হজের খরচ বাড়ল দেড় লাখ টাকা

নিউজ ডেস্ক।।

দুই বছর অপেক্ষার পর পবিত্র হজ পালনের সুযোগ মিললেও এবার জনপ্রতি খরচ বেড়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। ২০২০ সালে যেখানে তিন লাখ ১৫ হাজার টাকায় হজে যাওয়ার সুযোগ ছিল সেখানে এবার খরচ পড়বে চার লাখ ৬২ হাজার টাকা। এর সাথে পশু কোরবানি বাবদ আরো ১৯ হাজার ৬৮৩ টাকা খরচ হবে। এ ছাড়া বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজযাত্রীর জন্য চার লাখ ৫৬ হাজার ৫৩০ টাকার প্যাকেজ প্রস্তাব করেছে ধর্মমন্ত্রণালয়। তবে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় খরচ আরো বাড়তে পারে। ২০২০ সালে তারা সর্বনিম্ন প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল তিন লাখ ১৭ হাজার টাকা। এ দিকে ২০২০ সালে নিবন্ধন থাকা হজযাত্রীদের মধ্যে যারা এ বছর হজে যাবেন না তাদের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে বলে জানিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়।

মহামারী করোনার কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে কেউ হজ পালনে যেতে পারেননি। তবে ২০২০ সালে নিবন্ধনের কাজ অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল। সে সময় ৬০ হাজারের মতো হজযাত্রী নিবন্ধন করেন; কিন্তু করোনা বেড়ে যাওয়ায় বিধিনিষেধের কারণে তারা আর হজে যেতে পারেননি। এর মধ্যে গত দু’বছরে বেশকিছু নিবন্ধিত হজযাত্রী মারা যান ও কিছু হজযাত্রী নিবন্ধন বাতিল করেন। বর্তমানে ৫৪ হাজার ৪৮০ জন নিবন্ধিত রয়েছেন।

এর মধ্যে সরকারিভাবে দুই হাজার ৬০৪ জন এবং বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমে ৫১ হাজার ৮৭৬ জন। এ বছর চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ৯ জিলহজ, ৮ জুলাই হজ অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিপক্ষীয়ক হজচুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ থেকে এ বছর সরকারি ব্যবস্থাপনায় চার হাজার জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৫৩ হাজার ৫৮৫ জনসহ সর্বমোট ৫৭ হাজার ৫৮৫ জন হজ পালনের সুযোগ পাবেন। সচিবালয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে গতকাল বুধবার ধর্মপ্রতিমন্ত্রী মো: ফরিদুল হক খান এক সংবাদ সম্মেলনে আসন্ন হজের জন্য দু’টি প্যাকেজ ঘোষণা করেন।

তিনি জানান, এখন পর্যন্ত সৌদি আরব থেকে জনপ্রতি প্রকৃত খরচের বিবরণী পাওয়া যায়নি। তারপরও সম্ভাব্য ব্যয় বিবেচনা করে ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি ব্যবস্থাপনা এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনার হজযাত্রীদের জন্য হজ প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে। হজযাত্রীর বিমানভাড়া, সৌদি আরবের বাড়িভাড়া, সার্ভিস চার্জ, মুয়াল্লিম ফি, জমজমের পানি, খাবার খরচ এবং অন্যান্য ফি হিসাব করে ২০২২ সালে সরকারি ব্যবস্থাপনার জন্য দু’টি প্যাকেজ এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনা এজেন্সির জন্য একটি প্যাকেজের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্যাকেজ গতকাল অনুষ্ঠিত হজ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নির্বাহী কমিটির সভায় অনুমোদিত হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এবার হজে বাংলাদেশ পর্বে কোনো ব্যয় বাড়েনি। সরকারি ব্যবস্থাপনার প্যাকেজ-১-এ সর্বমোট পাঁচ লাখ ২৭ হাজার ৩৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ২০২০ সালের তুলনায় এক লাখ দুই হাজার ৩৪০ টাকা বেশি। সরকারি ব্যবস্থাপনার প্যাকেজ-২-এ সর্বমোট চার লাখ ৬২ হাজার ১৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ২০২০ সালের চেয়ে এক লাখ দুই হাজার ১৫০ টাকা বেশি। ধর্মপ্রতিমন্ত্রী জানান, ২০২০ সালে তিন লাখ ১৫ হাজার টাকার তৃতীয় আরেকটি প্যাকেজ ছিল।

এ বছর তৃতীয় প্যাকেজ রাখা হয়নি। ২০২০ সালের তিনটি প্যাকেজের যেকোনোটিতে নিবন্ধিত হজযাত্রীকে ২০২২ সালের জন্য ঘোষিত প্যাকেজ-১ অথবা প্যাকেজ-২-এর যেকোনো একটি প্যাকেজ নির্বাচন করে প্যাকেজ স্থানান্তরের মাধ্যমে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। ফলে ২০২০ সালে যারা প্যাকেজ-৩-এ তিন লাখ ১৫ হাজার টাকা দিয়ে নিবন্ধন করেছিলেন তাদের এ বছর কমপক্ষে চার লাখ ৬২ হাজার ১৫০ টাকা খরচ করতে হবে।

তাতে ওই বছরের তুলনায় খরচ বাড়বে এক লাখ ৪৭ হাজার ১৫০ টাকা। ধর্মপ্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারি ব্যবস্থাপনার প্যাকেজ-১-এর হজযাত্রীরা পবিত্র মসজিদুল হারাম চত্বরের সীমানা থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার মিটারের মধ্যে এবং প্যাকেজ-২-এর হজযাত্রীরা সর্বোচ্চ দেড় হাজার মিটারের মধ্যে অবস্থান করবেন। বেসরকারি ব্যবস্থাপনার হজযাত্রীর জন্য চার লাখ ৫৬ হাজার ৫৩০ টাকার প্যাকেজ প্রস্তাব করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বেসরকারি ব্যবস্থাপনার হজ এজেন্সি সরকারি ব্যবস্থাপনার প্যাকেজ-১ ও প্যাকেজ-২-এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে একাধিক প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারবে। ফরিদুল হক খান জানান, ২০২০ সালের যেসব নিবন্ধিত হজযাত্রী প্যাকেজ স্থানান্তরের মাধ্যমে ২০২২ সালে নিবন্ধন চূড়ান্ত করবেন না অথবা হজে যেতে পারবেন না, তাদের হজ নিবন্ধন বাতিল হবে এবং তারা বিধিমোতাবেক প্রদত্ত অর্থ ফেরত পাবেন।

এ বছর ঢাকার শতভাগ হজযাত্রীর সৌদি আরবের প্রি-এরাইভাল ইমিগ্রেশন ঢাকায় সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও ধর্মপ্রতিমন্ত্রী জানান। তিনি আরো বলেন, এবার প্রত্যেক হজ এজেন্সি কমপক্ষে ১০০ জন এবং সর্বোচ্চ ৩০০ জন হজযাত্রী পাঠাতে পারবে। হজ এজেন্সি ছাড়া অন্য কোনো এজেন্সির কাছে হজযাত্রীর বিমান টিকিট বিক্রির জন্য অনুমতি প্রদান করা যাবে না। কোনো হজ এজেন্সিকে কোনো অবস্থাতেই ৩০০-এর অধিক টিকিট প্রদান করা যাবে না বলেও তিনি জানান। ধর্মপ্রতিমন্ত্রী বলেন, এবার কোরবানির জন্য হজযাত্রীকে প্যাকেজ মূল্যের অতিরিক্ত ৮১০ সৌদি রিয়ালের সমপরিমাণ ১৯ হাজার ৬৮৩ টাকা সাথে নিতে হবে।

যে কারণে বেড়েছে খরচ : এবার খরচ কেন বাড়লÑ জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০২০ সালে সৌদি রিয়ালের বিনিময় হার ছিল ২৩ টাকা। এখন সেটি ২৪ টাকা ৩০ পয়সা। এটি প্যাকেজের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এ ছাড়া সৌদি আরব পর্বের সব খাতের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট, সার্ভিস চার্জ, কর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মোয়াচ্ছাছার খরচ দ্বিগুণ হয়েছে।

বাড়িভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। ডেডিকেটেড ফ্লাইটে হজযাত্রী পরিবহন : বাংলাদেশে ইমিগ্রেশনের পাশাপাশি এবার যেন হজযাত্রীদের ডেডিকেটেড (শুধু হজযাত্রী পরিবহন) ফ্লাইটেই পরিবহন করা হয় এমন দাবি জানিয়ে আসছিল হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)। তাদের সে দাবি রেখেছে সরকার। এবার হজযাত্রীদের ডেডিকেটেড ফ্লাইটেই পরিবহন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গতকাল হজ ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

বৈঠক শেষে হাব সভাপতি এম শাহাদাত হোসাইন তসলিম জানান, এয়ারলাইন্সগুলোকে প্রতি বছরই ডেডিকেটেড ফ্লাইটের মূল্য দেয়া হয়; কিন্তু সেটি তারা পরিচালনা করে না। ফলে শিডিউল ফ্লাইটও হজযাত্রী নিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করে। এবার এয়ারলাইন্সগুলোকে ডেডিকেটেড ফ্লাইটে হজযাত্রী পরিবহন করার জন্য বলা হয়েছে। থ্রি ডিজিটের শিডিউল ফ্লাইটে কোনো হজযাত্রী পরিবহন করা যাবে না। আমরা এ দাবি জানিয়েছি বেশ আগে থেকেই। তিনি বলেন, হজযাত্রী পরিবহনে আরো এয়ারলাইন্স থাকা দরকার। তাহলে যাত্রীসেবা নিশ্চিত হবে।

বেসরকারি প্যাকেজ ঘোষণা আজ : হাব সভাপতি বলেন, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ থেকে ৫৩ হাজার ৫৮৫ জন হজে যাবেন। তারা কোন প্যাকেজে যাবেন, তাদের কী সেবা দেয়া হবে, খরচ কেমন হবে তা আজ বৃহস্পতিবার জানানো হবে। এ জন্য আজ সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনের একটি হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। জানা যায়, হাব সর্বশেষ ২০২০ সালে হজের দু’টি বেসরকারি প্যাকেজ ঘোষণা করে। এতে কোরবানি ছাড়া সাধারণ প্যাকেজে হজ পালনে খরচ ধরা হয় তিন লাখ ৬১ হাজার ৮০০ টাকা। আর ইকোনমি প্যাকেজের খরচ ধরা হয় তিন লাখ ১৭ হাজার টাকা।