শেষ করবে।

সচিব জানান, সবগুলো কলেজের কাজ একসঙ্গে যাচাই-বাছাই শেষ করে পদসৃজনের প্রস্তাব তৈরি করে জনপ্রশাসনে পাঠানো হবে। ইতিমধ্যে আমরা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মিটিং করেছি। তারা একটা চেকলিস্ট করেছে। সে অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারীর পদসৃজন করা হবে।

জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রæতি ও নির্দেশনা অনুযায়ী ২০১৮ সালে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি কলেজবিহীন উপজেলায় ৩০৩টি কলেজ সরকারি করা হয়। প্রায় তিন বছর পরেও এসব কলেজের অন্তত ২০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর চাকরি আত্তীকৃত করা হয়নি। এরই মধ্যে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষক-কর্মচারী অবসরে চলে গেছেন। প্রতিদিনই এ তালিকায় যুক্ত হচ্ছেন অসংখ্য শিক্ষক-কর্মচারী।

সূত্র জানায়, গত রোববার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেনের সভাপতিত্বে একটি সভায় হয়েছে। সভায় আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী সরকারিকৃত ৩০৩টি কলেজের মধ্যে ১৮২টি কলেজের পদ সৃজনের জন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগ সংক্রান্ত কাগজ পত্র যাচাই-বাছাই শেষ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অবশিষ্ট কলেজগুলোর যাচাই কার্যক্রম এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। দ্রুত যাচাই কাজ শেষ করতে গঠিত ২০টিমের কর্ম পরিকল্পনাও নির্ধারন করে দেয়া হয়েছে।

এগুলো হলো- আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে কলেজগুলোর কাগজ-পত্র যাচাই-বাছাই শেষ করা, টিম প্রধানদের স্ব স্ব শাখায় কর্মরত প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী কর্তৃক বাছাই কার্যক্রম শেষে চূড়ান্ত কার্যবিবরণী প্রস্তুত করা, পদ সৃজনের কাজ দ্রুত শেষ করতে এ কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মানী প্রদানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করার জন্য প্রশাসন ও অর্থ অনুবিভাগকে অনুরোধ করা, তদারককারী কর্মকর্তা কর্তৃক প্রতি সপ্তাহ শেষে তার অধীন টিমের কাজের অগ্রগতি অবহিতকরা এবং অত্যাবশ্যক না হলে যাচাই-বাছাই কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন প্রকার ছুটি ভোগ না করা।

সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, সরকারিকৃত ৩০৩টি কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের কাগজ-পত্র যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পাঁচটি টিম কাজ করছিল। এই কমিটি এরই মধ্যে ১২১টি কলেজের বাছাই কার্যক্রম শেষ করেছে। এর মধ্যে একটি কলেজের ২১টি পদ সৃজনে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি অনুমোদন দিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে পদ সৃজনের আদেশ জারি প্রক্রিয়াধীন। ৩৭টি কলেজের পদ সৃজনের প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পদ সৃজনের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সভায় ৩৪টি কলেজের জন্য পদ সৃজনের সুপারিশ করা হয়েছে। যা সচিব কর্তৃক অনুমোদিত। ৩৪টি কলেজের কাগজপত্র সত্যায়িত/প্রতিস্বাক্ষরিত হওয়ার পর পদ সৃজনের প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এর বাইরে পাঁচটি কলেজের কার্যবিবরণী কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে। ১৬টি কলেজের কার্যবিবরণী খসড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং ২৮টি কলেজের খসড়া কার্যবিবরণী প্রস্তুতের কার্যক্রম বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন। তবে ১৮২টি কলেজের কাগজ-পত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু হয়নি। এসব কলেজের পদসৃজন করতে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই কার্যক্রম দ্রুত শেষ করতে ২০টি টিম গঠন করা হয়েছে।
২০ টিমে যারা রয়েছেন: মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন শাখায় কর্মরত উপসচিবদের টিমের প্রধান করা হয়েছে। আর টিমের কাজ তদারকি করতে এক জন অতিরিক্ত সচিবকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এক নম্বর টিমে উপসচিব মো. নজরুল ইসলাম, দুই নম্বর টিমে উপসচিব মো. ইব্রাহিম ভূঁইয়া, টিম তিনে উপসচিব মোহাম্মদ রবিউল ফয়সালকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এই তিনটি টিমের কাজ তদারকি করবেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও অর্থ) মো. হাসানুল ইসলাম। টিম চারে উপসচিব মো. কামরুল হাসান। টিম পাঁচে উপসচিব মোহাম্মদ জামাল হোসেনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। টিম চার ও পাঁচের কাজ তদারকি করবেন অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক-২) মোমিনুর রশিদ আমিন। টিম ছয়ে উপসচিব আনম তরিকুল ইসলাম, টিম সাতে উপসচিব বেগম খালেদা আক্তারকে ও টিম আটে উপসচি ড. মো. মনিরুজ্জামানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। টিম ছয়, সাত ও আটের কাজ তদারকি করবেন অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মো. বেলায়েত হোসেন তালুকদার। টিম ১০ এ উপসচিব মো. নূর-ই-আলম, টিম ১১ এ উপসচিব নীলিমা আফরোজ, টিম-১২ এর প্রধান করা হয়েছে সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ ইছমত উল্লাহকে। টিম নয় থেকে ১২’র কাজ তদারকি করবেন অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) একেএম আফতাব হোসেন প্রমানিক। টিম-১৩তে উপচিব মো. ফরহাদ হোসেন, টিম-১৪ উপসচিব ড. শ্রীকান্ত কুমার চন্দ, টিম-১৫তে উপসচিব মো. মঈনুল হাসান, টিম-১৬’র প্রধান করা হয়েছে উপসচিব মোহাম্মদ আবু নাসের বেগকে। টিম ১৩ থেকে ১৬ পর্যন্ত তদারকি করবেন অতিরিক্ত সচিব (কলেজ) মু. ফজলুর রহমান। টিম-১৭ তে উপসচিব মোহা. লিয়াকত আলী, টিম-১৮: উপসচিব জনাব শরীফ মোঃ ইসমাইল হোসেন, টিম-১৯ উপসচিব আসমা নাসরীন, টিম-২০ এর প্রধান করা হয়েছে উপসচিব মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামকে। টিম ১৭ থেকে টিম ২০ পর্যন্ত কাজের তদারকি করবেন অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) কাজী মনিরুল ইসলাম।

সূত্র জানায়, ২০টিমের কাজের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মানী দিতে একটি বাজেট প্রস্তাব তৈরি করেছে মন্ত্রণালয়ের কলেজ শাখা-৬। প্রস্তাবিত বাজেটে ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, প্রতিটি টিমের মাধ্যমে প্রতিটি কলেজের শিক্ষকদের সকল কাগজ পত্র /শিক্ষা সনদ/প্রশিক্ষণ সনদ যাচাই করতে প্রতিটি তিন কাজ করবেন। কলেজ প্রতি তিন জনের জন্য তিন হাজার টাকা সম্মানী দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ৩০৩টি কলেজের জন্য এ খাতে মোট নয় লাখ নয় হাজার টাকা চাওয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে কার্যবিবরনী প্রস্তুত। নিরীক্ষা ও যাচাই চূড়ান্ত করতে একজনের জন্য কলেজ প্রতি এক হাজার করে মোট তিন লাখ তিন হাজার টাকা। শিক্ষক-কর্মচারীদের সকল কাগজপত্র প্রত্যয়ন করতে কলেজ প্রতি একজনকে ৫০০ টাকা করে মোট এক লাখ সাড়ে ৫১ হাজার টাকা। কমিটির সদস্যদের সম্মানী বাবদ কলেজ প্রতি ছয় জনকে ৫০০ টাকা হারে মোট নয় লাখ নয় হাজার টাকা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে কার্যবিবরণী প্রেরণের জন্য নথি প্রস্তুত ও আনুষাঙ্গিক কার্যাদি শেষ করতে সংশ্লিষ্ট শাখার দুই জন কর্মচারীকে কলেজ প্রতি ৫০০ টাকা করে মোট তিন লাখ তিন হাজার টাকা। আপ্যায়ন ও অন্যান্য খরচ বাবদ কলেজ প্রতি এক হাজার টাকা করে মোট তিন লাখ তিন হাজার টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে যাচাই-বাছাই শেষ হওয়া কলেজের জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করায় প্রশ্ন উঠেছে।

সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট ২৭১টি বেসরকারি কলেজ সরকারি করার জিও জারি হয়েছে। পরবর্তিতে ধাপে ধাপে বাকি কলেজগুলো সরকারি করার জিও জারি করা হয়েছে। বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের বিরোধীতা ও আমতান্ত্রিক জটিলতার কারণে প্রায় তিন বছরে মাত্র একটি কলেজের পদ সৃজন হয়েছে। সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী বয়স ৫৯ বছর হওয়ায় গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩৭২ জন শিক্ষক-কর্মচারী অবসরে গেছেন। প্রায় তিন বছর আগে কলেজগুলো সরকারি করা হলেও শিক্ষক-কর্মচারীদের আত্তীকৃত না করায় তারা সরকারিকরণের সুফল ছাড়াই অবসরে গেছেন। তবে তাদের বিষয়ে সরকার জিও জারির দিন থেকে সরকারি সুবিধা দেয়ার সিদ্বান্ত নিয়েছে।

সূত্র জানায়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বর্তমান সচিব মাহবুব হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পরে তিনি পদসৃজনের কাগে গতি আনতে গত বছরের শুরুতে পাঁচটি কমিটি করে দ্রæত কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছিরেন। কিন্তু করোনার কারণে কার্যক্রম স্থবির হয়ে পরে। আর এই বিশাল কর্মযজ্ঞ মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি কলেজ শাখার পক্ষে শেষ করতে বহু বছর লেগে যাবে। কারণ হিসেব তারা বলেন, প্রতিটি কলেজে গড়ে অর্ধ শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগসহ শিক্ষাগত সনদ যাচাই-বাছাই করতে মাসের পর মাস সময় দরকার। শিক্ষাবোর্ডে ও এনটিআরসিতে সনদ যাচাই করতেও সময় দরকার হয়। কাগজপত্র যাচাই বাছাই করার জন্য বেসরকারি কলেজ শাখায় গুটি কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন। এছাড়া সারা দেশের বেসরকারি কলেজগুলোর কার্যক্রম এই শাখা থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। গত বছরের ১ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ে বেসরকারি কলেজ শাখায় (৫) উপসচিব হিসেবে যোগদান করেন মো. মঈনুল হাসান। তিনি শাখার দুই-তিন জন কর্মচারীকে নিয়ে পদসৃজনের কাজে গতি আনতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। সম্প্রতি তাকে বেসরকারি কলেজ শাখা ছয়েরও অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়। এমন পরিস্থিতে দিন রাত কাজ করেও কয়েক বছরেও পদ সৃজনের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে না। অপরদিকে সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক-কর্মচারীরা দ্রুত পদ সৃজনের জন্য নানা কর্মসূচি পালন করছেন।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.