‘হজে মাবরুর’ কী ও কেন

  • জাফর আহমাদ।।

    আমরা প্রায়ই হজে গমনকারী আল্লাহর মেহমানদের জন্য দোয়া করি, আল্লাহ আপনার হজকে ‘হজে মাবরুর’ হিসাবে কবুল করুন। কিন্তু আমরা অনেকেই হয়তোবা জানি না ‘মাবরুর’ কী? এবং হজে কেন এ শব্দটিকে জুড়ে দেয়া হলো। ইসলামের অন্যান্য স্তম্ভ তথা সালাত, সওম ও জাকাতের বেলায় এ শব্দটি ব্যবহার করা হলো না কেন? এমনটি বললেও তো হতো যে, ‘আল্লাহ আপনার হজকে কবুল করুন।’ সত্যি সত্যিই হজের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের জন্য ‘মাবরুর’ অত্যন্ত জরুরি এবং মাবরুরসহ হজ কবুল হওয়া অনেক অনেক সৌভাগ্যের বিষয়।

    ‘মাবরুর’ আরবি শব্দ, যা ‘বিররুন’ শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ হলো : মানুষের প্রতি ভালো আচরণ করা, অন্যের প্রতি কর্তব্য পালন করা এবং অন্যের অধিকার পূরণ করা। এবং বিররুন-এর বিপরীতধর্মী তিনটি কাজ না করা। এক. কারো সাথে ঝগড়া না করা। দুই. অশালীন কাজ না করা। তিন. গুনাহ না করা।
    হজের পদে পদে অর্থাৎ বাড়ি থেকে মক্কায় পৌঁছা, হজের কার্য সম্পাদন করে বাড়ি ফেরা পর্যন্ত ‘বিররুন’-এর প্রয়োজনীয়তা অতীব জরুরি। লাখ লাখ মানুষের বিশাল সম্মেলন ‘বিররুন’ ছাড়া এর শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন কোনোটিই সম্ভব নয়।

    আপনি স্বতন্ত্রভাবে আল্লাহর একজন সম্মানিত মেহমান। আপনি ইহরামের কাপড় পরে মৃত ব্যক্তি সেজেছেন। আপনি নিজেকে আল্লাহর অনন্ত পথের যাত্রী ভাবুন এবং আপনি সেভাবে নিজের মুখটি শুধু আল্লাহর জিকরে রত রেখে পুরো হজ অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করুন। নিজের আভিজাত্য, মহাসম্মানিত পদবি, আকাশচুম্বী সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান এই ক’দিনের জন্য ভুলে যান। কিছু দিনের জন্য নিজের আমিত্বকে ভুলে যান। মনে করুন, আমি আল্লাহর একজন নগণ্য গোলাম বা দাস। এই ক’দিন আমি কারো কাছ থেকে সম্মান, মর্যাদা বা অন্যান্য সামাজিক কোনো কিছুই পেতে চাই না বরং আমি আমার সাথী আল্লাহর অন্যান্য সম্মানিত মেহমানদের সব প্রকার চাহিদা ও প্রয়োজন নিজের সাধ্যমতো পূরণ করব। নিজেকে তাদের জন্য বিলিয়ে দেবো। তাদের প্রতি ভালো আচরণ করব। প্রতিটি কাজে তাদের অগ্রাধিকার দেবো তবেই আপনার হজটি হবে হজে মাবরুর। এভাবে প্রত্যেক আল্লাহর মেহমান যদি আপনার মতো নিজেদের বানাতে পারে তবে বিশাল এ হজ অনুষ্ঠানটি বেহেস্তি অনুষ্ঠানে পরিণত হবে এবং প্রত্যেকের হজ হবে ‘হজে মাবরুর’। এটিই হলো হজে মাবরুরের মূল হাকিকত।

    সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো বিরাট এই সম্মেলন কেন্দ্র থেকে ৪০-৪৫ দিনের ক্রমাগত বিররুন-এর অনুশীলনের কারণে আপনার চরিত্রে ‘বিররুন’ স্থায়ীভাবে বাসা বাঁধবে। আপনি যখন দেশে আসবেন তখন আপনার প্রতিবেশী আপনার সমাজ আপনার চরিত্রে বিররুন-এর প্রতিফলন দেখতে পাবে। আপনি হজে যাওয়ার আগের মানুষের সাথে বর্তমান মানুষটির ভিন্নতা খুঁজে পাবেন। আপনি আগে খারাপ আচরণ করতেন, গালিগালাজ করতেন, নিজের স্বার্থ রক্ষায় মরিয়া উঠতেন, মানুষের অধিকারের ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন কিন্তু এখন তার একটিও নেই। এখন মানুষের সাথে ভালো আচরণ করেন, আপনার অন্তরাত্মা কেঁদে ওঠে, ঝগড়া এড়িয়ে যান, ভালো দ্বারা জবাব দেন।
    ইহরাম বেঁধে যখন আপনি আল্লাহর মেহমান হওয়ার নিয়ত করেন, তখন শয়তান খুবই নাখোশ হয়। আর আপনি যদি হজে মাবরুর-এর আশা নিয়ে সে ধরনের আচরণের ওপর অটল অবিচল থাকতে পারেন, তখন শয়তান হতাশ হয়। এ জন্য ইহরাম বাঁধার পরপরই শয়তান আপনাকে হজে মাবরুর থেকে কিভাবে বিচ্যুত করা যায় তার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাবে। প্রচেষ্টার কিছু উদাহরণ হলো :

    ১. বিমান অফিসের সব ফরমালিটি শেষ করে শুনলেন আপনাদের নির্ধারিত বিমানটি এক ঘণ্টা বা আরো বেশি সময় বিলম্ব হবে। আপনার মেজাজ বিগড়ে গেল। বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য শুরু হয়ে গেল। এটি আপনার মাবরুর হজে প্রথম আঘাত।

    ২. বিমানে বাথরুমে লাইন ধরেছেন। আরে লোকটি এতক্ষণ কী করে। বাথরুমে ঢুকে দেখলেন পুরোটাই ময়লা করে রাখা হয়েছে। গেঁয়ো, অসভ্য বা অন্যান্য ভাষায় মন্তব্য শুরু করলেন। মাবরুর হজে আঘাত হানলেন।

    ৩. জেদ্দা বিমানবন্দরে নামলেন। ইমিগ্রেশনে লম্বা লাইন। আপনি বিরূপ মন্তব্য করে বসলেন অথবা বিজ্ঞজনের মতো টোটাল অব্যবস্থাপনার জন্য সৌদি সরকারের মন্তব্য করে বসলেন। মাবরুর হজে আঘাত হানলেন।

    ৪. ইমিগ্রেশন শেষে বাইরে উঁচু তাঁবুর নিচে ৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসের জন্য অপেক্ষা। যেকোনো মন্তব্য মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। বাস এলো, সাথীদের ডিঙিয়ে ভালো সিটের জন্য প্রতিযোগিতা, অন্যের গায়ে ধাক্কা, মন্তব্য বেরিয়ে এলো। মাবরুর হজে আঘাত হানলেন।
    ৫. রুমমেটদের আচার-আচরণ, বাথরুম ও এসি ব্যবহার বা অন্যান্য বিষয় যা আপনার সাথে খাপ খায় না। উপরের আলোচনায় বলেছিলাম আপনি নিজেকে ভুলে যাবেন। কিন্তু যাননি, রুমমেটদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন। মাবরুর হজে আঘাত হানলেন।

    ৬. হাজরে আসওয়াদ একটি পাথরমাত্র। এর প্রতি আবেগ-অনুভূতি অত্যন্ত প্রবল। রাসূল সা: একে চুমু খেয়েছেন তাই আমরা চুমু খাই, এটি মুস্তাহাব সুন্নত। ধাক্কাধাক্কি করে হাজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়া হজে মাবরুরের সম্পূর্ণ বিরোধী। দূর থেকে বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে তাওয়াফ শুরু করলেই হয়।

    ৭. তাওয়াফ শেষে দুই রাকাত নামাজ মাকামে ইবরাহিমের কাছাকাছি পড়া উত্তম। কিন্তু এই উত্তম কাজ করতে গিয়ে অন্যের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ান। এ দিকে আপনার নামাজের মনোযোগও নষ্ট হয়। প্রচণ্ড ভিড়ে আপনার মাথার উপর দিয়ে, ঘাড়ের উপরে, সামনে দিয়ে হাজার লোক যাবে। সরে এসে একটু নিরিবিলি জায়গায় খুশু-খুজুর সাথে নামাজ পড়–ন।

    ৮. রাসূলের দেশে গেছেন সুতরাং সর্বদা সুন্নাতে রাসূল সা:-এর ওপর থাকার চেষ্টা করবেন। বিদা’আত থেকে দূরে থাকবেন। অত্যন্ত নম্র-ভদ্রভাবে আদবের সাথে রাসূল সা:কে সালাম দেবেন। বাইরে এসে কাবার দিকে ফিরে আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। রাসূল সা:-এর কাছে কোনো কিছু চাইবেন না। বাকি গোরস্থানে যাবেন সুন্নাতের ওপর থাকবেন, উহুদে যাবেন, মসজিদে কুবায় যাবেন সেখানেও সুন্নাত অনুযায়ী আচরণ করবেন। মনে রাখবেন, আমাদের অধিকাংশ এজেন্সির মালিকরা সুন্নাহ অনুযায়ী চলেন না, ফলে সুন্নাহ অনুযায়ী কাজ সম্পাদন করান না। আপনাকেই প্রকৃত সুন্নাহ জেনে যেতে হবে।

    ৯. সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, দর্শনীয় স্থানগুলোতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিদা’আত ও শিরকে লিপ্ত হওয়া। প্রতিটি দর্শনীয় স্থানে বিভিন্ন ভাষায় সতর্কবাণী লিখা থাকার পরও হাজী সাহেবান বিদা’আত ও কুসংস্কারে লিপ্ত হন। এমনটি করবেন না। বিদা’আত ও শিরক আপনার কষ্টের ও মূল্যবান পুরো হজ অনুষ্ঠানটি বরবাদ করে দেবে।

    এভাবে ৪০-৪৫ দিন যদি বিররুন-এর চর্চা করেন, আশা করা যায় আপনার এই চরিত্রের ধারাবাহিকতা আপনার পরবর্তী জীবনে বলবৎ থাকবে। আপনার জাতি আপনাকে একজন ভিন্ন মানুষ হিসাবে দেখতে পাবে এবং আপনার জন্য দোয়া করবে। আপনার এই চরিত্র আপনার পরিবার ও সমাজকে অবশ্যই প্রভাবিত করবে।