হজ একটি ফরজ ইবাদত

নিউজ ডেস্ক।।

হজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। স্বাধীন এবং সামর্থ্যবান নারী-পুরুষদের জন্য জীবনে একবার হজ ফরজ। হাজীরা হলেন আল্লাহর মেহমান। আল্লাহ তায়ালা তাদের দোয়া কবুল করেন। তাদের গুনাহ ক্ষমা করেন। মানুষের হায়াত এবং মাউতের যেহেতু কোনো গ্যারান্টি নেই, তাই কারো ওপর হজ ফরজ হওয়ার সাথে সাথে তা আদায় করে ফেলাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

হজ আরবি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ হলো সংকল্প করা। আর পরিভাষায়, নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট কার্যাবলির মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্থান তথা বাইতুল্লাহ শরিফ জিয়ারত করা অথবা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে বাইতুল্লাহ যাওয়ার সংকল্প করাকে হজ বলা হয়। (কাওয়ায়েদুল ফিকহ-২৫)

জীবনে একবার হজ ফরজ : হজ স্বাধীন সামর্থ্যবান নারী-পুরুষদের জন্য জীবনে একবার ফরজ। সামর্থ্যবান বলতে আর্থিক ও দৈহিক সামর্থ্য উভয় বুঝায়। হজরত ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, লোকসকল! আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ওপর হজ ফরজ করেছেন। হজরত আকরা ইবনে হাবিস রা: দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এটা কি প্রত্যেক বছর ফরজ? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সা; বললেন, আমি যদি হ্যাঁ বলতাম তবে ফরজ হয়ে যেত। আর যদি প্রতি বছর হজ ফরজ হয়ে যেত তবে তা তোমরা সম্পাদন করতে সক্ষম হতে না। হজ জীবনে একবারই ফরজ। কেউ যদি একাধিক করে তবে তা হবে নফল হজ। (বুখারি-৭২৮৮)
হজ দৈহিক ও আর্থিক ইবাদত : ইবাদত সাধারণত তিন ধরনের। ১. ইবাদতে বদনী তথা দৈহিক ইবাদত যেমন সালাত, রোজা। ২. ইবাদতে মালী তথা আর্থিক ইবাদত যেমন জাকাত। ৩. ইবাদতে মুশতারিকাহ তথা দৈহিক ও আর্থিক উভয়ের সমষ্টি যেমন হজ। হজে শরীরের সুস্থতা যেমন প্রয়োজন তেমনি আর্থিক সচ্ছলতারও প্রয়োজন। সুতরাং হজের মধ্যে দৈহিক ও আর্থিক উভয় প্রকারের ইবাদত বিদ্যমান। তাই এর গুরুত্ব অপরিসীম।

হজের গুরুত্ব : হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ করল এবং এ সময় অশ্লীল কাজ ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকল সে নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসবে। (বুখারি-১৫২১, মুসলিম-১৩৫০)
অপর হাদিসে এসেছে, হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, তোমরা হজ ও উমরাহ সাথে সাথে করো, কেননা এ দু’টি দারিদ্র্য ও গুনাহ এভাবে দূর করে, যেভাবে হাঁপর লোহা, স্বর্ণ ও রৌপ্যের ময়লা দূর করে। আর মকবুল হজের বিনিময় জান্নাত ব্যতীত কিছুই নয়।
(ইবনে মাজাহ : ২৮৮৭)

হাজীগণ হলেন আল্লাহর মেহমান। মেহমানের চাহিদা পূরণ করা, মেহমানের দোয়া কবুল করা মেজবানের কর্তব্য। হাদিস শরিফে হাজীগণকে আল্লাহর প্রতিনিধি দল বলা হয়েছে এবং তাদের দোয়া কবুল ও মাগফিরাতের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজী সা: ইরশাদ করেন, হজ ও উমরাহকারীগণ হলেন আল্লাহর প্রতিনিধি দল। তারা যদি তাঁর কাছে প্রার্থনা করে তিনি তা কবুল করেন আর তারা যদি তাঁর কাছে ক্ষমা চান তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। (ইবনে মাজাহ-২৮৯২)

হজের বিনিময় একমাত্র জান্নাত : হজের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়, হজ করলে আল্লাহ বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন এবং হাজীগণ আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ লাভ করে। বান্দাগণ হজের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সফলতা অর্জন করতে পারে। আর তা হলো জান্নাত লাভের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা। যেমন হাদিসে এসেছে, হজে মাবরুর তথা মকবুল হজের প্রতিদান হলো একমাত্র জান্নাত। (তারিখুল কবির-১/১৩৩)

হজ দ্বারা গুনাহ মাফ হয় : হজ দ্বারা বান্দাহর সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। হজের মাধ্যমে হাজীগণ মাতৃগর্ভ হতে ভূমিষ্ঠ হওয়া নবজাতক শিশুর মতো মাসুম তথা নিষ্পাপ হয়ে যায়। নবীজী সা: ওমর রা:-কে বললেন, হে ওমর! তুমি কি জান না, নিশ্চয় ইসলাম মুসলমানদের পূর্বের সব গুনাহ মিটিয়ে দেয়, হিজরত মুহাজিরদের পূর্বের সব গুনাহ মুছে দেয় এবং হজ হাজীদের পূর্বের সব গুনাহ ঝেড়ে ফেলে। (আত-তারগিব ওয়াত তারহিন-২/১৬৫)

হজ পরিত্যাগ করার পরিণাম : হজ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। বিনা কারণে পরিত্যাগ করা মারাত্মক গুনাহ। হযরত আলী রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি বাইতুল্লায় পৌঁছার পথ খরচের মালিক হয়েছে, অথচ হজ করল না, সে ইহুদি হয়ে মৃত্যুবরণ করুক অথবা নাসারা হয়ে এতে কিছু আসে যায় না।(তিরমিজি-৮১২)

অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তিকে দেখা যায় তারা বিভিন্ন অজুহাতে হজে বিলম্ব করে কিংবা হজ থেকে বিরত থাকে। কেউ বলে আগে একটা বাড়ি করি তারপর হজ করব। কেউ বলে আগে ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিয়ে পরে হজ করব আবার কেউ বলে এত তাড়াতাড়ি হজ করলে করলে রাখতে পারব না বয়স হোক তারপর হজ করব ইত্যাদি। কিন্তু এসব অজুহাত শরিয়ত গ্রহণযোগ্য নয়। বরং ধন, স্বাস্থ্য হায়াত চিরস্থায়ী নয় বিধায় যথাসম্ভব হজ তাড়াতাড়ি আদায় করা উত্তম।

হজ মহান আল্লাহ পাকের নির্দেশ এবং মুসলমানদের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কোনোভাবেই এই মহান ইবাদতকে পরিত্যাগ করা উচিত নয়। তাই, যাদের ওপর হজ ফরজ হয়েছে তারা যেন দ্রুত হজ আদায় করে নেয়। দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণে হজ আদায় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা মুমিন-মুসলমানদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।
লেখক : সহকারী শিক্ষক চরণদ্বীপ রজভীয়া ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা, বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম