১০ নারীর স্বীকৃতি

প্রকাশিত: ৭:০২ পূর্বাহ্ণ, বৃহঃ, ৪ মার্চ ২১

নিউজ ডেস্ক।।

বাগেরহাটের শরণখোলার বীর মুক্তিযোদ্ধা আয়শা বেগম। তার কাহিনি শুনলে গা শিউরে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই তার স্বামী আবদুল মান্নান যোগ দেন ৯ নম্বর সাব-সেক্টর সুন্দরবন অঞ্চলে। দেশের জন্য যুদ্ধ করে চার মাসের মাথায় পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় তুষখালী এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে তিনি শহীদ হন। এ খবর শুনে আয়শা বেগম পাগলের মতো ছেলেমেয়েদের নিয়ে যশোর থেকে শরণখোলায় রওনা হন।

পথে হানাদার বাহিনী কুপিয়ে তাকে জখম করে, যার চিহ্ন এখনও বয়ে চলছেন। ওই সময় তার ১২ বছরের মেয়ে তাসলিমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় হানাদার বাহিনী। আজও সেই মেয়ের খোঁজ পাননি তিনি। মাত্র ছয় মাস বয়সের শিশুপুত্র কামালকে শরণখোলার বগী গ্রামে বাবার বাড়িতে রেখে স্বামী ও মেয়ে হারানোর প্রতিশোধ নিতে এবং দেশকে শত্রুমুক্ত করতে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন আয়শা। যুদ্ধে যাওয়ার পর খবর পান মায়ের বুকের দুধ না পেয়ে তার সেই ছোট শিশু কামাল মারা গেছে। দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত তিনি যুদ্ধ থেকে ফেরেননি। সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা আয়শা বেগমসহ পাঁচ নারী মুক্তিযোদ্ধাকে এবার আমিন জুয়েলার্স অপরাজিতা-২০২১ সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। সম্মাননা জানানো বাকি চার বীর মুক্তিযোদ্ধা হলেন- শহীদজায়া বেগম মুশতারী শফী, রিজিয়া বেগম, হাফিজা বেওয়া ও শিল্পী শাহীন সামাদ।

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রথমবারের মতো এবারের আয়োজনে নারী মুক্তিযোদ্ধাসহ ছয়টি ক্যাটাগরিতে ১০ জন নারীকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। সম্মাননাপ্রাপ্ত অন্যরা হচ্ছেন- কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের প্রথম নারী উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম, নারী উদ্যোক্তা ও প্রমিক্সো গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং অ্যাসোসিয়েশন অব গ্রাসরুটস উইমেন এন্ট্রাপ্রেনিউরস বাংলাদেশের (এজিডব্লিউইবি) সভাপতি মৌসুমী ইসলাম, এভারেস্টজয়ী প্রথম বাংলাদেশি নারী নিশাত মজুমদার ও ফিফায় প্রথম বাংলাদেশি রেফারি জয়া চাকমা।

রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে গত মঙ্গলবার এই নারী ব্যক্তিত্বদের সম্মাননা জানানোর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। বিশেষ অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুননেসা ইন্দিরা। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে এ সম্মাননার আয়োজন করেছে বাঘবাংলা এন্টারটেইনমেন্ট। মিডিয়া পার্টনার ছিল দৈনিক সমকাল ও টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভি। আয়োজনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান প্রাইম ব্যাংক ও কাজী এগ্রো এবং সহসহযোগী ভোগ বাই প্রিন্স ও ওপেন আইটি। এছাড়া রেডিও পার্টনার সিটি এফএম, ম্যাগাজিন পার্টনার ক্যানভাস ও ইভেন্ট পার্টনার বারোভূত।

অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয় মুক্তিযোদ্ধা আয়শা বেগমসহ অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানে কথা। শহীদজায়া হিসেবে পরিচিত, জীবনযুদ্ধে হার না মানা এক আলোকবর্তিকার নাম মুশতারী শফী। দেশ, সমাজ ও নারীর কল্যাণে হেঁটেছেন দীর্ঘপথ। তার চিন্তায় ষাটের দশকে গড়ে ওঠা ‘বান্ধবী সংঘ’ তখন ছিল নারীর অবাধ বিচরণের স্বতন্ত্র ক্যানভাস। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অনন্য অবদান রেখেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রাণপ্রিয় স্বামী ও ছোট ভাইকে হারিয়েছেন। ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার প্রথম পরিকল্পনা তার বাসভবনে। এই বেতার কেন্দ্রসহ আগরতলায় গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন।

একাত্তরে ঢাকাতেই নির্যাতিত হন রিজিয়া বেগম। শীর্ণ দেহে প্রায় এক সপ্তাহ পড়ে ছিলেন খালের পাশে। মুক্তিযুদ্ধে হেমায়েত বাহিনীর সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। একাত্তরের বর্বর গণহত্যার সাক্ষী শেরপুরের সোহাগপুরের বিধবা মুক্তিযোদ্ধা হাফিজা বেওয়ার কাহিনিও তুলে ধরা হয় অনুষ্ঠানে।

শিল্পী শাহীন সামাদ। তিনি কণ্ঠের মাধ্যমে অংশ নিয়েছেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। একাত্তরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একজন শিল্পী ছিলেন। সে সময় ৩৬টি দে

শাত্মবোধক গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। তখন বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থায় যোগ দেন তিনি।
মুক্তিযোদ্ধা এই নারীদের অবদানের স্বীকৃতি দেওয়ায় অভিনন্দন জানান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের পুরস্কৃত করা হয়। এবার নারী মুক্তিযোদ্ধাদের পুরস্কৃত করা হচ্ছে, যা বিরল। মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নারীদের সর্বত্র সম্মান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের ঘর দেওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষ মুক্তিযোদ্ধা ১৪ শতাংশ আর নারী মুক্তিযোদ্ধা শতভাগ দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘নারী পরিবার ও সমাজের অংশ। এর পরেও তাদের অবজ্ঞা ও অবহেলা করি। তাদের স্বীকৃতি দিতে চাই না। এটি প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার প্রতিফলন। তবুও নারীরা নিজে পুরুষদের প্রাধান্য দেন। এই নারীদের জন্য আমরা মুখে যা বলি বাস্তবে তা যেন করি।’ সরকারের উদ্যোগে এখন দেশে নারীরাও সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে ১৬ জন সচিব, বিচারপতিসহ বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন নারীরা। আগামী দিনে নারীরা আরও এগিয়ে যাবেন।

সম্মাননা নিতে এসে নারী মুক্তিযোদ্ধা আয়শা বেগম আবেগাপ্লুত হয়ে ‘মুজিবুরের এক নাম স্বাধীনতা’ গানের দু’লাইন গেয়ে শোনান। বেগম মুশতারী শফী বলেন, দেশের স্বাধীনতা এসেছে। এ ক্ষেত্রে বড় অবদান বঙ্গবন্ধুর। অনুষ্ঠানে শাহীন সামাদ যুদ্ধের সময়ে গাওয়া গান শোনান।

অপরাজিতা সম্মাননা ২০২১ জুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান অনেক বড়। নারীরা কেউ যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিলেন না। যুদ্ধে নারীদের নির্যাতন বেশি হয়েছে। নারীরা যুদ্ধে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাদের সম্মান জানাতে নারী মুক্তিযোদ্ধা বলে সম্বোধনের আহ্বান জানান তিনি।

জুরি বোর্ডের সদস্য কবি আলফ্রেড খোকন বলেন, নারীরা মনস্তাত্ত্বিকভাবে কিছুটা পিছিয়ে আছে। এ সম্মাননা তাদের অগ্রযাত্রায় অবদানের স্বীকৃতি।

সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও জুরি বোর্ডের অন্যতম সদস্য মুস্তাফিজ শফি বলেন, সব বাধা অতিক্রম করে দেশের নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন। অগ্রগামী সেইসব নারীকে সম্মান জানাতেই এই আয়োজন। আমরা চাই, নারীর জয় হোক; দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক।

এনটিভির পরিচালক আশফাক উদ্দিন আহমেদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধে নারীরা অনেক অবদান রেখেছেন। এখন দেশ গঠনে অবদান রাখছেন। তাদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ সম্মাননা।

আমিন জুয়েলার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী আমিনুল ইসলাম বলেন, নারী মানে নির্ভরতা, সহজ ও কোমলতা। নারীরা কোনো প্রতিকূলে পিছপা হন না। মুক্তিযুদ্ধে বড় স্বাক্ষর রেখেছেন তারা। তাই আমিন জুয়েলার্স মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার ৫০ বছর সামনে রেখে প্রথমবারের মতো এ আয়োজন করেছে। আগামী দিনে এই আয়োজন অব্যাহত থাকবে।

কাজী এগ্রোর চেয়ারম্যান ইসমাত আরা জাকিয়া বলেন, অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি সামাজিক ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছেন নারীরা। একজন সফল পুরুষের পেছনে নারী ভূমিকা রাখছেন। প্রত্যেক নারী স্বাবলম্বী হয়ে উঠুক ও এগিয়ে যাক।

প্রাইম ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এন এম মাহফুজ বলেন- মুক্তিযুদ্ধ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যবসাসহ নানা ক্ষেত্রে নিজ নিজ অবদানে উজ্জ্বল নারী। করোনা দুর্যোগেও অসীম সাহসিকতা নিয়ে তারা কাজ করেছেন। এ জন্য তাদের সম্মান জানানো প্রয়োজন।

বাঘবাংলা এন্টারটেইনমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাকিল ইবনে সুলতান বলেন, নারীরা এখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন। তাদের সম্মান জানাতে এ পুরস্কারের আয়োজন করা হয়েছে। তিনি পুরস্কার পাওয়া নারীদের অভিনন্দন জানান।

তানিয়া আহমেদের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেন নৃত্যশিল্পী সাদিয়া ইসলাম মৌ, শিল্পী লিজাসহ অন্যরা।

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.